ডেটা সেন্টারেই কেন হামলা?

প্রতিবেদন:

·

, ,

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট ও ক্লাউড প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠেছে ডেটা সেন্টার। ব্যাংক, হাসপাতাল, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে শুরু করে সরকারি সেবার বড় একটি অংশ এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে সামরিক অভিযানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় ডেটা সেন্টার এখন যুদ্ধেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বিভিন্ন দেশের সংঘাতে এসব স্থাপনা সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে।

চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালালে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানে তেহরান। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে ওই সময় ইরানের হামলার আরেকটি দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আসে—ডেটা সেন্টারে হামলা।

এরপর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেও ডেটা সেন্টার লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হামলা যুদ্ধের নতুন একটি ক্ষেত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আধুনিক অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের প্রযুক্তিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করা স্থাপনাগুলো এখন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার?

এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে কম্পিউটিং ক্ষমতা, তথ্য সংরক্ষণ এবং ক্লাউড সেবার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে।

ডেটা সেন্টার হলো এমন বিশেষ স্থাপনা, যেখানে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য সার্ভার এবং অন্যান্য কম্পিউটার সরঞ্জাম রাখা হয়। ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সেবা, এআই মডেল পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল কার্যক্রমের বড় অংশ এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড কম্পিউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কার্ক ক্যামেরন টাইমকে বলেন, আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য ডেটা সেন্টার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ডেটা সেন্টার ধ্বংস হলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে, জিপিএস সেবা ব্যাহত হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি পরিবহনব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি সহায়তা, সরকারি কার্যক্রম এবং বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ ডেটা সেন্টারে হামলার প্রভাব শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়তে পারে একটি দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

যুদ্ধে ডেটা সেন্টারের ভূমিকা

আধুনিক যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের সামরিক গুরুত্বও বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের লক্ষ্য নির্ধারণ, যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহার করছে।

মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি পরীক্ষা ও উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এআই-চালিত অস্ত্রব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও হামলার লক্ষ্য শনাক্ত করতে প্যালান্টিরের ‘ম্যাভেন’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে।

বিশেষজ্ঞ ক্যামেরনের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ডেটা সেন্টার কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারলে প্রতিপক্ষের সামরিক অভিযান গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের হামলা অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।

কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে?

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলা

এ বছরের মার্চে ডেটা সেন্টারে হামলার প্রথম বড় ঘটনা ঘটে। ওই সময় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের দুটি স্থাপনায় হামলা চালায়। বাহরাইনে অ্যামাজনের আরেকটি স্থাপনাও কাছাকাছি একটি ড্রোন হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওই দুটি স্থাপনার কার্যক্রম মূলত বন্ধ রয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর অ্যামাজন জানায়, ওই দুই অঞ্চলের ডেটা সেন্টারে সংরক্ষিত তথ্য ও অন্যান্য সম্পদে প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধার করতে তারা তখনো সক্ষম হয়নি।

এ ঘটনা দেখিয়েছে, ডেটা সেন্টারে হামলার ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সার্ভার বা ভবন মেরামত করলেই সব সেবা দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হয় না; তথ্য ও ডিজিটাল সেবা পুনরুদ্ধারেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারগুলোতে রাশিয়ার হামলায় টেলিভিশন সম্প্রচার ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করে, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও আদান-প্রদানে ব্যবহৃত হওয়ায় এসব ডেটা সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রাশিয়া এসব স্থাপনাকে শুধু বেসামরিক প্রযুক্তি অবকাঠামো হিসেবে নয়, ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবেও বিবেচনা করছে।

রাশিয়ায় ইউক্রেনের পাল্টা হামলা

গত ৮ অক্টোবর থেকে রাশিয়ার ডেটা সেন্টারে পাল্টা হামলা শুরু করে ইউক্রেন। এরপর দেশটি রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইয়ানডেক্সের তিনটি ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলা চালায়। ইয়ানডেক্সকে প্রায়ই রাশিয়ার গুগল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

মেদুজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সাসোভো শহরে অবস্থিত হামলার শিকার প্রথম স্থাপনাটিতে ইয়ানডেক্সের এআই মডেল তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি সুপার কম্পিউটারের মধ্যে দুটি ছিল।

ওই স্থাপনায় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ইয়ানডেক্সের ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভরশীল একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ছিল রুশ রেলওয়েজ, মেগাফোন, টি-ব্যাংক এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।

প্রথম হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পাল্টা পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, তারা সব সময় একই ধরনের জবাব দেন। তার ভাষ্য, রাশিয়া ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারে বারবার হামলা চালাচ্ছে, তাই ইউক্রেনও পাল্টা হামলা করেছে।

হামলার পর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনায় পরিবর্তন

ডেটা সেন্টারে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব স্থাপনা কোথায় এবং কীভাবে নির্মাণ করা হবে, তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

ইরানের হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঁচ গিগাওয়াট সক্ষমতার একটি এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় আবুধাবিতে প্রায় ১০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে একটি বিশাল কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা ছিল। প্রকল্পটিতে ওরাকল, এনভিডিয়া ও সিসকোর মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব থাকার কথা ছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছে, নতুন পরিকল্পনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হতে পারে। এতে একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় হামলা হলেও পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

ডেটা সেন্টারে হামলা কি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা?

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গোয়েন্দা, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি কর্মসূচির পরিচালক এমিলি হার্ডিং মনে করেন, ডেটা সেন্টার যুদ্ধের নতুন সম্মুখসারিতে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কৌশলও নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে মাইক্রোসফটের কোনো ডেটা সেন্টারে হামলা চালায়, তাহলে সেটিকে কি ইউক্রেনের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে? নাকি মাইক্রোসফটের ওপর হামলা, অথবা একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও পড়তে পারে?

হার্ডিংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সাধারণভাবে এমন নীতি অনুসরণ করেছে যে মার্কিন কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা হলেই সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার নতুন নীতি প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ডেটা সেন্টারগুলো একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, বেসামরিক ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামরিক কার্যক্রমে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ফলে এসব স্থাপনায় হামলার আইনি ও কৌশলগত পরিণতি কী হবে, তা নির্ধারণ করা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও কি বাড়ছে ঝুঁকি?

উপসাগরীয় অঞ্চল, রাশিয়া ও ইউক্রেনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ডেটা সেন্টারে হামলার আশঙ্কা তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে এআই প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভবন নির্মাণের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

হার্ডিং বলেন, ডেটা সেন্টারের মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পারছে যে এসব স্থাপনা পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা কঠিন। এ পরিস্থিতি ক্লাউড প্রযুক্তির প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

তার মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠান তার ডেটা সেন্টারের অবস্থান ও নিরাপত্তা আরো ভালোভাবে গোপন রাখতে পারলে গ্রাহকেরা অন্য প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে তাদের সেবা বেছে নেবেন।

এআইয়ের চাহিদা পূরণে যখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে, তখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, একটি ডেটা সেন্টারে হামলা শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ক্ষতি নয়; এর মাধ্যমে একটি দেশের যোগাযোগ, অর্থনীতি, সরকারি সেবা এবং সামরিক সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।