রাস্তায় গোলাগুলি, চলমান ট্যাংক, সরকারি ভবনের ওপর নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমান, সংসদ ভবনে হামলা – সবকিছুই সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল টেলিভিশনে। তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরও দুটি সামরিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা থাকা একটি দেশের জন্যও ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের রাতটি ছিল নজিরবিহীন।
অজ্ঞাত একটি স্থান থেকে মোবাইল ফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সরাসরি একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে এরদোগান সেদিন রাতে তার সমর্থকদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। সারা দেশের মসজিদগুলোও তাদের লাউডস্পিকারের মাধ্যমে তার বার্তা প্রচার করে।
সকালের মধ্যেই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। মোট ২৫৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া কথিত ৩৪ জন ষড়যন্ত্রকারীও নিহত হন। অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি গত এক দশকে তুর্কি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। এতে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে এবং বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
সরকার বলেছিল, গুলেন নেটওয়ার্ককে ভেঙে দিতে এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। একসময় প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন গুলেন। তার ধর্মীয় আন্দোলনের সদস্যরা কয়েক দশক ধরে তুর্কি রাষ্ট্র ও আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
অভ্যুত্থানচেষ্টার পর হাজার হাজার সেনাসদস্য, যার মধ্যে পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও জেনারেলও ছিলেন, বিচারক, প্রসিকিউটর বা আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার, বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা শত শত বেসরকারি স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, পাশাপাশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ হয়। সমালোচকদের দাবি, এই দমন অভিযান শুধু কথিত অভ্যুত্থানকারী ও গুলেনপন্থিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আরও বিস্তৃতভাবে ভিন্নমত দমনেও ব্যবহৃত হয়।
বিরোধী রাজনীতিকদের অভিযোগ, শুদ্ধি অভিযানের পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
সমর্থকদের মতে, নতুন ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আরও কার্যকর শাসন নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এতে প্রেসিডেন্টের হাতে, বিশেষ করে একজন ব্যক্তির চারপাশে, অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউজ বলছে, রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার অধীনে নীতিনির্ধারণে আইনপ্রণেতাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়াও এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। তার মতে, প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা ‘খামখেয়ালিপনা এবং অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’ দ্বারা চিহ্নিত।
অধ্যাপক চেতিনকায়া বলেন, ১৫ই জুলাইয়ের পর তুরস্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং তারা তাদের স্বায়ত্তশাসন হারায়। বিচার বিভাগ এবং আইনসভা আর অর্থবহ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেনি।
এর পর থেকে জনসমাবেশ আয়োজন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষ প্রায়ই সমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করছে এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করছে। গণমাধ্যমের মালিকানার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিশিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার কারণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও দুর্বল হয়েছে।২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম।
ফ্রিডম হাউজ বলছে, গত এক দশকে তুরস্ক সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের কারাবন্দি করার মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে।
ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু, যাকে ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকেই, ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে আরও কয়েক ডজন পৌর কর্মকর্তা গ্রেফতার হন। যদিও তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বিচারপ্রক্রিয়া এখনো চলছে।
২০২৬ সালের মে মাসে একটি আদালতের আদেশ কার্যত তার দল, প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করে এবং বর্তমান নেতার পরিবর্তে একজন সাবেক নেতাকে দায়িত্ব দেয়। বিরোধীরা এ ঘটনাকে ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে সরকার গণতান্ত্রের যাত্রা পিছিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
সরকারের বক্তব্য হলো, অভ্যুত্থানচেষ্টা এবং পরবর্তী শুদ্ধি অভিযানের পর গৃহীত পরিবর্তনগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অপসারণ করা হয়েছে।
ইয়িলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নুরি সালিক বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাকে আমি অভ্যুত্থানচেষ্টার মাধ্যমে উন্মোচিত অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের গড়ে তোলা একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি। এটিকে শুধু কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখি না; বরং রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে দেখি।
তুরস্ক ওয়াইপিজি-কে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করে। পিকেকে-কে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিকেকে-এর সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ দেখা গেছে, যদিও অগ্রগতি এখনো অনিশ্চিত।
অধ্যাপক সালিকের মতে, ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা তুর্কি রাষ্ট্রের ভেতরে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সুরক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল।
একই সময়ে, নেটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আরও বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। রাশিয়ান এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-থার্টিফাইফ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়।
তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন এবং এফ-থার্টিফাইফ বিক্রির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও এমন কোনো পদক্ষেপ কংগ্রেসে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
