এআই নিয়ে চীন কেন এত চিন্তিত?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের নতুন কিছু সক্ষমতা চীনের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মানুষের নজরদারি ছাড়াই কাজ করতে পারে এমন এআই ব্যবস্থাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বেইজিং।

যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। সেখানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মানবজাতির জন্য হুমকি হতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন অনেক গবেষক।

চীন এত দিন এআইয়ের তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ঝুঁকি নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিল। এর মধ্যে ছিল ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি, শিশুদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা।

তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা চীনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। শক্তিশালী এআই মডেলগুলো সাইবার হামলা চালাতে পারে—এমন প্রমাণ সামনে আসার পর বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একদল প্রোগ্রামার এআই ব্যবহার করে একটি সাইবার হামলার ‘ওয়ার্ম’ তৈরি করার কথা জানায়। এটি ছড়িয়ে দেওয়া হলে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটের লাখ লাখ অ্যাকাউন্টে হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে বলে তারা দাবি করে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইন্টারকানেক্টেড ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা কেভিন শু বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি।

তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। চীনে সাধারণত এমন আলোচনা জনসমক্ষে ততটা দেখা যায় না।

এআই দিয়ে মানুষের নজরদারি ছাড়াই কাজ করা সাইবার হামলাকারী এজেন্ট তৈরি হলে সেটি চীনা সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশলবিষয়ক কেন্দ্রের গবেষক সুন চেংহাও বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা তৈরি করছে। এতে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

তবে এআই নিয়ে দুই দেশের তীব্র প্রতিযোগিতা সহযোগিতার পথে বাধা হতে পারে। বিশেষ করে এআই মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো ব্যবস্থায় দুই দেশের সমন্বয় কঠিন হতে পারে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং তিনি এই অবস্থান ধরে রাখতে চান।

চীনের বিশেষজ্ঞ সুন চেংহাও বলেন, চীন আশঙ্কা করছে ‘নিরাপত্তা’র কথা বলে এআই ও অন্যান্য প্রযুক্তির উন্নয়ন সীমিত করার চেষ্টা করা হতে পারে।

চীন ইতিমধ্যে এআই ব্যবহারের ওপর কিছু নিয়ম করেছে। যেমন, কারও অনুমতি ছাড়া তার চেহারা বা পরিচয় ব্যবহার করে এআই দিয়ে ছবি তৈরি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বেইজিংভিত্তিক এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনকর্ডিয়া এআইয়ের প্রধান ব্রায়ান সে বলেন, চীনের এআই নীতিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বর্তমান ক্ষতির বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়।

তার মতে, চীন এআইকে এমন একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখে, যা বিদ্যুৎ বা গাড়ির মতো সমাজ ও শিল্পের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করে বেইজিং।

সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বেশ কিছু ঘটনা এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি সামনে এনেছে। এ কারণে চীনের নীতিনির্ধারকদের কাছে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের পাশাপাশি সাংহাইয়ের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এআই নিয়ে উদ্বেগ ও বাস্তববাদী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কিছু সমস্যা থাকবেই। তবে সমস্যা শনাক্ত করে সমাধান করা গেলে প্রযুক্তির নিরাপত্তা আরও বাড়বে।

সাংহাইয়ের এক বাসিন্দা বলেন, উইচ্যাটে এআই দিয়ে সাইবার হামলার সম্ভাবনা সামনে আসা খারাপ বিষয় নয়। বরং এতে দুর্বলতা শনাক্ত করে তা ঠিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এআইয়ের ওপর কঠোর নিয়মের পক্ষেও অনেকে মত দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছেড়ে দিলে তারা নিজেরাই যথেষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ নাও করতে পারে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্পায়ার্ড এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা জিয়া জিজিয়ান বলেন, তার বড় উদ্বেগ হলো শক্তিশালী এআই মডেল দিয়ে জটিল পাসওয়ার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কোড ভেঙে ফেলা।

তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একটি দেশের এআই সক্ষমতা খুব শক্তিশালী হলে অন্য দেশ নিজেকে নিরাপত্তার দিক থেকে দুর্বল মনে করতে পারে।