ইরান কেন মার্কিন নৌবাহিনী ও ইসরায়েলকে এড়িয়ে চলছে?

প্রতিবেদন:

·

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে হামলার মাত্রা বাড়াচ্ছে, তখন তেহরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। তারা উপসাগরীয় দেশ এবং জর্ডানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানছে। কিন্তু নিজেদের উপকূলের কাছে থাকা মার্কিন নৌবহর ও ইসরায়েলকে এড়িয়ে চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের পরিধি না বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করা। ওয়াশিংটন ইরানের রেলস্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং পানি শোধনের অবকাঠামোতে আঘাত হানছে। জবাবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনের বেসামরিক বিমানবন্দর, পানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে।

এই কৌশলের পেছনে যুক্তি আছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। 0প্রশ্ন হলো ইরান কেন এবারও প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে?

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাগিয়ানির যুক্তি হলো- যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে কুয়েতকে ব্যবহার করে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে। গত মার্চ-এপ্রিলে প্রথম দফা যুদ্ধের সময় ইরানি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, মার্কিন অভিযানগুলো উপসাগরীয় দেশের ভূখণ্ডে থাকা সামরিক ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এবারও তারা একই যুক্তি দিচ্ছেন।

অজ্ঞাত স্থান থেকে উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে আইআরজিসি।

এমন বক্তব্যের কারণে তেহরান ও প্রতিবেশীদের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার বলেছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।

আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাগিয়ানি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী- যে দেশ থেকে হামলা হবে, সেই দেশের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার অধিকার ইরানের আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানগুলো ইচ্ছা করেই ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো টার্গেট করছে। কারণ, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শত্রুতা আরও বাড়াতে চায়। সেটি হলে ইরানিদের জন্য পাল্টা জবাব দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

ইরান ‘ভয়ে’ আছে
তাগিয়ানির মন্তব্যকে পুরোনো ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শায়জি। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হচ্ছে- এই দাবি আর গ্রহণযোগ্য বা বাস্তবসম্মত নয়।

কারণ সব আঘাত আসছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী জর্জ ডব্লিউ বুশ ও আব্রাহাম লিংকন থেকে। সেগুলো ইরানি উপকূলের ১৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরে নয়। আল-শায়জির মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহারের বিষয়ে ইরানিরা কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। কারণ, ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করার আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করেননি এবং আগে সম্মত হওয়া কোনো বিষয়ও মানেননি।

ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কুয়েত বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন কর্মকর্তারা।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বন্দর আল-ওতাইবিও আল-শায়জির মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। দুই পক্ষই যাচাই-বাছাই করে কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে।

আল-ওতাইবি বলেন, নিজেদের জন্য ‘নরকের দরজা’ খুলে যাওয়ার ভয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌসম্পদে হামলা এড়িয়ে যাচ্ছে। বরং তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে। যদিও সেটা আর খুব একটা কার্যকর নয়।

নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তু
ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানেও ইরান হামলা করছে না। এর কারণ হিসেবে আল-ওতাইবি বলেন, তেহরান যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে চায় না। উপসাগরীয় দেশগুলোকে টার্গেট করে তারা বরং অভ্যন্তরীণ জনমতকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।

আল-ওতাইবি জানান, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি মাসকাট সফর করেন। এর একদিন পরই ইরান ওমানে হামলা করেছে। এটা দুই দেশের আলোচনার ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। পাশাপাশি তেহরানের একটি ইচ্ছাকেও তুলে ধরে। সেটি হলো- তারা হরমুজ প্রণালির ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ চায়, ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগিতে রাজি নয়।

নতুন করে মার্কিন হামলা শুরুর পর ইয়েমেনের হুতিরা এখন পর্যন্ত সংঘাত থেকে দূরে আছে। তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর মতো ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চাইছে। আল-ওতাইবির মতে, এর ফলে তেহরানের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ