সুস্থ থাকতে নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে, রোজকার ব্যস্ত জীবনে অনেকেই আলাদা করে ব্যায়াম করার সময় পান না। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসই শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে। যেমন, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা। বাসায়, অফিসে বা শপিং মলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সুযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। এই সাধারণ অভ্যাসই হতে পারে আমাদের শরীরচর্চার সহজ একটি উপায়।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে শুধু পায়ের পেশিরই ব্যায়াম হয় না, বরং হৃদযন্ত্র, ফুসফুস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও কিছু উপকার পাওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অল্প সময়ের জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো শারীরিক কার্যকলাপও শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, নিয়মিত সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে ঠিক কী কী উপকার পাওয়া যায়। চলুন জেনে নিই আজকের এ প্রতিবেদনে।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে শরীরে কী ঘটে
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় শরীরকে মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে নিজের ওজন উপরে তুলতে থাকে। এ জন্য পায়ের বিভিন্ন পেশি এ সময় বেশি কাজ করা শুরু করে, তাই হৃদস্পন্দনও এ সময় বেড়ে যায়। ফলে এটি একই সঙ্গে হৃদযন্ত্রের সহনশীলতা ও পেশির শক্তি বাড়ানোর কাজে সাহায্য করে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অভ্যাস প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদযন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতার মতো বিষয়ও আছে। তবে এসব উপকার পেতে নিয়মিত এ অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার ৭টি সম্ভাব্য উপকার
হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত এই অভ্যাস হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটান, তাঁদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম যোগ করার এটি সহজ উপায়।
তবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা হৃদরোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। যাঁদের আগে থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করা উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে খাবারের মাধ্যমে পাওয়া ক্যালরির সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমের একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময় শরীর শক্তি ব্যয় করে। তাই নিয়মিত এই অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু সিঁড়ি ব্যবহার করলেই ওজন কমবে, এমন নয়। এর পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপও গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ের পেশি শক্তিশালী করে
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় উরু, নিতম্ব ও পায়ের পেশিগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করে। ফলে নিয়মিত অভ্যাস পায়ের পেশির শক্তি ও সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
এ ছাড়া শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিটি ধাপে পা ফেলতে হয় বলে চলাফেরার দক্ষতা ধরে রাখতেও এটি সহায়ক হতে পারে। তবে যাঁদের হাঁটু, গোড়ালি বা কোমরে ব্যথা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সিঁড়ি ব্যবহার করলে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
রক্তচাপ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে
নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামাও এই কার্যকলাপের একটি অংশ হতে পারে।
২০২৩ সালের গবেষণা পর্যালোচনায় নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সঙ্গে রক্তচাপ, রক্তের কোলেস্টেরল এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতার মতো কিছু স্বাস্থ্যসূচকের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ফলাফল ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরচর্চা করা ভালো।
মন ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে
শরীরচর্চা শুধু শরীরের জন্য নয়, মনের জন্যও উপকারী। কিছু সময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে শরীর সক্রিয় হয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে এটি করার ফলে ক্লান্তি বা অবসন্নতা কম অনুভূত হতে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে Journal of Cognitive Enhancement সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা জানায়, অল্প সময়ের জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পর অংশগ্রহণকারীদের মানসিক নমনীয়তা বা এক কাজ থেকে অন্য কাজে মনোযোগ সরানোর দক্ষতায় উন্নতি দেখা যায়। তারা নিজেদের তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্যমী ও আনন্দিত বলেও জানিয়েছেন।
তবে গবেষণাটিতে নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২ জন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। তাই এই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একই রকম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমাতে সাহায্য করে
অফিসে কাজ করা, পড়াশোনা করা কিংবা বাড়িতে দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করলে দিনের মধ্যে কিছুটা বাড়তি নড়াচড়া করা সম্ভব হয়।
একবারে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করতে না পারলেও দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে শরীর সক্রিয় রাখা যায়। তবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা এবং দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থাকার অভ্যাসও জরুরি।
অল্প সময়ে শরীরচর্চার সুযোগ তৈরি করে
সিঁড়ি ব্যবহার করার জন্য আলাদা করে জিমে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। বাড়ি বা অফিসে সিঁড়ি থাকলে দৈনন্দিন কাজের ফাঁকেই এই শারীরিক কার্যকলাপ করা যায়।
২০১৭ সালে Medicine and Science in Sports and Exercise সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা জানায়, অল্প সময়ের বিরতিতে জোরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অভ্যাস কয়েক সপ্তাহ ধরে চালিয়ে গেলে সুস্থ, নিষ্ক্রিয় নারীদের হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতায় উন্নতি দেখা যায়। তবে গবেষণায় ব্যবহৃত ব্যায়ামের ধরন ও সময় নির্দিষ্ট ছিল। তাই যে কেউ একই ফল পাবেন, তা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কতক্ষণ সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা উচিত?
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, ওজন এবং আগে থেকে কোনও অসুস্থতা আছে কি না, তার ওপর উপযুক্ত সময় ও পরিশ্রমের মাত্রা নির্ভর করে।
যারা নতুন করে শুরু করছেন, তারা প্রথমে এক বা দুই তলা ধীরে ওঠার চেষ্টা করতে পারেন। শরীর অভ্যস্ত হলে ধীরে ধীরে সময় বা সিঁড়ির সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। একটানা অনেকক্ষণ করার পরিবর্তে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে করলেও শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো সম্ভব।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ও সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি বা যাদের ভারসাম্যের সমস্যা আছে, তাদের জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় যাঁদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা সাধারণভাবে সহজ শারীরিক কার্যকলাপ হলেও সবার জন্য সমান উপযুক্ত নয়। কয়েকটি বিষয় এক্ষেত্রে মাথায় রাখা জরুরি। যেমন-
*) হাঁটুতে ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা পায়ের জোড়ায় সমস্যা থাকলে সিঁড়ি ব্যবহারে ব্যথা বাড়তে পারে।
*) হৃদরোগ, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বা গুরুতর শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
*) মাথা ঘোরা, ভারসাম্যের সমস্যা বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে সিঁড়ি ব্যবহারের সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
*) সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বুকব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে। তীব্র বা স্থায়ী উপসর্গ হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
*) প্রথম দিন থেকেই দ্রুত ওঠানামা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। ধীরে শুরু করে শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী গতি বাড়ানো ভালো।
*) লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানোর একটি সহজ উপায়। নিয়মিত সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা, পায়ের পেশির শক্তি এবং মানসিক সতেজতা বাড়াতে সাহায্য মিলতে পারে। তবে এর উপকার পেতে নিয়মিত অভ্যাস, সুষম খাবার এবং সামগ্রিকভাবে সক্রিয় জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের শারীরিক সক্ষমতা বুঝে শুরু করা। সবার জন্য একই পরিমাণ সিঁড়ি ওঠা প্রয়োজন নেই। শরীরের সংকেত বুঝে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তুললেই দৈনন্দিন জীবনে আরও বেশি নড়াচড়া করার সুযোগ তৈরি হবে।
সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
