বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো লেটার অব ক্রেডিট (এলসি)। তবে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য শুধু নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটি ইসলামী শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাইম ব্যাংক হাসানাহ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সহযোগিতায় সময় টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ইসলামী অর্থনীতি’-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির ডেপুটি চিফ অব ইসলামিক ব্যাংকিং এ. কে. এম. মীজানুর রহমান এবং বাহরাইনের এওফি (AAOIFI) তাকাফুল ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য ও ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি লুকমান হাসান।
এ. কে. এম. মীজানুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি হলো ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে নিরাপদ অর্থ লেনদেনের একটি কার্যকর ব্যবস্থা। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর আমদানিকারক তার ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলেন। এরপর রপ্তানিকারক পণ্য পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ব্যাংক অর্থ পরিশোধ করে। প্রয়োজন হলে কনফার্মেশন এলসির মাধ্যমে অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তাও নিশ্চিত করা যায়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এলসি ব্যবস্থায় ডকুমেন্টে ভুল, জালিয়াতি, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত ঝুঁকি এবং আন্ডার বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা থাকে। এসব ঝুঁকি কমাতে দক্ষ জনবল, সঠিক মূল্য যাচাই এবং নির্ভরযোগ্য রপ্তানিকারক নির্বাচন জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এলসি ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ করতে ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যাচাইয়ের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে মুফতি লুকমান হাসান বলেন, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী এলসি হালাল হওয়ার জন্য শুধু অর্থায়ন নয়, পুরো লেনদেনের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। যদি গ্রাহক পূর্ণ অর্থ জমা দিয়ে কেবল ব্যাংকের নিশ্চয়তা নেন, তাহলে ব্যাংক এজেন্সি ফি নিতে পারে, যা শরিয়াহসম্মত। কিন্তু ব্যাংক যদি অর্থায়ন করে, তাহলে প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে ব্যাংককে আগে পণ্যের মালিকানা গ্রহণ করে পরে নির্ধারিত মুনাফায় গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে হবে।
তিনি বলেন, ইসলামে সুদ (রিবা), অনিশ্চয়তা (গারার) এবং প্রতারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই পণ্যের প্রকৃত মালিকানা ও ঝুঁকি গ্রহণ ছাড়া বিক্রি করা শরিয়াহসম্মত নয়। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত বেচাকেনাভিত্তিক মুরাবাহা, সালাম বা ইস্তিসনা চুক্তির মাধ্যমে এলসি পরিচালনার পরামর্শ দেন তিনি।
মুফতি লুকমান হাসানের মতে, বিদ্যমান আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো সরাসরি আমদানিকারক হিসেবে কাজ করতে পারে না। তিনি মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা, যাতে তারা সরাসরি পণ্যের মালিকানা গ্রহণ করে শতভাগ শরিয়াহসম্মত উপায়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
