যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে চিঠি দিয়েছেন। নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়াতে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবারো শুরুর শেষ মুহূর্তের এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আল জাজিরা (২৯ অক্টোবর) জানায়, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্যান্সের চিঠিতে দুই দেশের মতপার্থক্য কমিয়ে আলোচনার পথ খোঁজার কথা বলা হয়েছে। চিঠিটি ইরানের নেতারা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এতে নির্দিষ্ট কোনো শান্তিচুক্তির শর্ত দেয়া হয়নি। বরং আলোচনার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে কথা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চিঠিতে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বৈঠকের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ভ্যান্স নিজেই মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন। গত জুনে দুই দেশের আলোচনায়ও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা রেজাইয়ের কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেন। ভ্যান্স সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনায় রাখতে হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ইরান রাজি হলে আগামী সপ্তাহেই কাতার অথবা তুরস্কে বৈঠক হতে পারে।
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠির বিষয়ে কিছু জানায়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, তেহরান ‘কূটনীতিকে সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে’। বৃহস্পতিবার রেজাইয়ের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়ার কথা।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, রেজাইকে চিঠি দেয়ার মধ্য দিয়ে তেহরানের ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নিয়ে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে।
ভ্যান্স কি ট্রাম্পকে থামাতে পারবেন?
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিষয়ে ভ্যান্সের অনীহা ট্রাম্পের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়ার আগে তিনি আরো জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর পক্ষে ছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়েও তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে এবার চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের নির্দেশে নেয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলেছে, ট্রাম্পই ভ্যান্সকে চিঠি পাঠাতে বলেছিলেন। পরে ট্রাম্প তা অস্বীকার করেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, ইরানের সাথে যোগাযোগের অনুমতি ভ্যান্সকে দিয়েছিলেন। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটির লক্ষ্য ছিল ইরানকে ‘চিকিৎসাসামগ্রী ও বিভিন্ন জিনিস’ দিয়ে সহায়তা করা।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর আলি ভায়েজের মতে, তেহরান ভ্যান্সকে এমন একজন হিসেবে দেখে, যিনি প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের কথা পৌঁছাতে পারেন এবং ব্যর্থতার মূল্যও বোঝেন। তবে ভ্যান্সের মাধ্যমে যোগাযোগের সম্ভাবনা থাকলেও দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সহজ নয়।
সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রুজবেহ পারসি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনে ইরান বিষয়ে ‘বিবেকের কণ্ঠস্বর’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো প্রভাব ভ্যান্সের কখনোই ছিল না।
আজিজিও বলেছেন, ভ্যান্সের আপত্তি ও ভিন্নমত সত্ত্বেও এক বছরের কম সময়ে দুটি যুদ্ধ হয়েছে। তাই তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ ও সামরিক হুমকিকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখে। শেষ সিদ্ধান্ত ট্রাম্পই নেন, আর তাঁকে বিশ্বাস করা কঠিন—এ বিষয়টি ইরানের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন সতর্ক করছেন ট্রাম্প?
ইরান নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার শিকার হলে আরো কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোও তাদের হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদি ২১ অক্টোবর বলেন, ‘আমাদের কৌশল হলো, কোনো সীমারেখা না মানা।’
এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। সোমবার তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলা কি আসন্ন?
অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, আগামী সপ্তাহের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। আলি ভায়েজের মতে, হামলার ঝুঁকি ‘বিপজ্জনকভাবে বেশি’। ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংযমের অবসান ঘটাতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ভায়েজ বলেন, ‘সামরিক প্রস্তুতি চলছে, আর কূটনীতির জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে।’ নির্বাচনের পর ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে যাবে—এমন ধারণাও ভুল হতে পারে। বরং তিনি আরো বড় ঝুঁকি নিতে পারেন।
রুজবেহ পারসির আশঙ্কা, নতুন সামরিক অভিযান ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘দুই পক্ষই নিজেদের শক্তি প্রমাণের চাপে রয়েছে। ফলে এবারের সামরিক সংঘাত আরো বড় হবে, ধ্বংসযজ্ঞ ও রক্তপাতও বাড়বে।’
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
