এক সময় ডেঙ্গুর মৌসুম বলতে শুধু বর্ষাকালকেই বোঝানো হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সে ধারণা পাল্টে গেছে। এডিস মশার জীবনচক্রের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে এখন শীত-গ্রীষ্মেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
রাজধানী ছাড়িয়ে রোগটি এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছর হামের ভয়াবহ প্রকোপের মধ্যেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। ইতোমধ্যে ৫৮ জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম ২১ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৭০৩ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২২০ জন—যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগে মে মাসে আক্রান্ত ছিলেন ৭১৪ জন এবং এপ্রিলে ৬৪০ জন। অর্থাৎ, সংক্রমণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছেই।
আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে। যদিও এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবুও মৌসুম শুরুর আগেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা। একইসঙ্গে খোদ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এবার ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে না। ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল সময়। মে মাসের পর জমে থাকা পানিতে মশার ডিম দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয় এবং থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে প্রজনন আরো বাড়ে। আগে ঢাকাকে ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মতে, বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রমে উদাসীনতা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
দেশে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। সে সময় রোগটি ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। পরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটি ডেঙ্গু জ্বর বলে শনাক্ত করেন এবং সে বছর থেকেই প্রথম ডেঙ্গু রোগীর তথ্য রেকর্ড করা হয়। ওই বছর ডেঙ্গুতে ৯৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হন পাঁচ হাজার ৫৫১ জন। পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় রোগটির প্রকোপ সীমিত থাকলেও ২০১৯ সালে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্ত হন এবং ১৭৯ জন মারা যান।
তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ২০২৩ সালে। সে বছর ডেঙ্গুতে মারা যান এক হাজার ৭০৫ জন এবং আক্রান্ত হন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। তখন দেশের ৬৪ জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ এবং মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।চলতি বছরের ২১ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন মোট চার হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে। সেখানে রোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৯৭ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে রোগী ৯৭২ জন। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় আক্রান্ত ৩৪৪, পিরোজপুরে ২৯৭, পটুয়াখালীতে ২৪৪, ঝালকাঠিতে ২৩০, বরগুনায় ১১৮ এবং ভোলায় ৬৪ জন।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
