কলেজ ফেল করা ছাত্র বদলে দিলেন প্রযুক্তি দুনিয়া

প্রতিবেদন:

·

, ,

এখন একটি স্মার্টফোন হাতে থাকা মানে দুনিয়া আক্ষরিক অর্থে আপনার হাতের মুঠোয়। ফোন করা, গান শোনা, ছবি তোলা, সিনেমা দেখা, পড়াশোনা, অফিসের কাজ, বিল দেওয়া, ব্যাংকের হিসাব সামলানো…কত কী করা যায়!

তবে কয়েক দশক আগে চিত্রটা একদম এমনটি ছিল না। তখন কম্পিউটার ছিল মূলত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও বড় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ কাজের হাতিয়ার। ব্যক্তিগত কম্পিউটারের ধারণাটিও তখনো এতটা জনপ্রিয় হয়নি। মুঠোফোন ছিল মূলত কথা বলা ও বার্তা পাঠানোর জন্য। গান শোনার জন্য ছিল আলাদা যন্ত্র। কম্পিউটার, ফোন ও বিনোদনের জগতের মধ্যে দূরত্ব ছিল স্পষ্ট।

সত্তরের দশকের শেষভাগের এমন একটা সময়ে দৃশ্যপটে এলেন স্টিভ জবস। নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার না করেও তিনি প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন বদলে দিলেন। নতুন ভাবনা ও নকশার মধ্য দিয়ে কম্পিউটার, ফোন ও বিনোদনের জগতের সেই দূরত্ব কমিয়ে আনলেন।

স্টিভ নিজে কম্পিউটার প্রোগ্রামার ছিলেন না। কলেজের পড়াশোনাও শেষ করেননি। তারপরও প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে তাঁর প্রভাব ছিল অসাধারণ। তাঁর নেতৃত্বে অ্যাপল এমন সব পণ্য তৈরি করেছে, যেগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস বদলে দিয়েছে।

বাজারে আগে থেকেই থাকা প্রযুক্তিতে নানা বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে, সহজ করে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলাই ছিল স্টিভের বড় অবদান। আশির দশকের মাঝামাঝি ওজনিয়াকের সঙ্গে যৌথভাবে স্টিভ বাজারে আনলেন ম্যাকিনটোশ। এটি ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

স্টিভ জবস। ২০০৫ সালে

স্টিভ জবস। ২০০৫ সালে

এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্টিভের নকশা ও ধারণা থেকে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় প্রযুক্তিপণ্য। আইপড গান শোনার অভিজ্ঞতা পাল্টে দেয়। আইফোন মুঠোফোনকে একই সঙ্গে ফোন, ক্যামেরা, গান, ভিডিও ও ইন্টারনেট ব্যবহারের যন্ত্রে পরিণত করে। আইপ্যাড ট্যাবলেটকে জনপ্রিয় করে। পিক্সারের মাধ্যমে কম্পিউটার অ্যানিমেশনও পৌঁছায় নতুন এক মাত্রায়।

কিন্তু শুধু এসব পণ্যের মধ্যে স্টিভ জবসকে পুরোপুরি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা চড়াই-উতরাই ও বৈচিত্র্যে ভরা।

দত্তক সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা, কলেজ ছেড়ে দেওয়া, ভারতে ঘুরে বেড়ানো, আধ্যাত্মিকতার খোঁজ, নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে বরখাস্ত হওয়া, আবার সেই কোম্পানিতে ফিরে আসা—এমন বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে স্টিভের জীবন। নানা পর্বে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও ছিল। ছিল কঠোরতা, বিতর্ক ও ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা।

আজ থেকে ঠিক ১৫ বছর আগে, ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে মারা যান স্টিভ জবস। মৃত্যুর দেড় দশক পরও প্রযুক্তি ও ব্যবসার জগতে তাঁর প্রভাব শক্তিশালী। কীভাবে একজন মানুষ এমন প্রভাব তৈরি করলেন, সেটি বুঝতে হলে তাঁর জীবনের বিভিন্ন বাঁকে ফিরে তাকাতে হয়।

দত্তক সন্তান থেকে প্রযুক্তির জগতে

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টিভের জন্ম। তাঁর মায়ের নাম জোয়ান শিবলে। বাবা সিরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল ফাত্তাহ জান্দালি। জন্মের পর স্টিভের নাম রাখা হয়েছিল আবদুল লতিফ জান্দালি।

স্টিভের জৈবিক মা–বাবা দুজনেই তখন তরুণ। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনে পড়ার সময় তাঁদের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক হয়। বিয়ের আগেই গর্ভবতী হন জোয়ান।

জার্মান বংশোদ্ভূত জোয়ানের ক্যাথলিক পরিবার ফাত্তাহর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মেনে নেয়নি। ফলে সন্তানকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জন্মের কিছুদিন পর পল ও ক্লারা জবস স্টিভকে দত্তক নেন। তাঁরা তাঁর নাম রাখেন স্টিভেন পল জবস।

পল জবস ছিলেন মেকানিক। গাড়ি ও যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই স্টিভ তাঁর কাছ থেকে কাজের প্রতি যত্ন নেওয়া শিখেছিলেন। বাড়িতে কোনো কিছু বানানোর সময় পল জবস শুধু সেটি বাইরে থেকে সুন্দর রাখতেন না। ভেতরের অংশও গোছানো থাকা উচিত বলে মনে করতেন।

এই স্বভাবটি পরে স্টিভের কাজেও ছাপ ফেলেছিল। এমনকি সার্কিট বোর্ডের মতো কম্পিউটারের ভেতরের অংশ, যা ব্যবহারকারী কখনো দেখবেন না, সেটিও সুন্দর ও পরিপাটি হওয়া উচিত বলে মনে করতেন তিনি।

স্টিভের শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ এলাকায়। সেটি পরে সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিত হয়ে ওঠা প্রযুক্তিকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহও বাড়তে থাকে।

স্টিভ রিড কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডে অবস্থিত এই বেসরকারি লিবারেল আর্টস কলেজটি কঠোর ও বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার জন্য পরিচিত। ছয় মাস পর নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। তবে কলেজে যাওয়া বন্ধ করেননি। প্রায় দেড় বছর নিজের আগ্রহের বিভিন্ন ক্লাসে অংশ নেন।

রিড কলেজের তথ্য অনুযায়ী, শেক্‌সপিয়ার, আধুনিক নৃত্য ও ক্যালিগ্রাফির মতো বিষয়ে জানতে তিনি ডিগ্রির জন্য নয়, শ্রোতা হিসেবে ক্লাস করতেন।

স্টিফেন ওজনিয়াকের সঙ্গে স্টিভ জবসের

স্টিফেন ওজনিয়াকের সঙ্গে স্টিভ জবসের

ক্যালিগ্রাফির ক্লাস থেকে ম্যাকিনটোশ

স্টিভ জবস ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বক্তৃতায় তাঁর জীবনের তিনটি গল্প বলেছিলেন। প্রথমটি ছিল জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো কীভাবে পরে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘কানেকটিং দ্য ডটস’।

রিড কলেজে নিয়মিত পড়াশোনা না করলেও ক্যালিগ্রাফি শিখেছিলেন স্টিভ। সেখানে অক্ষরের নকশা, বিভিন্ন টাইপফেস, অক্ষরের মধ্যে ফাঁক এবং লেখাকে সুন্দর করে তোলার নানা কৌশল শিখেছিলেন। এ জ্ঞান একদিন কাজে লাগবে, তা তখন ভাবেননি তিনি।

প্রায় এক দশক পর অ্যাপল ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার তৈরির কাজ শুরু করলে সেই জ্ঞান কাজে লাগান স্টিভ। ম্যাকিনটোশে সুন্দর টাইপোগ্রাফি যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ক্যালিগ্রাফি শেখার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

স্টিভের বক্তব্য ছিল, তিনি যদি কলেজ ছেড়ে না দিতেন এবং ক্যালিগ্রাফির সেই ক্লাসে না যেতেন, তাহলে ম্যাকিনটোশে হয়তো এমন টাইপোগ্রাফি দেখা যেত না।

এখানে স্টিভের চিন্তার একটি বিশেষ দিক চোখে পড়ে। স্টিভ প্রযুক্তিকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে দেখতেন না। নকশা, শিল্প ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকেও তিনি প্রযুক্তির সঙ্গে একসঙ্গে ভাবতেন।

গ্যারেজ থেকে অ্যাপল

স্টিভ জবসের সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পরিচয় হয় স্টিভ ওজনিয়াকের। ওজনিয়াক ছিলেন ইলেকট্রনিকস বিষয়ে দক্ষ। জবসের ছিল পণ্য ও ব্যবসা নিয়ে আগ্রহ, মানুষের প্রয়োজন বোঝার ক্ষমতা এবং নতুন কিছু করার তাগিদ।

দুজন মিলে ১৯৭৬ সালে অ্যাপল প্রতিষ্ঠা করেন। আজকের বিখ্যাত এ প্রতিষ্ঠানের শুরুটা হয়েছিল জবসের পরিবারের গ্যারেজে।

অ্যাপল-১ ছিল মূলত ওজনিয়াকের তৈরি কম্পিউটার। এরপর আসে অ্যাপল-২। এটি ব্যক্তিগত কম্পিউটারকে শখের বিষয় থেকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

অ্যাপল দ্রুত বড় হতে থাকে। কিন্তু স্টিভ জবসের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল আরও সহজে ব্যবহার করা যায়, এমন কম্পিউটার তৈরি করা। সেই চিন্তা থেকেই আসে ম্যাকিনটোশ।

ম্যাকিনটোশ বাজারে আসে ১৯৮৪ সালে। গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস (জিইউআই) ছিল এ কম্পিউটারের বড় বৈশিষ্ট্য। এর ফলে কম্পিউটারে কাজ করার জন্য আগের মতো কমান্ড লিখতে হতো না। পর্দায় আইকন, উইন্ডো ও মাউস ব্যবহার করে কাজ করা যেত। এতে কম্পিউটার ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলে যায়।

স্টিভ জবস। ১৯৯৯ সালে

স্টিভ জবস। ১৯৯৯ সালে

নিজের কোম্পানি থেকেই বরখাস্ত

সাফল্যের পরও অ্যাপলের ভেতরে স্টিভ জবসের অবস্থান স্থায়ী ছিল না। কোম্পানি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে তিনি অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন।

তখন স্টিভের বয়স মাত্র ৩০। নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে বেরিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য বড় ধাক্কা ছিল। কিন্তু এই ঘটনাই পরে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়।

অ্যাপল ছাড়ার পর স্টিভ প্রতিষ্ঠা করেন নেক্সট। এটি ছিল উচ্চশিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরির একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। একই সময়ে তিনি অ্যানিমেশন-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান পিক্সারে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেন।

পিক্সারের শুরু ছিল কম্পিউটার গ্রাফিকস প্রযুক্তি নিয়ে। পরে সেটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে যায়। ১৯৯৫ সালে পিক্সারের তৈরি ‘টয় স্টোরি’ মুক্তি পায়। এটি ছিল প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কম্পিউটার-অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র।

পিক্সার পরবর্তী সময়ে ‘এ বাগস লাইফ’, ‘মনস্টার্স ইনক.’, ‘ফাইন্ডিং নিমো’সহ একের পর এক সফল চলচ্চিত্র তৈরি করে।

অ্যাপলে ফেরা

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝিতে কঠিন সময় পার করছিল অ্যাপল। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল নেক্সটকে কিনে নেয়। এর মাধ্যমে স্টিভ জবস আবার অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত হন।

পরে ১৯৯৭ সালে স্টিভ কোম্পানির নেতৃত্বে ফিরে আসেন। এরপর অ্যাপলে শুরু হয় বড় ধরনের পরিবর্তন। অনেক পণ্য ও প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। সীমিতসংখ্যক পণ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।

স্টিভের লক্ষ্য ছিল কম পণ্য তৈরি করা হবে, কিন্তু সেগুলো ভালোভাবে তৈরি করা হবে। এই সময়েই আইম্যাক আসে। পরে আইপড, আইফোন ও আইপ্যাডের মতো পণ্য একে একে বাজারে আসে।

আইপড গান শোনার অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছিল। ২০০১ সালে চালু হওয়া এই যন্ত্রের সঙ্গে আইটিউনস স্টোর যুক্ত হয়ে গান কেনা ও ব্যবহারের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসে।

এরপর ২০০৭ সালে আসে আইফোন। আইফোনের আগে মুঠোফোনে ইন্টারনেট, ক্যামেরা, গান বা ভিডিও ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু এ সবকিছু একটি সহজ ও ব্যবহারবান্ধব যন্ত্রে একত্র করার ক্ষেত্রে আইফোন বড় পরিবর্তন আনে। টাচস্ক্রিনভিত্তিক ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

স্টিভের মৃত্যুর আগের বছর ২০১০ সালে বাজারে আসে আইপ্যাড। এতে করে ট্যাবলেট কম্পিউটারের ধারণা জনপ্রিয় হয়।

স্টিভ জবস কোনো প্রযুক্তির সক্ষমতার পাশাপাশি সেটি মানুষ কতটা সহজে ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে ভাবতেন। এটাকে তাঁর সাফল্যের একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়।

স্টিভ জবস। ২০০৭ সালে

স্টিভ জবস। ২০০৭ সালে

প্রযুক্তির সঙ্গে নকশার মেলবন্ধন

সরলতা বা অনাড়ম্বরতা ছিল স্টিভ জবসের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রীয় বিষয়।

স্টিভ মনে করতেন, একটি পণ্যকে যতটা সম্ভব সহজ করে তুলতে হবে। তবে সহজ মানে যেন অগভীর না হয়। ব্যবহারকারীর সামনে জটিলতা থাকবে না। কিন্তু আপাতসরল সেই প্রযুক্তির পেছনে থাকবে জটিল সব কাজ।

এ কারণে অ্যাপলের পণ্যে নকশাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কম্পিউটারের বাইরের কাঠামো থেকে শুরু করে সফটওয়্যার, সবকিছু নিয়ে খুঁতখুঁতে ছিলেন স্টিভ। তাঁর কাছে একটি পণ্যের ভেতরের নকশাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

স্টিভের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তির সম্পর্ক ছিল গভীর। গান, কবিতা, টাইপোগ্রাফি ও নকশার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি প্রযুক্তিকে মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

কঠোর বস, বিতর্কিত মানুষ

স্টিভ জবসের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন অনেকে তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তাঁর রূঢ় আচরণের কথাও বলেছেন।

কোনো ধারণা পছন্দ না হলে স্টিভ তা সরাসরি বাতিল করে দিতেন। কর্মীদের কঠিন প্রশ্ন করতেন। কাজের মান নিয়ে ছাড় দিতেন না। ফলে কেউ কেউ তাঁর আচরণকে অপমানজনক বলে মনে করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের ধরন নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে।

অনেকে বলেছেন, স্টিভ তাঁর দলকে অসম্ভব মনে হওয়া কাজ করতে বাধ্য করতেন। তিনি কর্মীদের বলতেন, তাঁরা এমন একটি ছোট দলের অংশ, যারা এমন কিছু তৈরি করছে, যা অন্যরা ভাবতেও পারছে না।

এই উচ্চ প্রত্যাশা থেকে অনেক সময় অসাধারণ পণ্য তৈরি হয়েছে। আবার একই কারণে তাঁর সঙ্গে সহকর্মীদের মনোমালিন্য হয়েছে। অনেক মেধাবী কর্মী অ্যাপল ছেড়ে গেছেন।

তাই স্টিভ জবসকে আদর্শ নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর চরিত্রের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন সৃজনশীল, দূরদর্শী এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। একই সঙ্গে কঠিন, রূঢ় এবং অনেক সময় আত্মকেন্দ্রিকও

প্রযুক্তির মানুষ হলেও স্টিভ জবসের আগ্রহ শুধু প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭৪ সালে তিনি ভারতে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক শিক্ষক নিম করোলি বাবার সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু ভারতে পৌঁছে জানতে পারেন, সেই শিক্ষক মারা গেছেন।

তারপরও কয়েক মাস ভারতের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেন স্টিভ। উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় যান। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে।

পরে স্টিভ জেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি আগ্রহী হন। ক্যালিফোর্নিয়ায় জেন শিক্ষক কোবুন চীনো ওতোগাওয়ার কাছে ধ্যান ও জেন বৌদ্ধধর্মের চর্চা করেন। ধ্যান ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন তাঁর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্টিভের ব্যবসায়িক দর্শনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে নানা আলোচনা আছে। তবে সরলতা, মনোযোগ এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দেওয়ার প্রবণতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত কাজ—দুই জায়গাতেই দেখা যায়।

বিল গেটসের সঙ্গে সম্পর্ক

স্টিভ জবস ও বিল গেটস, দুজনেরই জন্ম ১৯৫৫ সালে। দুজনই কলেজ শেষ করেননি। দুজনই কম্পিউটার শিল্পের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। তবে তাঁদের কাজের ধরন ছিল আলাদা।

স্টিভের মনোযোগ ছিল পণ্য, নকশা ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায়। গেটসের শক্তি ছিল সফটওয়্যার ও ব্যবসায়িক কাঠামোতে।

অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের প্রতিযোগিতা প্রযুক্তির ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে জিইউআই নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠেছিল। গেটসের রুচি নিয়ে স্টিভ কটূ মন্তব্য করেছেন।

জবস মনে করতেন, মাইক্রোসফট বিভিন্ন ধারণা অ্যাপলের কাছ থেকে ধারণা নিয়েছে। গেটসের যুক্তি ছিল, তাঁরা দুজনই মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান জেরক্সের গবেষণাগার পিএআরসি থেকে পাওয়া ধারণা নিয়ে কাজ করছেন।

কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত তাঁদের সম্পর্ককে পুরোপুরি ধ্বংস করেনি। ১৯৯৭ সালে অ্যাপল যখন সংকটে, তখন মাইক্রোসফট অ্যাপলে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। ঘটনাটি তখন অনেকের কাছে বিস্ময়কর ছিল।

পরবর্তী সময়ে গেটস স্টিভের সৃজনশীলতার প্রশংসা করেছেন। জবসও গেটসের দক্ষতা স্বীকার করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও পরস্পরের গুরুত্বও তাঁরা বুঝতেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও সীমাবদ্ধতা

স্টিভ জবসের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল জটিল। তরুণ বয়সে ক্রিসান ব্রেনানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের কন্যা লিসা ব্রেনান-জবসের জন্ম হয় ১৯৭৮ সালে। প্রথম দিকে জবস পিতৃত্ব স্বীকার করেননি। পরে তিনি মেয়ের দায়িত্ব নেন এবং নিজের সেই আচরণকে ভুল হিসেবে স্বীকার করেন।

পরবর্তী সময়ে লিসা লেখক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৯১ সালে স্টিভ জবস লরিন পাওয়েলকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান।

জবসের জীবনে স্বাস্থ্যও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৩ সালে তাঁর অগ্ন্যাশয়ের বিরল ধরনের ক্যানসার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচার হয়। পরে তাঁর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।

অসুস্থতার মধ্যেও স্টিভ অ্যাপলের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উন্মোচনে অংশ নেন। ২০১১ সালের আগস্টে তিনি অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ ছাড়েন। এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি মারা যান।

মৃত্যুর মুখোমুখি

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ২০০৫ সালে স্টিভ জবস তাঁর জীবনের দ্বিতীয় গল্পটি বলেছিলেন ভালোবাসা, হারানো ও ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে, যা এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় গল্প বলেছিলেন মৃত্যু নিয়ে।

এ বক্তৃতা দেওয়ার সময় স্টিভ ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল।

বক্তৃতায় এ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বলেছিলেন, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিদিন নিজেকে একটি প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নটি হলো, আজ যদি তার জীবনের শেষ দিন হয়, তাহলে যে কাজটি করতে যাচ্ছেন, সেটি কি তিনি সত্যিই করতে চান?

উত্তর টানা অনেক দিন ‘না’ হলে কিছু একটা বদলানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করতেন তিনি।

স্টিভ জবস মারা যান ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর

স্টিভ জবস মারা যান ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর

জবসের এ সমাবর্তন বক্তৃতা এখনো বেশ জনপ্রিয়। এ বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, মানুষের সময় সীমিত। তাই, অন্যের জীবন অনুসরণ করে সেই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। নিজের চিন্তা ও নিজের পথের ওপর আস্থা রাখতে হবে।

একটি পুরোনো ম্যাগাজিনের কথা বলে বক্তৃতা শেষ করেছিলেন জবস। ম্যাগাজিনের নাম ‘হোল আর্থ ক্যাটালগ’। সেটির শেষ সংখ্যার প্রচ্ছদে লেখা ছিল, ‘Stay hungry. Stay foolish.’ বাংলায় বলা যায়, ক্ষুধার্ত থাকুন, বোকা থাকুন। মানে জানা ও করার আগ্রহ যেন শেষ না হয়। নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নতুন কিছু শেখার মানসিকতা যেন সব সময় থাকে।

উত্তরাধিকার

স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর অ্যাপল থেমে যায়নি। গত ১৫ বছরে কোম্পানিটি আরও বড় হয়েছে। আইফোনের নানা সংস্করণ, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডসহ নানা পণ্য বাজারে এসেছে।

স্টিভ জবসের প্রভাব শুধু অ্যাপলের মধ্যে যে সীমাবদ্ধ নয়, তা সহজে বোঝা যায়। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন পণ্য তৈরির পাশাপাশি নকশা, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং ব্র্যান্ডের ওপরও আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির স্মার্টফোনের নকশা থেকে অ্যাপের ব্যবহারপদ্ধতিতে তাঁর তৈরি করা মানদণ্ডের প্রভাব দেখা যায়।

তবে স্টিভের উত্তরাধিকার বিতর্কমুক্ত নয়। কর্মীদের সঙ্গে আচরণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পিতৃত্ব নিয়ে তাঁর শুরুর অবস্থান, স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত এবং অ্যাপলের কঠোর নিয়ন্ত্রিত পণ্যব্যবস্থা—এ সবকিছু নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্টিভ জবস একা একা সব পরিবর্তন ঘটাননি। অ্যাপলের পেছনে ছিলেন অসংখ্য প্রকৌশলী, ডিজাইনার, প্রোগ্রামার ও ব্যবস্থাপক। স্টিভ ওজনিয়াকের মতো সহপ্রতিষ্ঠাতাদের অবদানও ছিল মৌলিক।

তা ছাড়া সহযোগীদের নিয়ে জবস যেসব প্রযুক্তিকে নতুন করে বাজারে এনেছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগের শিকড় ছিল অ্যাপলের অনেক আগে। তাই স্টিভ জবসকে সবকিছুর একক উদ্ভাবক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়।

বিভিন্ন প্রযুক্তি, ধারণা ও মানুষের কাজকে এক জায়গায় এনে স্টিভ এমন পণ্য তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রযুক্তিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। এই কারণে মৃত্যুর ১৫ বছর পরও স্টিভ জবসকে এতটা গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

স্টিভকে ভাবা হয় এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি প্রযুক্তি কী করতে পারে, এই প্রশ্নের পাশাপাশি প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কেমন অনুভূতি তৈরি করবে, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছিলেন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বদলে গেছে কম্পিউটার, ফোন, গান, সিনেমা উপভোগের ধরন।