আসামে ১১০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ, ভেঙে ফেলা হলো ১০ মসজিদ

গুয়াহাটিতে গৌহাটি হাইকোর্ট ভবন

প্রতিবেদন:

·

, ,

ভারতের আসামে বনভূমি ও সরকারি জমি দখলমুক্ত করার অভিযানে দুই দিনে এক হাজার ১০০টির বেশি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম। রাজ্যের নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় এ অভিযান চালানো হয়।

গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় এ অভিযান চালানো হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, এই তিন জেলায় সাম্প্রতিক অভিযানে ৬৩৮ হেক্টরের বেশি জমি দখলমুক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একে প্রশাসনের “রুদ্র রূপ” বলেছেন।

অভিযানের চিত্র

সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর এক দিনেই তিন জেলায় ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, হোজাইয়ে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবার ছিল। পরদিন ১৮ অক্টোবর নগাঁওয়ের লুটুমারি-লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আরও ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক বাসিন্দা খননযন্ত্র পৌঁছানোর আগেই মালপত্র নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। এ ছাড়া হোজাইয়ের যমুনা-মৌডাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং গোলাঘাটের ২ নম্বর নেঘেরিবিল এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়।

রোববারের অভিযানে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে লুটুমাই বনাঞ্চলে। কর্মকর্তাদের হিসাবে সেখানে প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি খালি হয়েছে এবং ৫৬৩টি পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই দিন ১ হাজার ৬৬৯টি স্থাপনা ভাঙা হয়, যার মধ্যে পাঁচটি মসজিদ। এখন বন কর্মকর্তারা এলাকার সীমানা সুরক্ষিত করছেন, যাতে নতুন করে কেউ জমি দখলের চেষ্টা না করে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বনভূমি দখলমুক্ত করার এ অভিযান আরও চলতে পারে।

সরকারের বক্তব্য

আসাম সরকার বলছে, বনভূমি ও সরকারি জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতেই এ অভিযান। বন কর্মকর্তাদের দাবি, গত আগস্টে মাইকিং করে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছিল। এর ফলে অভিযানের আগেই প্রায় ৯০ শতাংশ “কথিত দখলদার” নিজেরাই জায়গা খালি করে চলে যান। তাঁদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়া আদালতের নির্দেশ মেনেই হয়েছে।

আদালতের ভূমিকা

উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলো গৌহাটি হাইকোর্টে গিয়েছিল, কিন্তু প্রতিকার পায়নি। গত জুনে আদালত তাদের ৩০ দিনের মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার জনস্বার্থ সেখানে বসবাসের ব্যক্তিগত দাবির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

বাসিন্দাদের দাবি

লুটুমারির বাসিন্দারা নিজেদের “অবৈধ দখলদার” বলতে রাজি নন। তাঁদের বক্তব্য, পূর্বপুরুষেরা বন বিভাগের শ্রমিক ছিলেন। ব্রিটিশ আমলের “টাউঙ্গিয়া” ব্যবস্থায় সরকারই তাঁদের সেখানে বসতি গড়ার সুযোগ দিয়েছিল। উচ্ছেদ হওয়া আবদুল নূর জানান, ১৯৭৪ সালে তাঁর পরিবারকে ওই জমি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, অভিযানে ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে।

অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএমএসইউ) পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনের সভাপতি মো. ইমতিয়াজ হোসেন বলেছেন, লুটুমাইয়ে উচ্ছেদের মুখে থাকা প্রায় ৫০০ পরিবারের মধ্যে ৩০০-র মতো পরিবারকে ১৯৭৩ সালে সরকারই সেখানে বসিয়েছিল। এর মধ্যে ১৭৭টি মুসলিম পরিবার। সংগঠনটির অভিযোগ, আদালতের নির্দেশের কথা বলা হলেও একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে। স্থানীয় ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

আগের অভিযান ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

লুটুমারি এলাকায় গত বছরের নভেম্বরেও আলাদা উচ্ছেদ অভিযান হয়েছিল। তাতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত হিসাব অনুযায়ী, আসামে বিজেপির এক দশকের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদের অধিকাংশই মুসলিম।#

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ