আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট এবং একজন জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেন।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ–ভিত্তিক এ আন্তর্জাতিক আদালতের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই নেওয়া হলো এই সর্বশেষ পদক্ষেপ।
যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে আইসিসি গঠিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ আদালতের সদস্য নয়।
আদালতের স্বাগতিক দেশ নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নেদারল্যান্ডস তার অসম্মতি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের ধারাবাহিক সমর্থনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি তোমোকো আকানেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
টম বেরেন্ডসেন আরও লেখেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোর স্বাধীনভাবে নিজেদের ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ থাকা উচিত।’
আইসিসির শীর্ষ বিচারক তোমোকো আকানে গত ডিসেম্বরেই সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা ‘সব ধরনের পরিস্থিতি ও মামলায় আদালতের কার্যক্রমকে দ্রুত স্থবির করে দেবে এবং এর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে।’
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভবনের বাইরের দৃশ্য
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অতীতের একটি তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরে গত বছর আদালতের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন।
এদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত প্রায় সব ব্যাংকেরই নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) গতকাল একটি সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করেছে। এর আওতায় তোমোকো আকানে এবং আবদুলায়ে সেয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনগুলো গুটিয়ে নিতে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চলতি বছরের জুনে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আইসিসির তিন বিচারক। এ পদক্ষেপকে বেআইনি বলে দাবি করেন তাঁরা।
এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দুটি আলাদা মামলায় বলেছে, বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে যেসব সংস্থা কাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ তৎপরতা তাদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
মার্কো রুবিও গত মাসে বলেছিলেন, আইসিসির কার্যক্রম ব্যাহত করতে মার্কিন প্রশাসন তাদের চেষ্টা আরও জোরদার করবে। এর অংশ হিসেবে অন্য দেশগুলোকে এ সংস্থা ত্যাগ করতে রাজি করানোর জন্য একটি কূটনৈতিক প্রচারণাও চালানো হবে। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।
রুবিওর যুক্তি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা, মাদক বহনের অভিযোগে নৌযানে অভিযান পরিচালনাকারী দল এবং অন্যান্য মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য এ আদালত এক বড় হুমকি।
অবশ্য ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এ প্রচারণার লক্ষ্য নিজেকে বিচার থেকে বাঁচানো নয়, বরং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যদের রক্ষা করা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত
যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ আদালতের সদস্য ছিল না। কোনো সদস্যরাষ্ট্র যখন নিজের দেশে ঘটে যাওয়া কোনো নৃশংসতার বিচার করতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হয়, শুধু তখনই আইসিসি সেখানে নিজের এখতিয়ার খাটায়।
তবে আইসিসির সংবিধিতে এ-ও বলা আছে যে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে যদি সদস্য নয় এমন কোনো দেশের নাগরিকও নৃশংস অপরাধ করেন, তবে তাঁর বিচার করার ক্ষমতা এ আদালতের রয়েছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
