ওয়ারিশদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন হবে মুক্তিযোদ্ধা ও পেনশনের ভাতা

প্রতিবেদন:

·

,

একজনের বাবা সরকারি কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তার মাসিক পেনশন এবং মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে প্রশ্ন করে সন্তান। প্রশ্ন হলো- ১. বাবার মৃত্যুর পর তার মাসিক পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধার ভাতা শরীয়তের দৃষ্টিতে মা, ভাই ও বোনদের মধ্যে কীভাবে বণ্টিত হবে? কে কতটুকু পাবে? উক্ত টাকা থেকে কি আমার মৃত বাবার পক্ষ থেকে যাকাত ও কুরবানি আদায় করতে হবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন- লন্ডনের সাফীর এডুকেশনের চেয়ারম্যান শায়খ ড. আবুল কালাম আজাদ মাদানী।

তিনি উত্তরে লিখেছেন-

الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، أما بعد:

আল্লাহ তাআলা আপনার বাবাকে ক্ষমা করুন, তার নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে তিনটি বিষয়কে আলাদাভাবে বুঝতে হবে—মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি, মৃত্যুর পর সরকারপ্রদত্ত পারিবারিক পেনশন বা ভাতা এবং মৃত ব্যক্তির যাকাত ও কুরবানির বিধান।

এই তিনটির বিধান সব ক্ষেত্রে এক নয়।

১. পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধার ভাতা কি মিরাস বা উত্তরাধিকার সম্পত্তি?

ইসলামে মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদ তার বৈধ ওয়ারিশদের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে বণ্টিত হয়। কিন্তু মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকার যে আর্থিক সুবিধা প্রদান করে, তা সব ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না।

এখানে দুটি পরিস্থিতি রয়েছে।

প্রথম পরিস্থিতি: বাবার জীবদ্দশায় প্রাপ্য অর্থ

আপনার বাবা জীবিত অবস্থায় যে বেতন, পেনশন, ভাতা বা অন্য কোনো অর্থের মালিক হয়েছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর আগে তা গ্রহণ করতে পারেননি, সেই অর্থ সাধারণভাবে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ ধরনের অর্থ শরীয়তের মিরাসের বিধান অনুযায়ী বণ্টিত হবে।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি: বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের জন্য প্রদত্ত অর্থ

সরকার যদি বাবার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, সন্তান বা নির্দিষ্ট উপকারভোগীদের জন্য নতুনভাবে পারিবারিক পেনশন বা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা প্রদান করে, তাহলে সেই অর্থের প্রকৃতি ভিন্ন।

যদি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী এটি নির্দিষ্ট জীবিত উপকারভোগীর নিজস্ব প্রাপ্য হয়, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত ব্যক্তির মিরাসে পরিণত হবে না।

অতএব, মাসিক পারিবারিক পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতাকে সরাসরি মিরাস ধরে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে ভাগ করে দেওয়া সঠিক হবে না। আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি ও অর্থের মালিকানা নির্ধারণ করতে হবে।

২. বাংলাদেশের সরকারি পেনশনের ক্ষেত্রে কার অধিকার কতটুকু?

বাংলাদেশ সরকারের পেনশন ও ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কার্যালয়ের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, মূল পেনশনভোগী, তার স্ত্রী এবং যোগ্য প্রতিবন্ধী সন্তান আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধানের আওতায় থাকতে পারেন। অন্যান্য সন্তানদের ক্ষেত্রে বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ও প্রযোজ্য শর্ত বিবেচ্য।

সুতরাং আপনার মা জীবিত থাকলে এবং তিনি পারিবারিক পেনশনের বৈধ উপকারভোগী হলে, তার প্রাপ্য অর্থকে কেবল উত্তরাধিকারী হওয়ার কারণে সব ভাই-বোন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারবেন না।

অন্যদিকে, সরকারি আদেশ অনুযায়ী কোনো সন্তানও যদি পেনশনের অংশীদার হন, তাহলে তাঁর নির্ধারিত অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার ক্ষেত্রেও একই মৌলিক নীতি প্রযোজ্য। মৃত্যুর পর কারা ভাতা পাবেন এবং কীভাবে পাবেন, তা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রযোজ্য বিধিমালা ও মঞ্জুরি আদেশ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৬ সালেও এ-সংক্রান্ত সরকারি ভাতা ও সুবিধার বিষয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে।

এ কারণে আপনার মা, ভাই ও বোনদের প্রত্যেকের জন্য এখনই নির্দিষ্ট শতাংশ বলা সম্ভব নয়।

৩. বাবার প্রকৃত উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি কীভাবে বণ্টিত হবে?

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ

অর্থাৎ, “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন—একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১১)

আর মৃত ব্যক্তি সন্তান রেখে গেলে তাঁর স্ত্রীর অংশ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

فَإِنْ كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمْ

“আর তোমাদের সন্তান থাকলে তোমরা যা রেখে যাবে, তার এক-অষ্টমাংশ তাদের (স্ত্রীদের) জন্য।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১২)

অর্থাৎ, আপনার বাবার প্রকৃত মিরাসযোগ্য সম্পত্তিতে সাধারণভাবে: আপনার মা (বাবার একমাত্র স্ত্রী হলে) পাবেন এক-অষ্টমাংশ বা ১২.৫ শতাংশ।

অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রত্যেক ছেলে দুই অংশ এবং প্রত্যেক মেয়ে এক অংশ হিসেবে বণ্টিত হবে।

তবে এই হিসাব তখনই প্রযোজ্য, যখন বাবার মৃত্যুকালে তাঁর বাবা-মা বা অন্য কোনো অংশপ্রাপ্ত ওয়ারিশ জীবিত ছিলেন না এবং অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক বাধা নেই।

উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকেন এবং অন্য কোনো ওয়ারিশ না থাকেন, তাহলে প্রয়োজনীয় ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তির পর মিরাসযোগ্য সম্পত্তির বণ্টন হবে: স্ত্রী ১২.৫%, প্রথম ছেলে ২৯.১৬৬৭%, দ্বিতীয় ছেলে ২৯.১৬৬৭%, প্রথম মেয়ে ১৪.৫৮৩৩%, দ্বিতীয় মেয়ে ১৪.৫৮৩৩%। এই হিসাব কেবল মিরাসযোগ্য সম্পত্তির জন্য; সরকারি পারিবারিক পেনশন বা মৃত্যুর পর প্রদত্ত ভাতার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।

৪. মৃত বাবার পক্ষ থেকে কি যাকাত আদায় করতে হবে?

এখানে দুটি বিষয় আলাদা।

প্রথমত: বাবার জীবদ্দশার অনাদায়ী যাকাত। আপনার বাবার জীবদ্দশায় যদি যাকাত ফরজ হয়ে থাকে, অথচ তিনি তা আদায় না করে মারা যান, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অনাদায়ী যাকাত মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে পরিশোধের বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষত হানাফি ফিকহে মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত না করে গেলে ওয়ারিশদের ওপর তার সম্পত্তি থেকে যাকাত আদায় বাধ্যতামূলক বলে গণ্য করা হয় না। তবে ওয়ারিশরা নিজেদের অংশ থেকে স্বেচ্ছায় আদায় করতে পারেন। অন্যান্য ফিকহি মত অনুযায়ী অনাদায়ী যাকাত মৃতের সম্পত্তি থেকে পরিশোধযোগ্য।

সুতরাং বাবার অনাদায়ী যাকাতের পরিমাণ জানা থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমের সহায়তায় তা নিষ্পত্তি করা উচিত।

দ্বিতীয়ত: বাবার মৃত্যুর পর পাওয়া পেনশন ও ভাতা। বাবা মারা যাওয়ার পর তার নামে নতুন করে যাকাত ফরজ হয় না। কিন্তু পেনশন বা ভাতা যিনি বৈধভাবে মালিকানায় পাবেন, তার অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদের সঙ্গে এই অর্থ যুক্ত হবে।

যদি তার সম্পদ নিসাব পরিমাণে পৌঁছে এবং প্রযোজ্য শর্ত পূরণ হয়, তাহলে তার নিজের ওপর যাকাত ফরজ হবে। যাকাতের সাধারণ হার ২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, মায়ের মালিকানাধীন পেনশনের টাকা থেকে মৃত বাবার নামে প্রতি বছর যাকাত দিতে হবে—এমন কোনো বিধান নেই। তবে মায়ের নিজের যাকাত ফরজ হলে তিনি তা আদায় করবেন।

৫. বাবার পক্ষ থেকে কি প্রতিবছর কুরবানি দিতে হবে?

না। মৃত বাবার নামে প্রতিবছর কুরবানি দেওয়া সন্তানদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। কুরবানি জীবিত ব্যক্তির ওপর তার সামর্থ্য ও প্রযোজ্য ফিকহি বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কুরবানির দিনগুলোতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন, মুকিম মুসলিমের কাছে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয়।

তাই আপনার মা, ভাই বা বোনদের মধ্যে যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করবেন।

অবশ্য সন্তানরা চাইলে বাবার জন্য নফল কুরবানি করে সওয়াব পৌঁছাতে পারেন। এটি সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু প্রতি বছর করা বাধ্যতামূলক নয়।

বাবা যদি কুরবানির বিষয়ে কোনো বৈধ ওসিয়ত করে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার বিধান পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

৬. আপনাদের এখন কী করা উচিত?

প্রথমে বাবার পেনশন মঞ্জুরি আদেশ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মঞ্জুরি আদেশ এবং ওয়ারিশদের বিবরণ সংগ্রহ করুন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২০ সালের সম্মানী ভাতা বিতরণ আদেশ, ২০২১ সালের সংশোধনী এবং ২০২৫ সালের একাধিক ওয়ারিশের প্রাপ্যতার হার-সংক্রান্ত স্পষ্টীকরণ দেখে প্রকৃত প্রাপ্য নির্ধারণ করতে হবে।

এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার সরকারি বিধানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জীবিত স্ত্রী সম্পূর্ণ ভাতা পেতে পারেন; আবার একাধিক যোগ্য উপকারভোগী থাকলে ভিন্ন বণ্টন হতে পারে। তাই এটিকে কুরআনের সাধারণ মিরাসের অনুপাতের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

সারকথা হলো- ১. বাবার প্রকৃত পরিত্যক্ত সম্পত্তি শরীয়তের মিরাস অনুযায়ী বণ্টিত হবে। ২. মৃত্যুর পর সরকারপ্রদত্ত পারিবারিক পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি অনুযায়ী বৈধ প্রাপকের মালিকানায় যাবে। ৩. মৃত বাবার নামে নতুন করে যাকাত ফরজ হবে না। তবে তার জীবদ্দশার অনাদায়ী যাকাত থাকলে তার বিধান বিবেচনা করতে হবে। ৪. বাবার নামে প্রতি বছর কুরবানি করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে তাঁর জন্য নফল কুরবানি ও সদকা করা যেতে পারে। ৫. মা ও ভাই-বোনদের সঠিক অংশ নির্ধারণের আগে সরকারি মঞ্জুরি আদেশ ও সব ওয়ারিশের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতি বজায় রাখুন এবং আপনাদের বাবার জন্য উত্তম প্রতিদানের ব্যবস্থা করুন।

آمين يا رب العالمين

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ