নোবেল প্রাইজ: ট্রাম্প-কাণ্ডে সতর্ক বিচারকরা, শান্তিতে যারা আলোচনায়

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য গত বছর জোর প্রচার চালিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জেরে চলতি বছর বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে নোবেল কমিটি। আগামী সপ্তাহ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করার কথা।

গত বছর ট্রাম্প না পেলেও তাঁকে পুরস্কারের মেডেলটি উপহার দেন ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার আগে ট্রাম্পের প্রকাশ্য দাবির মুখে চাপে পড়েছিল পাঁচ সদস্যের নোবেল কমিটি। এ বছরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুরি বোর্ডের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখছেন।

নোবেল কমিটির সেক্রেটারি ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন বার্তা সংস্থা এএফপিকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এখানে সবসময়ই প্রচুর তদবির বা লবিং থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত হয়তো কমিটির ওপর চাপ প্রয়োগেরও চেষ্টা করা হয়। তাই একদিক থেকে আমরা এসব বিষয়ে বেশ অভ্যস্ত।’

শান্তিতে যারা আলোচনায়
শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে আগামী ৯ অক্টোবর। মনোনীতদের তালিকা ও জুরি বোর্ডের আলোচনার বিষয়বস্তু নোবেল কর্তৃপক্ষ ৫০ বছর ধরে গোপন রাখে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্প-কাণ্ডের পর নোবেল কমিটি এবার হয়তো এমন কাউকে বেছে নেবে, যার ব্যাপারে সবার সম্মতি আছে।

অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন জেরলো এএফপিকে বলেন, গত বছরের ঘটনার জেরে এবার তারা পরিস্থিতিকে কম বিতর্কিত রাখার উপায় খুঁজছেন।

জেরলোর পছন্দের তালিকায় আছেন সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ইউক্রেনের শিশু অধিকার কর্মী মাইকোলা কুলেবা। অধিকৃত অঞ্চল থেকে বেআইনিভাবে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচার চালাচ্ছেন কুলেবা। জেরলোর ধারণা, এই সংস্থা ও কুলেবাকে যৌথভাবে পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।

এই বিকল্পটি বেছে নিলে ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প খুশি হতে পারেন। কারণ, ইউক্রেনীয় শিশুদের মুক্তির আবেদন জানিয়ে গত বছর তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

জেরলোর সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় আরও আছে সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস (ইআরআর)। এটি মূলত স্বেচ্ছাসেবকদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। যুদ্ধ ও ক্ষুধার হুমকির মুখে পড়া মানুষদের সাহায্য করতে তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে।

এছাড়া, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও (সিপিজে) আলোচনায় আছে। সাংবাদিকদের জন্য গত বছরের সময়গুলো বেশ খারাপ ছিল। জেরলোর পছন্দের তালিকায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনও (আইএসএস) আছে।

তবে নোবেল কমিটি যদি ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়াতে চায়, তাহলে অন্য কাউকেও বেছে নিতে পারে। যেমন- ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চল বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত (র‌্যাপোর্টিয়ার) ফ্রান্সেসকা আলবানিজ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) অথবা পোপ চতুর্দশ লিও।

সাহিত্যে নোবেল কি আর্জেন্টিনার ঝুলিতে?
পুরস্কার ঘোষণার সময় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাহিত্য বিভাগ। যেটির বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে আগামী ৮ অক্টোবর। এ বিভাগের বিজয়ী নির্বাচন করে সুইডিশ একাডেমি। গত বছর হাঙ্গেরীয় লেখক লাসলো ক্রাস্নাহোরকাইকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল।

বার্তা সংস্থা এএফপি কয়েকজন সাহিত্য সমালোচকের মতামত নিয়েছে। তাদের ধারণা, একাডেমি এবার হয়তো কোনো নারী লেখককে বেছে নিতে পারে। তিনি হতে পারেন লাতিন আমেরিকার কেউ।

সুইডিশ পাবলিক রেডিও ‘এসআর’-এর সাহিত্য সমালোচক লিনা কালমটেগ বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো পুরুষ লেখকদের পর নতুন এই জোয়ারে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে।

লিনা আরও বলেন, এই লেখকদের লেখায় প্রায়ই নারীবাদের ছোঁয়া থাকে। একইসঙ্গে সহিংসতা, ডার্ক ও পরাবাস্তবতার মিশ্রণ দেখা যায়। এ বছর বিভাগটিতে ৪৮ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন লেখক সামান্তা শোয়েবলিন চমকপ্রদ নাম হতে পারেন।

সাধারণত কোনো একক গ্রন্থের জন্য সাহিত্যের নোবেল দেওয়া হয় না। বরং একজন লেখকের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের জন্য সম্মাননা জানানো হয়। সে হিসেবে সমালোচকদের তালিকায় আরও আছেন, অ্যান্টিগুয়ান-আমেরিকান লেখক জ্যামাইকা কিনকেড, চীনা লেখক ক্যান সুয়ের। তাদের লেখায় নির্বাসন, আত্মপরিচয় এবং ঔপনিবেশিকতা থেকে পাওয়া মানসিক আঘাতের বিষয়গুলো ফুটে ওঠে।

নিয়মিত আলোচনায় থাকা কিছু নামও আছে। যেমন- অস্ট্রেলিয়ার জেরাল্ড মুরনেন, অ্যালেক্সিস রাইট, মার্কিন লেখক থমাস পিনচন ও মেক্সিকোর ক্রিস্টিনা রিভেরা গারজা।

কবে কোন বিভাগে পুরস্কার ঘোষণা?
আগামী সোমবার (৫ অক্টোবর) চিকিৎসাশাস্ত্রের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে নোবেল মৌসুম শুরু হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ‘জিএলপি-১’ হরমোন নিয়ে গবেষণার জন্য পুরস্কারটি দেওয়া হতে পারে। এই হরমোন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওজেম্পিকের মতো ওজন কমানোর ওষুধ তৈরিতে কাজ করে।

পরদিন ৬ অক্টোবর পদার্থবিজ্ঞান, ৭ অক্টোবর রসায়নে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর। পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।