নেপালে আবারও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা

Written by

in

হিমবাহধসে গত বুধবার নেপাল ও তিব্বতের কিছু এলাকায় কাদামাটির প্রলয়ঙ্করী পাহাড়ি ঢল নেমে আসার দুই দিন পর ওই এলাকায় নতুন করে আবার ভয়াবহ ঢল নামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হিমবাহধসের পর ওই এলাকায় নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। ওই হ্রদের পানি গত শুক্রবার থেকে উপচে পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

নতুন করে আবার প্রাণঘাতী বিপর্যয় নেমে আসতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকাজও বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

হিমবাহধসের কারণে সৃষ্ট ওই পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৬২৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ।

কী ঘটেছে

গত শুক্রবার নেপালের রসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা খবর পেয়েছেন, ধ্বংসাবশেষ জমে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে।

রাসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে।’

পারিয়ার আরও বলেন, ‘বর্তমানে পানির উচ্চতা ঠিক কতটা বেড়েছে, তা স্পষ্ট নয়। আমরা জানি না, এটি কতটা বড় হয়েছে এবং এর পানির উচ্চতা কত। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের কারণে একটি নয়, বরং দুটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। একটি হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায় তৈরি হয়েছে, যেখানে হিমবাহ গলা পানি এখন আটকে আছে।

অন্যটি আকারে অনেক বড় ও বেশি বিপজ্জনক। এই হ্রদ নেপালের একটি নদীর ওপর তৈরি হয়েছে। সেখানে বড় আকারের ভূমিধসে উপত্যকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে নদীর পানি আটকে ওই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক বাঁধের মতো হ্রদের স্যাটেলাইট দৃশ্য। ২৭ আগস্ট ২০২৬, তিব্বত

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক বাঁধের মতো হ্রদের স্যাটেলাইট দৃশ্য।

কী ঝুঁকি

নেপালি ও চীনা কর্তৃপক্ষ গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ধ্বংসাবশেষ জমে নিচের দিকের হ্রদটি সৃষ্টি হয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, হ্রদটির পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে যেকোনো সময় সেটির পানি উপচে পড়ে বা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক পাহাড়ি ঢল নামতে পারে।

গত শুক্রবার চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির খবরে বলা হয়, চীনা কর্তৃপক্ষ আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে। দলটি ধ্বংসস্তূপ জমে তৈরি হওয়া হ্রদটি আকাশপথে জরিপ করে সেটির একটি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরির কাজ করবে।

হ্রদটি যেখানে সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পৌঁছাতে গেলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে।

চীনের প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানসিয়াও আগের দিন, বৃহস্পতিবার সিসিটিভিকে বলেন, হিমবাহধসে হ্রদটি সৃষ্টি হওয়ার পর এর চারপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন খাড়া পাহাড় ও দুর্গম ঢাল তৈরি হয়েছে।

হ্রদ কোথায় সৃষ্টি হয়েছে

বড় ও বেশি বিপজ্জনক হ্রদটি নেপালের লেন্দে নদী ব্যবস্থার অন্তর্গত ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর সংগমস্থলের কাছে তৈরি হয়েছে।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, হ্রদটি ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই দুই নদীর পানি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কাঠমান্ডুর দিকে যায়।

কীভাবে হ্রদের সৃষ্টি হলো

গত বুধবার হিমবাহধসের কারণে আকস্মিক বন্যার পাশাপাশি ভূমিধসও হয়েছে। এ কারণে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথে গিয়ে জমা হয়েছে।

নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই আল-জাজিরাকে বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত তুষারধসের কারণে সৃষ্ট একটি বাঁধ হ্রদ। বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর উপত্যকায় গিয়ে জমা হয়েছে। এতে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে বা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

পবন আরও বলেন, ফলে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ওই বাঁধের পেছনে পানি জমতে থাকে এবং সেখান থেকেই হ্রদটির সৃষ্টি হয়। স্যাটেলাইটের ছবি এবং চীনের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই হ্রদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।

হিমবাহ–সংক্রান্ত বন্যা নিয়ে গবেষণা করা নেপালি গবেষক ও ভৌত ভূগোলবিদ নীতেশ খাডকা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ওই দুর্যোগের পর স্যাটেলাইটের ছবি ও ড্রোন দিয়ে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, দুটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। একটি উজানের দিকে এবং অন্যটি লেন্দে নদীতে।’

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে আকস্মিক বন্যার পর ঘরবাড়ি ও জমি কাদায় ঢেকে গেছে। ড্রোন থেকে তোলা ছবিতে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র উঠে এসেছে। ২৭ আগস্ট ২০২৬

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে আকস্মিক বন্যার পর ঘরবাড়ি ও জমি কাদায় ঢেকে গেছে। ড্রোন থেকে তোলা ছবিতে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র উঠে এসেছে।

নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খাডকা আরও বলেন, উজানে চীনের ভূখণ্ডে যে হ্রদটি তৈরি হয়েছে, সেটি হিমবাহের বরফ গলা পানি জমে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। ওই হ্রদের কারণে পানির স্বাভাবিক নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

খাডকা আরও বলেন, লেন্দে নদীতে ভূমিধস বা কাদাধসের কারণে নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পানি আটকে পড়ার ফলে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে যদি এটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তাহলে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁধ ভেঙে পানি বের করে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুর্গম ও জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে এখানে সেটিও সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।

নেপাল-চীন সীমান্তে কাদামাটিধসের ফলে বাঁধের মতো হয়ে যে হ্রদের সৃষ্টি, সেটির অবস্থানও দুর্গম ও খাড়া ভূখণ্ডে। সেখানে উদ্ধারকর্মী বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়াও অত্যন্ত কঠিন।

পবন ব্যাখ্যা করেন, হিমবাহধস এবং এ কারণে প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি—কোনোটিই সম্ভবত প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না।

তবে উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর প্রবাহপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও হ্রদ সৃষ্টি দ্রুত শনাক্ত করা, বারবার নদীর পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ, সময়মতো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং নেপাল-চীন সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারত বলে মনে করেন এই প্রকৌশলী।

এটি এত বড় ঝুঁকি কেন

হঠাৎ হ্রদ সৃষ্টি হলে আশপাশের ভূখণ্ড সাধারণত সেই বিপুল পরিমাণ পানি ধরে রাখার মতো অবস্থায় থাকে না। পাশাপাশি যখন কোনো হ্রদের পানি আলগাভাবে জমে থাকা পাথর ও কাদার তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে, তখন মাঝারি মাত্রায় পানি উপচে পড়লেও সেই বাঁধ ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। ফলে হঠাৎ বাঁধ ভেঙে ভাটির দিকে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক ঢলের সৃষ্টি হতে পারে।

সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক তলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা-পানি আর ধ্বংসাবশেষের প্রবল ঢল আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তে ভবনটি তলিয়ে যায়। বাস-গাড়িগুলো খেলনার মতো ঢলে ভেসে যায়

সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক তলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা-পানি আর ধ্বংসাবশেষের প্রবল ঢল আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তে ভবনটি তলিয়ে যায়। বাস-গাড়িগুলো খেলনার মতো ঢলে ভেসে যায়

পবন বলেন, বিপদটা শুধু হ্রদটিকে ঘিরে নয়, বরং হঠাৎ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাতেও। এ ধরনের খাড়া উপত্যকায় বাঁধ সাময়িকভাবে ভেঙে গেলেও তা দ্রুতগতির, ধ্বংসাবশেষবাহী ঢল বা আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ভাটির দিকের জনপদগুলোর বাসিন্দারা সতর্ক হওয়ার জন্য খুব সামান্য সময়ই পায়।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার হিসাব করে জানিয়েছে, হ্রদটিতে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ অলিম্পিক আকারের প্রায় ১ হাজার ২০০টি সুইমিংপুলের সমান।

খাডকা বলেন, এটি বড় এক হুমকি। কারণ, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটির বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে আবারও বড় আকারে ঢল নামতে পারে। এতে নদীর তলদেশে জমে থাকা পলি ও ধ্বংসাবশেষ স্রোতের সঙ্গে ভেসে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে থাকা জীবিত ব্যক্তিদেরও বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে।

এর অর্থ হলো, হ্রদটির পানি উপচে বন্যা হলে সেই বন্যার স্রোত কাদা ও পাথর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এতে পানির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কাজ করা উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

আকস্মিক বন্যা ও কাদামাটি ধসের দুই দিন পর হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি বের হচ্ছে, এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর উঁচুতে উঠে পাহাড়ে বসে আছেন আতঙ্কিত মানুষ,।২৮ আগস্ট ২০২৬, ত্রিশূলী

আকস্মিক বন্যা ও কাদামাটি ধসের দুই দিন পর হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি বের হচ্ছে, এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর উঁচুতে উঠে পাহাড়ে বসে আছেন আতঙ্কিত মানুষ,।

খাডকা আরও বলেন, ভাটির দিকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোয় থাকা শ্রমিক ও প্রকৌশলী এবং আশপাশে আশ্রয় নেওয়া বন্যায় বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্যও এটি হুমকি তৈরি করছে। হঠাৎ বড় আকারে ঢল নেমে এলে তা এসব টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে সজোরে আঘাত করতে পারে এবং সেখানে থাকা যেকোনো মানুষকে আটকে ফেলতে বা আহত করতে পারে।

উদ্ধার তৎপরতার অবস্থা কী

বুধবারের ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসুয়া জেলা। নতুন করে সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়ার কারণে রাসুয়া জেলায় শুক্রবার উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে অল্প সময়ের বিরতির পর উদ্ধার তৎপরতা আবার শুরু করা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শুক্রবার বলেছে, নতুন হ্রদের পানি উপচে পড়ার কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানিয়েছেন, বন্যায় তাদের ছয়টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ।