দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে খুচরা (রিটেইল) ঋণ গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত একবছরে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণসংবলিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে চলতি বছরের মার্চমাসের শেষে প্রায় ৪৬ লাখে পৌঁছেছে। এর বেশিরভাগই ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের হিসাব, যা সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ছোট ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ রয়েছে— এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। অর্থাৎ মাত্র একবছরের ব্যবধানে এ ধরনের খেলাপি হিসাবের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, খুচরা ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এই অবনতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে স্থবিরতা এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি করলেও বিপুল সংখ্যক ছোট ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে পড়া অর্থনীতির ভেতরে গভীর আর্থিক দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। কারণ এটি সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়া ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাতও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে এই হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে, বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংক বাদে অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকে গত এক বছরে খুচরা ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। তবে সেই সঙ্গে বেড়েছে খেলাপি হিসাবের সংখ্যাও।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুটির শিল্প খাত বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যবসা, কৃষি ও শিল্প— প্রায় সব খাতেই গত এক বছরে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সম্পদের গুণগত মান, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শুধু বড় ঋণগ্রহীতাদের নয়, ক্ষুদ্র ও খুচরা ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও শক্তিশালী করা এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো না গেলে ব্যাংকিং খাতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
