মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তেহরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে যখন আলোচনা করছিলেন, ঠিক সে সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে অযাচিত মন্তব্য করে বসেছেন।
ট্রাম্প ফক্স নিউজের এক সাংবাদিককে বলেন, ইরানিরা যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেন, তাহলে ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনা করতে আসা আলোচকেরা আর কখনো নিজেদের দেশে ফিরতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে তখন ফিরে যাওয়ার মতো কোনো দেশই তাঁদের থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় প্রধান ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভ্যান্সকে যে কতটা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, ট্রাম্পের বারবার এ ধরনের বাধা তৈরি তারই সবশেষ উদাহরণ।
গতকাল সোমবার ভ্যান্স বলেন, প্রথম দফার আলোচনা শান্তির জন্য একটি ‘সফল ভিত্তি’ তৈরি করেছে। কিন্তু এখন ভ্যান্সকে এমন একটি যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজে বের করতে হবে, যে যুদ্ধের শুরুতে তিনি নিজেই বিরোধী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে তাঁর বসের খামখেয়ালিপনা ও এমন এক শত্রুপক্ষকে সামলাতে হবে, যাঁরা ট্রাম্পের হুমকিতে মোটেও ভয় পাচ্ছেন না।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, ‘গত (রোববার) আমরা ইরানিদের বলেছি, আপনারা যখন এমন কথাবার্তা বলেন, যাকে আমাদের এই প্রজন্মের তরুণেরা ‘ফালতু কথা’ বলে ভাবেন। সুতরাং আপনারা আশা করতে পারেন না, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার জবাব দেবেন না এবং সত্যটা তুলে ধরবেন না। তাই তাঁরা যখন অসত্য কিছু বলবেন, প্রেসিডেন্ট অবশ্যই তার জবাব দেবেন।’
উভয় পক্ষই শত্রুতা বন্ধ করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে এবং এখন ৬০ দিনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী একটি পরমাণু চুক্তি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ২০২৮ সালের রিপাবলিকান মনোনয়নের জন্য সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ভ্যান্সের জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণই রয়ে গেছে।
শান্তি চুক্তিটি নিয়ে গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যদি এটি সফল হয়, তবে এর কৃতিত্ব আমি নেব। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে আমি জেডিকে দোষ দেব।’
ভ্যান্স অবশ্য বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এটি মজা করে বলেছেন। তবে ট্রাম্প কখনোই অন্যের ওপর দোষ চাপাতে দ্বিধা করেন না। আর ভ্যান্স ভবিষ্যতের এই আলোচনাকে কীভাবে সামলান, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ফলাফল ও ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাদজাদপুর বলেন, ভ্যান্স ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন। একটি অপ্রিয় যুদ্ধ শেষ করতে পারলে তিনি হয়তো বাহবা পেতে পারেন। আবার এমনও হতে পারে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে ‘মার্কিনদের জন্য এক অপমানজনক পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের এক চরম শত্রুকে শত শত কোটি ডলার দিয়ে দেওয়ার চুক্তির মূল কারিগর’ হিসেবে দেখা হবে।
আরেকটি বিষয় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সেটা হচ্ছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডারদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সাদজাদপুর বলেন, ‘যেকোনো মার্কিন রাজনীতিক, বিশেষ করে যিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাঁর জন্য এটি কোনো অনুকূল পরিস্থিতি নয়।’
মার্কিন নাগরিকেরা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুদ্ধ বন্ধ ও জ্বালানি খরচ কমানোর জন্য দাবি জানাচ্ছেন। তবে সাদজাদপুর যুক্তি দিয়ে বলেন, মার্কিন নাগরিকেরা আসলে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হচ্ছে, তার ওপর বেশি নজর রাখছে।
সাদজাদপুর বলেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তার গ্রাফ দ্রুত নেমে গিয়েছিল। কারণ, সেই সময় ১৩ মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন।
ইরানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে করমর্দন করছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মাঝখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ২১ জুন ২০২৬, সুইজারল্যান্ডছবি: রয়টার্স
এই গবেষক বলেন, ‘মার্কিনরা যুদ্ধ পছন্দ করেন না। কিন্তু পরাজয় তাঁরা আরও বেশি অপছন্দ করেন।’
ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড ত্যাগের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সম্ভাব্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির যে রূপরেখা দিয়েছিলেন, তাতে ফাটল দেখা দিতে শুরু করেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ইরান তাদের দেশে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইরানিরা বলেছেন, তাঁরা ‘নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি’ দেননি।
ভ্যান্স ইরানকে সম্ভাব্য অর্থায়নের ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, কাতার ইরানের আটকে থাকা অর্থ ছেড়ে দেবে এবং সেই অর্থ দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, ভুট্টা ও গম কিনবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ওভাল অফিসে সেই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ইরানের জনগণের জন্য খাদ্যপণ্য ‘একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে আমাদের কৃষকদের কাছ থেকেই কেনা হবে।’
তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অতীতে তাঁরা বলেছেন, এই অর্থ তাঁদের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
