চলতি মাসের শুরুতে আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশের সীমান্তবর্তী নিজ গ্রামে ফিরেন বিসমিল্লাহ খান। তার একটাই স্বপ্ন ছিল- উপসাগরীয় দেশগুলোতে ১২ বছর কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থে যে বাড়িটি নির্মাণ করেছেন, জীবনের বাকি সময় সেটিতেই শান্তিতে কাটাবেন।
পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি বিদেশে কাজ করে উপার্জিত প্রতিটি টাকাই ব্যয় করেছিলেন সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য একটি দুইতলা বাড়ি নির্মাণে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই। সোমবার (২৯ জুন) ভোরের আগে চামকানি জেলার মান্দিখিল গ্রামজুড়ে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়, আর মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু।
আফগানিস্তানের দাবি, পাকিস্তান রাতভর সীমান্তবর্তী পাকতিকা, পাকতিয়া ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য বেসামরিক বাড়ির মধ্যে বিসমিল্লাহ খানের বাড়িটিও ছিল।
আফগান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ৩৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আরও ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
তবে পাকিস্তানের দাবি, তাদের বাহিনী তিনটি আফগান প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আস্তানায় ‘নির্ভুল’ অভিযান চালিয়েছে। দেশটির ভাষ্য, বিমান ও স্থল অভিযানে ২৯ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে।
এদিকে কিছুক্ষণ আগেও যে স্থানটি ছিল নিজের বাড়ি, সেই পাথর ও কাদামাটির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ খান এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে তার সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে বিসমিল্লাহ খান বলেন, বাড়ির ভেতরে শুধু নারী ও শিশুরাই ছিল। এই হামলায় তার স্ত্রী ও মেয়ে নিহত হয়েছেন। এছাড়া পরিবারের আরও প্রায় ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি জানি না কেন আমাদের বাড়িটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রথম হামলার কয়েক ঘণ্টা পর উদ্ধারকাজ চলার সময় আবারও পাক বাহিনী বিমান হামলা চালায়।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে যখন স্থানীয়রা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলেন, তখন দ্বিতীয় দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়।
দ্বিতীয় দফার হামলার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মারজিয়া খান ওয়ালি বলেন, আমরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া নারী ও শিশুদের খুঁজছিলাম। আহতদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য গাড়িতে তোলার সময় আবারও যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে পাই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যারা মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল, তারাই হামলার শিকার হয়।
প্রতিবেশী পাকতিকা প্রদেশের জিলান গ্রামের পাঁচ সন্তানের জননী জারমিনা ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে আছেন। হামলায় তিনি তার স্বামী ও ছোট মেয়েকে হারিয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা একটি কম্বল আঁকড়ে ধরে তিনি বলেন, বোমা পড়ার সময় আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছিল না। চোখ খুলতেই দেখি সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতি বা সশস্ত্র গোষ্ঠী সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আমরা শুধু কৃষিকাজ করে জীবন চালাই।
সীমান্তে আতঙ্ক
কুনার প্রদেশে নতুন করে হামলার আশঙ্কায় সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের কয়েক ডজন পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, অনেক বাসিন্দাই এখন ঘরের পরিবর্তে খোলা মাঠে রাত কাটাচ্ছেন অথবা সীমান্ত থেকে আরও দূরের এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন।
স্থানীয় উপজাতীয় প্রবীণ মেরা খান বলেন, “এখানকার মানুষ দুটি ভয়ের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে একটি যুদ্ধের ভয়, অন্যটি নিজের ঘরবাড়ি হারানোর ভয়।”
আরও পড়ুন:
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে আইআরজিসি’র দুই সদস্যকে হত্যা
কেন বাড়ছে উত্তেজনা?
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই সর্বশেষ এই বিমান হামলার ঘটনা ঘটলো। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তান একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালিয়েছে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সদস্যরা আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে টিটিপির হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এবং সামরিক স্থাপনাগুলো বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ইউজারনেম ব্যবহার করেই লগইন করা যাবে হোয়াটসঅ্যাপে
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে বলেন, বিদেশি মদদপুষ্ট ও সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের হুমকি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ‘পূর্ণ গতিতে’ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে তালেবান পরিচালিত আফগান সরকার সর্বশেষ বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে “আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন” এবং “নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা” বলে অভিহিত করেছে।
দেশটির সরকার আরও জানিয়েছে, তারা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান তালেবানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দোহা চুক্তির প্রতিশ্রুতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
ওই চুক্তি অনুযায়ী, আফগান ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।
শান্তির খোঁজে ফিরে এসে আবার যুদ্ধ
পাকতিয়ার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ খান এখন শুধু বেঁচে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন। তিনি বলেন, একটি ভালো ভবিষ্যতের খোঁজে আমি বহু বছর নিজের দেশ ছেড়ে ছিলাম।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আরও বলেন, আমি শান্তিতে বসবাসের আশায় দেশে ফিরেছিলাম। কিন্তু আমি ফেরার আগেই যুদ্ধ আমার দুয়ারে এসে পৌঁছেছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
