সম্প্রতি শিশুটিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের সন্তান বলে দাবি করেছেন। তবে শিশুটির বর্তমান পরিবার সেই দাবি অস্বীকার করেছে। শিশুটি কার, তা নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার দাবিও উঠেছে। যিনি শিশুটিকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করছেন, তিনিই এই পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, কেউ চাইলেই কি বাংলাদেশে সন্তানের পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারেন? এ পরীক্ষার জন্য কোথায় আবেদন করতে হয়? আর কোন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা সম্ভব?
সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য দুটি সরকারি পরীক্ষাগার রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সরাসরি সেখানে গিয়ে এ পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই। সাধারণত পুলিশি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশে এসব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো প্রয়োজনেও এ পরীক্ষা করা হয়।
শিশুটিকে নিয়ে আলোচনা কেন
সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের একাধিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি নিখোঁজ শিশুর পরিবার উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ছিল ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের এক নিখোঁজ শিশুর পরিবার। ওই শিশুর বাবা হাতে ৯১৫ দিন লেখা একটি কার্ড ধরে আছেন—এমন একটি ছবিও দেখা যায়। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটি ২০২৪ সালে নিখোঁজ হয়।
পরিবারটি জানায়, বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি হারিয়ে যায়। পরে ‘মিঠাই’ নামে টিকটকে শিশুটিকে দেখা যায় বলে দাবি করে তারা। বিষয়টি জানানোর পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করে পরিবারটি।
শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় করা মামলাটি প্রথমে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) যায়। কিন্তু এরপরও সন্তানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছিল পরিবারটি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। শিশুটি বিক্রি হয়ে গেছে বলে দাবি করে এক নারী তার ডিএনএ পরীক্ষার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে সহযোগিতা না করার অভিযোগও তোলেন।
তবে কামরাঙ্গীর চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি শিশুটি ও তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলেও জানান।
পরে ওই দিন বিকেলে আবার যোগাযোগ করা হলে ওসি মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কিছুই পাইনি। আমি অনেক চেষ্টা করছি। আমার এই থানায় ওই রকম নামে কোনো নিখোঁজ শিশু বা জিডি নেই। খোঁজ নিয়েছি আমি।’
অন্যদিকে খিলগাঁও থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বলতে পারছেন না। কারণ, মাত্র ১২ দিন আগে তিনি ওই থানায় যোগ দিয়েছেন।
তার ভাষ্য, শিশু নিখোঁজের অনেক ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় খিলগাঁও থানায় জিডি হয়েছে কি না, তা নথি দেখে নিশ্চিত হতে হবে।
ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ রকম তো অনেক হয়, কোনটা সেটা তো দেখে বলতে হবে। আমাকে পাঠালে আমি এটা দেখে বলতে পারব।’ এ বিষয়ে তথ্য পাঠাতে তিনি অনুরোধ করেন।
শিশুটির বর্তমান পরিবারের বক্তব্য
এদিকে ‘মিঠাই’ নামের ফেসবুক পেজে শিশুটির মা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। তার দাবি, প্রায় দেড় বছর ধরে ওই নারী তাদের পরিবারকে হয়রানি করছেন।
তিনি বলেন, ওই নারী শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করার পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেননি, ভবিষ্যতেও পারবেন না।
ভিডিওতে শিশুটির মা বলেন, ‘একটা মেয়ের মাতৃত্ব নিয়ে, একটা বাচ্চা নিয়ে টানাটানি চলতেছে, যেটা আমার সন্তানের ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলবে। ও এসবের কিচ্ছু বোঝে না।’
তিনি আরো দাবি করেন, কামরাঙ্গীর চরের শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার অনেক আগেই তার সন্তানের জন্ম হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটির জন্ম ২০২১ সালের জুলাইয়ে। ওই বছরের অক্টোবরের দিকে ফেসবুকে ‘মিঠাই’ পেজটি খোলা হয়।
পেজটিতে শিশুটির জন্মের পর থেকে বিভিন্ন বয়সের ছবি ও ভিডিও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। অন্য একটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, কামরাঙ্গীর চরের শিশুটি নিখোঁজ হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ মার্চ। সে ক্ষেত্রে, তার তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২ মার্চ তিনি কীভাবে শিশুটির ভিডিও পোস্ট করলেন—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করা ওই নারীর সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডিএনএ পরীক্ষা কী
ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো জীবের বংশগত তথ্য বহনকারী জৈব উপাদান। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে বংশগত বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত হয় ডিএনএর মাধ্যমে।
সরকারি একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ডিএনএ পরীক্ষায় ডিএনএ বা ক্রোমোজোমের গঠন বিশ্লেষণ করে জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। সাধারণত গালের ভেতরের কোষ থেকে সোয়াবের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়।
ব্যক্তির ডিএনএর বিন্যাস বিশ্লেষণ করে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য, বংশগত রোগ কিংবা পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের সম্পর্ক নির্ধারণে এ পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, সাধারণত ডিএনএ পরীক্ষা দুই ধরনের—ফরেনসিক ও ডায়াগনস্টিক।
তিনি বলেন, ধর্ষণ বা খুনের মতো অপরাধের তদন্ত এবং অজ্ঞাতপরিচয় মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, জিনগত ত্রুটি শনাক্ত করা, নির্দিষ্ট জিনগত রোগ নির্ণয় কিংবা কোনো রোগের ঝুঁকি জানতে ডায়াগনস্টিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের পরীক্ষা বিভিন্ন রোগনির্ণয় কেন্দ্রে করা সম্ভব।
পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে কোথায় পরীক্ষা হয়
আবু সুফিয়ান জানান, বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় দুটি সরকারি পরীক্ষাগারে। এর একটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি। অন্যটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি।
তিনি বলেন, ‘বাচ্চার বাবা-মা সম্বন্ধে জানতে চাইলে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব অথবা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে যেতে হবে। আর বাচ্চার জেনেটিক ডিজিজ সম্বন্ধে জানতে চাইলে বিভিন্ন ল্যাব রয়েছে।’
তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য এসব সরকারি পরীক্ষাগারে গিয়ে পরীক্ষা করাতে পারবেন না। এ জন্য পুলিশি মামলা বা আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন।
আবু সুফিয়ান বলেন, ‘কোর্ট কেস থাকতে হবে, পুলিশ কেস থাকতে হবে। মানে পুলিশ বা কোর্ট অনুমতি দিলে সরকারি ল্যাব দুটি তখন বাচ্চার বাবা-মার পরিচয় জানতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করে থাকে। কিন্তু কেস ছাড়া এই পরীক্ষা করা যাবে না, কারণ ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার জন্যই এগুলো বানানো হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, কিছু ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনেও ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো বাবা বিদেশে থাকেন এবং স্ত্রী ও সন্তানকে সেখানে নিতে চান—এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে তার জৈবিক সম্পর্ক যাচাইয়ের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দূতাবাস নির্দেশনা দিয়ে থাকে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও আত্মীয়তার সম্পর্ক নির্ধারণে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নির্দেশে এ পরীক্ষা করা হয় এবং তা ওই দুটি সরকারি পরীক্ষাগারে সম্পন্ন করা হয় বলে জানান আবু সুফিয়ান।
আবেদন করবেন কীভাবে
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আদালতের আদেশ ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআইডির পরীক্ষাগারে কোনো ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না।
তিনি বলেন, ‘কেস রিলেটেড, মানে ডিউ টু কোর্ট অর্ডার—সবকিছু হয়ে থাকে। কোর্টের অর্ডার ছাড়া কোনো ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না।’
পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয় বলে জানান তিনি। বর্তমানে আলোচনায় থাকা শিশুটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য সরাসরি থানায় জিডি বা মামলা করা যায়। চাইলে ঢাকার বিচারিক আদালতেও সরাসরি মামলা করা সম্ভব। এরপর আদালত নির্দেশ দিলেই ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে যে কেউ সরাসরি কোর্টের আমলি আদালতে গিয়েও মামলা করতে পারে। আবার থানায় জিডি বা মামলা করেও ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য কোর্টের আদেশ চাইতে পারে। কোর্ট আদেশ দিলেই সিআইডি এই পরীক্ষা করে।’
অর্থাৎ, বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য কেউ চাইলেই সরাসরি সরকারি পরীক্ষাগারে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারেন না। এ জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং পুলিশি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
