শিক্ষা

  • শিক্ষায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ: প্রধানমন্ত্রী

    শিক্ষায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ: প্রধানমন্ত্রী

    শিক্ষা ডেস্ক:

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

    তিনি বলেন, সরকার চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে।

    গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

    তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যাবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।’

    তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ এবং পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার এবং স্কুলে শিক্ষার মান বাড়বে।’

    প্রধানমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো ‘স্পোর্টস’কেও একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

    তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি’র ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।

    প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

  • এতিম মেয়েদের শিক্ষার আশ্রয়স্থল হাবিবে জান্নাত

    এতিম মেয়েদের শিক্ষার আশ্রয়স্থল হাবিবে জান্নাত

    শেরপুরের নকলা উপজেলায় এতিম ও অসহায় মেয়েদের ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে নিতে কাজ করছে হাবিবে জান্নাত মহিলা এতিমখানা।

    সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, আবাসন, খাবার ও সামগ্রিক পরিবেশের খোঁজ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি আলহাজ মো. মনিরুজ্জামান জানান, নিরাপদ ও নিরিবিলি পরিবেশে এতিম ও অসহায় মেয়েদের নূরানি, নাজেরা, হিফজ ও কিতাব শাখায় মিশকাত জামাত পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

    প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাবিবে জান্নাত মহিলা এতিমখানায় ৪৫ জন এতিম এবং ৫৩ জন দুস্থসহ প্রায় ৩০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। তাদের শিক্ষা ও আবাসনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

    তবে সম্প্রতি কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

    তাঁরা বলেন, এতিম ও অসহায় মেয়েদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সবার সহযোগিতা পেলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।

  • ম্যানেজিং কমিটির হাতেই যাচ্ছে শিক্ষক নিয়োগ, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ‘চূড়ান্ত’

    ম্যানেজিং কমিটির হাতেই যাচ্ছে শিক্ষক নিয়োগ, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ‘চূড়ান্ত’

    বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার ‘চূড়ান্ত’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করতে পারবে না।আজ সোমবার দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

    প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ আগস্ট সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

    সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান সভায় অবহিত করেন, ২০০৫ সালের ১ নম্বর আইন ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রণীত ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা, ২০০৬’ অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের জন্য প্রার্থীদের যোগ্যতা নিরূপণ এবং এ বিষয়ে প্রত্যয়নপত্র প্রদানের উদ্দেশে প্রতি পঞ্জিকা বর্ষে অন্তত একবার পরীক্ষা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা রয়েছে।

    বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) সর্বশেষ ২০২৩ সালে নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সে প্রেক্ষিতে ১৯তম এনটিআরসিএ শিক্ষক (প্রবেশ পর্যায়) নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

    ওই সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন জানান, ২০০৫ সাল হতে ২০১৫ সালের পূর্বে এনটিআরসিএ কেবলমাত্র নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএর সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নিয়োগ সুপারিশ করার পর থেকে বিভিন্ন জটিলতা, মামলা এবং অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

    মন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং একটি সুস্থ ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার নিমিত্তে নিরলসভাবে কাজ করছে। এনটিআরসিএর বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে পূর্বের ন্যায় এনটিআরসিএ কর্তৃক কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং প্রত্যয়নপত্রধারী শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীর অভিমতের সঙ্গে সভায় উপস্থিত সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

    কার্যবিবরণীতে সভার সিদ্ধান্তে লেখা হয়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ অনুযায়ী এখন থেকে এনটিআরসিএ কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী আর নিয়োগের সুপারিশ করবে না। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, সভার সিদ্ধান্ত মতে, ‘১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯৮৪২ জন তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বউদ্যোগে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিপত্র/প্রজ্ঞাপন সংশোধন/জারি করতে হবে।

    শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যম বলছে, ওইদিনের সভার কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হবে। এনটিআরসিএ আর নিয়োগের সুপারিশ করবে না। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হবে।

    উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম এক দশক সংস্থাটি কেবল শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে সনদ দিত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সংস্থাটি নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে। ফলে ঘুস ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত হয়ে যায়। সুফল ভোগ করে অসংখ্য মানুষ। এ পর্যন্ত সংস্থাটি ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে।

  • এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

    এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

    চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। আজ সোমবার সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফল প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ।

    ২০২৬ সালে জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন।

    ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে (১১টি শিক্ষা বোর্ড) গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী।

    ফল প্রকাশের পর দুপুর থেকে পরীক্ষার্থীরা অনলাইনে, নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মুঠোফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারবেন।

    এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন।

    ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়।

    সারা দেশে ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবারের পরীক্ষায় অংশ নেয়।

    বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকতারুজ্জামান জানিয়েছেন, নির্ধারিত ওয়েবসাইট ও এসএমএসের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও ফল সংগ্রহ করা যাবে।

  • চৌগাছায় বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা দেয়া ঋতু এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। শংকায় উচ্চ শিক্ষা।

    চৌগাছায় বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা দেয়া ঋতু এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। শংকায় উচ্চ শিক্ষা।

    আজিজুর রহমান, চৌগাছা (যশোর)

    এসএসসি পরীক্ষার মানবিক বিভাগে যখন ফেলের সংখ্যা বেশি, তখন ক্যান্সারের রোগী বাবার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় বসা চৌগাছার ঋতু খাতুন জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।

    সে যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তবে পরিবারের একমাত্র উপার্জনাক্ষম বাবাকে হারিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শংকায় পড়েছে অদম্য মেধাবী মেয়েটি।

    ঋতু খাতুন উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির ২ মেয়ের মধ্যে ছোট।

    ঋতুর পরিবার ও স্কুল সূত্রে জানা যায়, ঋতুরা দুই বোন। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ক্যান্সার আক্রান্ত বাবাকে বাড়িতে রেখে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু করে ঋতু। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ঋতুর বাবা কবির হোসেন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১০ মে ঋতুর বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা পরীক্ষা ছিলো। সেদিন ভোর রাতে ঋতুর বাবা হাসপাতালে মারা যান। লাশ বাড়িতে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয় সকালেই। অন্যদিকে উপজেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দুরের গ্রাম হাকিমপুর থেকে চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঋতুর পরীক্ষা। ঋতুকে পরিবারের পক্ষ থেকে জানতে দেয়া হয়নি যে তার বাবা মারা গেছেন। পরে ঋতু পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌছানোর পর লাশ নেয়া হয় বাড়িতে। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে গিয়ে ঋতু জানতে পারে বাবা আর ইহজগতে নেই। শেষ বারের মত বাবার মুখ দেখে বিদায় দিয়ে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বসতে হয় তার। বাবা হারানোর শোক নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করে ঋতু। ১০ আগস্ট রেজাল্টের পর দেখা যায় ঋতু জিপিএ-৫ পেয়েছে।

    রেজাল্টের পর প্রতিক্রিয়ায় ঋতু জানায়, বাবা বেচে থাকলে রেজাল্ট দেখে খুবই খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়াও প্রার্থনার পাশাপাশি বাবার অবর্তমানে নিজের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শংকার কথাও জানিয়েছে সে।

    স্কুলের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শাহানা খাতুন জানান, ঋতু খুবই মেধাবী। ঋতু ভালো করবে এটা শিক্ষকরা প্রত্যাশা করতেন। অসুস্থ বাবা ও পরিবারের দারিদ্রতার বাঁধা ঋতুর ফলাফলে কোন বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি। স্কুলের শিক্ষকদের প্রত্যাশা ঋতু ভবিষ্যতেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে। দিন মজুর বাবা হারা ঋতুর জন্য সমাজের বিত্তবানদের ঋতুর পাশে দাড়ানোর আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, কোন শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারলে ঋতুর উচ্চ শিক্ষা সহজ হবে।

    চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, এটি খুবই খুশির সংবাদ। উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবীর পাশে থাকবে। ঋতৃর উচ্চ শিক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে বলেও জানান তিনি।

  • চাটমোহরে ৪৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষককে শোকজ

    চাটমোহরে ৪৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষককে শোকজ

    পাবনার চাটমোহরে ৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শতাধিক শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে উপজেলার শিক্ষা অফিস।

    বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাটমোহর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল গনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

    তিনি জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যা জ্ঞান (এফএলএন) কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় উপজেলার ৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ শতাধিক সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।

    বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল গনি কারণ দর্শানোর নোটিশের বিষয়ে বলেন, কয়েক মাস আগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জারি করা শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যা জ্ঞান (এফএলএন) কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় তাদের বিররুদ্ধে এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

    উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় গত ৩০ জুনের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা পাঠদক্ষতা, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিতের চারটি মৌলিক নিয়ম (যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাবলীল ইংরেজি পাঠ দক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

    নোটিশে উল্লেখ করা হয়, একাধিক নির্দেশনা ও তদারকির পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এ অবস্থায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

    যে সব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, পৌর সদরের শালিখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিলচলন ইউনিয়নের দোলং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মথুরাপুর ইউনিয়নের ভাদড়া ও উথুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিপুর ইউনিয়নের ধরইল, হরিপুর, লাউতিয়া ও চড়ইকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মূলগ্রাম ইউনিয়নের আটলংকা, খতবাড়ি পুরানপাড়া, শুইগ্রাম, বামনগ্রাম-১, বামনগ্রাম-২, ভবানীপুর ও নেউতিগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফৈলজানা ইউনিয়নের ফৈলজানা, কুয়াবাসি, পবাখালী, ঈদিলপুর, শরৎগঞ্জ, জগন্নাথপুর, কচুগাড়ী, ঝবঝবিয়া, ঘাসিখোলা, লক্ষীপুর, সাইপাই, দীঘুলিয়া, কুঠিপাড়া, দিয়ারপাড়া, মেঘারপাড়া,কচিয়া, সোহাগবাড়ী ও লক্ষীপুর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের আলমনগর, বোয়ালিয়া, বনগ্রাম, আড়িংগাইল, বারকোনা, বালুদিয়ার, জামালপুর, ও বনগ্রাম চকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের দিলালপুর, কাটাখালী ও ধানবিলা ফয়েজ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

    নোটিশপ্রাপ্ত একাধিক শিক্ষক জানান, অভিভাবকদের উদাসীনতা, শিক্ষার্থীদের মনযোগের অভাব, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় হওয়ায় যাতায়াতের সমস্যাসহ শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তারা লিখিত ব্যাখ্যা দেবেন বলে জানান।

    উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল গনি বলেন, উপজেলার ৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কোনো বিদ্যালয়ে চার জন শিক্ষক, কোনো বিদ্যালয়ে তিন জন শিক্ষক রয়েছেন। আবার অনেক বিদ্যালয়ে এর চেয়েও বেশি শিক্ষক আছেন। নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

    প্রসঙ্গত, পাবনা জেলার ৯টি উপজেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বাংলা, ইংরেজী গণিতে শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত শিখনফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এসকল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকদের কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।

  • নির্যাতন নয়, স্নেহ ভালোবাসায় বিকশিত হোক প্রতিটি শিশু

    নির্যাতন নয়, স্নেহ ভালোবাসায় বিকশিত হোক প্রতিটি শিশু

    আজকের শিশুই আগামীর দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ। তারাই মূলত দেশ ও জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের নতুন সদস্যের আগমন ঘটে না; জন্ম হয় একটি জাতির নতুন সম্ভাবনার।

    আজ যে শিশু মায়ের কোলে, আগামীকাল সেই-ই হতে পারে একজন আলিম, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, বিচারপতি, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, এমপি মন্ত্রী, সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান কিংবা দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত উন্নত মানবিক চরিত্রের অধিকারী সুনাগরিক।

    তাই শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সমগ্র মানবসমাজের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অসংখ্য শিশু এখনো শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতন কেবল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিত্তবান পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ডিজিটাল জগতেও শিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।

    অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই “শাসন”, “শিক্ষা” কিংবা “শৃঙ্খলা”র নামে শিশু নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অন্যথায় নিষ্পাপ ও সম্ভাবনাময় এই শিশুদের উজ্জল ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

    শাসন ও নির্যাতনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে

    শিশু সন্তানকে সৎ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রতিটি অভিভাবকের প্রধানতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। একইভাবে তাদের চরিত্র গঠন ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মানিত শিক্ষকগণের ভুমিকা নি:সন্দেহে অপরিসীম।

    তাদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনে শাসন করবেন। তবে শাসনের নামে তাদেরকে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কোনরূপ ভয় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

    শাসনের উদ্দেশ্য হলো ভুল সংশোধন, নৈতিক শিক্ষা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা। অপরদিকে নির্যাতনের ফল হলো ভয়, অপমান, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক ক্ষত।

    একজন শিশু যদি তার অভিভাবক বা শিক্ষককে সম্মান নয়, বরং ভয় করতে শেখে, তাহলে সেখানে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। ভয় সাময়িক আনুগত্য সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনো সুস্থ ব্যক্তিত্ব গঠনে ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারে না।

    মানসিক নির্যাতন নীরব কিন্তু ক্ষত অত্যন্ত গভীর

    আমাদের সমাজে শারীরিক আঘাতকে নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও মানসিক নির্যাতনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে অবহেলা করা হয়ে থাকে।

    “তুমি কিছুই পারবে না”, “তুমি অন্যদের মতো নও”, “তুমি আমাদের লজ্জা” “ তুমি অথর্ব অকর্মণ্য ইত্যাদি বাক্যের বহুল ব্যবহার শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।

    সবার সামনে অপমান করা, ভাই-বোন বা সহপাঠীর সঙ্গে তুলনা করা, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করা, শিশুর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা তার প্রতিটি ভুলকে ব্যক্তিত্বের ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করা—এসব আচরণ দীর্ঘমেয়াদে শিশুর আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

    অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আজও শৈশবে শোনা অপমানজনক কথাগুলো ভুলতে পারেন না। শারীরিক আঘাতের ক্ষত একসময় সেরে যায়, কিন্তু মানসিক আঘাত কখনো সখনো সারাজীবন বহন করতে হয়।

    শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে নির্যাতনের নেতিবাচক প্রভাব

    মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশের সময় হলো শৈশবকাল। এ সময় নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ইতিবাচক সম্পর্ক শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে তোলে।

    অন্যদিকে দীর্ঘদিন ভয়, অপমান ও সহিংসতার পরিবেশে বেড়ে উঠলে শিশুর শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং পারিবারিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

    ইসলামের শিক্ষা: দয়া, ভালোবাসা ও মর্যাদা

    ইসলামের মূল শিক্ষা হলো রহমত, ন্যায় ও মানবিকতা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি অসাধারণ স্নেহ, ভালোবাসা, ধৈর্য ও কোমলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

    তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে খেলতেন, কোলে নিতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতেন। তিনি বলেছেন:

    “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (জামে তিরমিজি)

    পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তাআলা ন্যায়, দয়া ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা তাই ইসলামের নৈতিক আদর্শের সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

    আইন ও নৈতিকতার সমন্বয় জরুরি

    শিশুদের সুরক্ষায় যথাযথ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ে বিচার কার্যকর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

    যেখানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়, সেখানে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে শিশু সুরক্ষায় “শূন্য সহনশীলতা” নীতি গ্রহণ করতে হবে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক নিরাপদ আশ্রয়

    শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে হবে এমন, যেখানে শিশুরা আনন্দ উৎসাহ নিয়ে শিখবে, প্রশ্ন করবে এবং নিজের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ লাভ করবে।শিক্ষকের হাতে যদি ভয়, অপমান বা সহিংসতার উপাদান থাকে, তবে শিক্ষা তার মানবিক উদ্দেশ্য হারায়।

    শিক্ষককে কেবল পাঠদাতা নয়, একজন পথপ্রদর্শক ও চরিত্র নির্মাতা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। ইতিবাচক শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণই শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি।

    ডিজিটাল যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ

    আজকের শিশুরা বাস্তব জগতের পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও বেড়ে উঠছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান—এসবও মানসিক নির্যাতনের আধুনিক রূপ। তাই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি।

    সমাজের করণীয়

    শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এজন্য—

    * পরিবারে অহিংস ও ইতিবাচক অভিভাবকত্বের চর্চা।

    * শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।

    * শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা।

    * শিক্ষক, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ।

    * শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।

    * গণমাধ্যমে শিশু অধিকারবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি।

    * নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

    একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি তার শিশুদের হাসিতে, তাদের আত্মবিশ্বাসে এবং তাদের নিরাপদ শৈশবে। শিশুদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন শুধু একটি শিশুর ক্ষতি করে না; ক্ষতি করে একটি জাতির ভবিষ্যতের অমিত সম্ভাবনাকে।

    আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা দুর্বল নয়; তারা সম্ভাবনার বীজ। সেই বীজকে সহিংসতার আগুনে পোড়ানো নয়, বরং ভালোবাসা, নৈতিক শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

    শিশুকে ভয় নয়, স্বপ্ন দেখাতে হবে; হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি নয়, ভালোবাসার বীজ বপন করতে হবে ; নির্যাতন নয়, মানবিকতার স্পর্শ দিয়ে আগলে রাখতে হবে। একটি নিরাপদ শৈশবই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে পারে।

    লেখক: মো. মুখলেছুর রহমান, সাবেক প্রিন্সিপাল, জামেয়া দ্বীনীয়া ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, তা’মিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা টঙ্গী শাখা।

  • জামায়াতের ফেসবুক পেজে সূরা মুমিনুনের ৪ আয়াত, কারণ কী

    জামায়াতের ফেসবুক পেজে সূরা মুমিনুনের ৪ আয়াত, কারণ কী

    বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজে বৃহস্পতিবার পবিত্র কোরআনের সূরা মুমিনুনের চারটি আয়াত পোস্ট করা হয়েছে। সূরাটির ২ থেকে ৫ নম্বর আয়াতে মুমিনদের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেছেন—

    ‘যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র; যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে; যারা যাকাত দান করে এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে।’এই চার আয়াত আসলে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদত, সামাজিক আচরণ, অর্থনৈতিক দায়িত্ব এবং নৈতিক চরিত্র—সবকিছুর একটি পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা এই গুণগুলো অর্জন করতে পারবেন, তারাই শেষ পর্যন্ত জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবেন।

    ২ নম্বর আয়াতের বাস্তব দিক তুলে ধরে মুফাসসিররা বলেছেন, কেবল যান্ত্রিকভাবে রুকু-সিজদা করার নাম নামাজ নয়। নামাজ পড়ার সময় মনকে দুনিয়াবি চিন্তা, ব্যবসা বা মোবাইল স্ক্রিন থেকে মুক্ত রাখা এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্থির রাখা এই গুণের অন্তর্ভুক্ত। মুমিন ব্যক্তি মনে করেন, তিনি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং আল্লাহ তাকে দেখছেন।

    ৩ নম্বর আয়াতের বাস্তব দিক তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, ট্রল করা, পরনিন্দা, অর্থহীন আড্ডা বা সময় নষ্টকারী বিনোদনে মেতে থাকা এর অন্তর্ভুক্ত। একজন সফল মুমিন নিজের সময়ের মূল্য বোঝেন এবং যা কোনো কল্যাণে আসে না, তা থেকে সযত্নে নিজেকে দূরে রাখেন।

    ৪ নম্বর আয়াতের বাস্তব দিক হলো, নিজের সম্পদের ওপর যখন গরিবের হক বা অধিকার তৈরি হয়, তখন তা স্বেচ্ছায় ও সঠিক নিয়মে অভাবী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া। এটি একদিকে যেমন মানুষের মন থেকে কৃপণতা ও লোভ দূর করে আত্মাকে পবিত্র করে, অন্যদিকে সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে।

    ৫ নম্বর আয়াতের বাস্তব দিক হলো, আধুনিক সমাজে যেখানে পর্নোগ্রাফি, অবাধ মেলামেশা এবং অনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ খুব সহজলভ্য, সেখানে একজন মুমিন নিজের চোখ, মন এবং চরিত্রকে আল্লাহর দেওয়া সীমানার ভেতরে ধরে রাখেন। বৈধ উপায়ের (বিবাহের) বাইরে সব ধরনের অনৈতিকতা থেকে নিজেকে রক্ষা করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

  • আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ফিনল্যান্ড-জাপানের উদাহরণ

    আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ফিনল্যান্ড-জাপানের উদাহরণ

    মতামত:

    শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম হলো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে সাজানো পাঠ্যবিষয়, শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার অভিজ্ঞতার সমষ্টি। সহজভাবে বলতে গেলে, শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে তাদের শেখা মূল্যায়ন করা হবে—এসবের পূর্ণ পরিকল্পনাই শিক্ষাক্রম।

    পৃথিবীর সব দেশেই সমাজ-সভ্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাক্রমকেও যুগোপযোগী করতে হয়। কারণ সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তনের ধারায় রাষ্ট্রকে সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, বহির্বিশ্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে খাপ খাইয়ে নিতে দক্ষ, সুনাগরিক এবং সমাজ-স্বীকৃত প্রচলিত মূল্যবোধের সঙ্গে আত্মস্থ করে নিতে সমাজ, রাষ্ট্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। তা না হলে দেশ-বিদেশে আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

    আমাদের দেশে গতানুগতিক শিক্ষাক্রমের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। দেশের গতানুগতিক শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ, বইয়ের চাপের ফলে বিদ্যালয় উপস্থিত হওয়ার ভীতি, অনীহা তাদের মধ্যে কাজ করে। তাছাড়া, প্রচলিত শিখন-শেখানোর কৌশলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমির ছাপ স্পষ্টত লক্ষ করা যায়। বর্তমান সরকার এ সমস্যা দূর করতে কাজ করে যাচ্ছে। এ সময়ের আলোচিত কনসেপ্ট হলো, আনন্দময় শিক্ষণ বা লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস কী এবং কীভাবে কাজ করে। লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বলতে, এমন একটি শিক্ষণ-পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে আনন্দ, আগ্রহ, ইতিবাচক অনুভূতি এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখানো ও শেখা হয়। এর মূল ধারণা হলো—শিক্ষার্থীরা যদি আনন্দের সঙ্গে শেখে, তাহলে তারা বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে বুঝতে, মনে রাখতে এবং প্রয়োগ করতে পারে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, গল্প, গান ও সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখানো, ভয় বা চাপমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ, সক্রিয় অংশগ্রহণ, কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতার উন্নয়ন ঘটে।

    আনন্দময় শিক্ষণ মানবজীবন ও সমাজে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে এটি কতটা পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে; শিক্ষার মান বজায় থাকছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করছে কি না।

    ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সফল ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। কারণ তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কম হোমওয়ার্ক ও কম পরীক্ষা। তাদের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানো। শিক্ষকরা উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে স্বাধীনতা পান। শ্রেণিকক্ষে মানসিক সুস্থতা ও শিক্ষার্থীর কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বেশি থাকে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফল করেছে। বিদ্যালয় ত্যাগের হার তুলনামূলকভাবে কম। সিঙ্গাপুরে ‘Teach Less, Learn More’ নীতির মাধ্যমে আনন্দময় ও গভীর শিক্ষার ওপর জোর দেয়। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী । প্রকল্পভিত্তিক ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার। শিক্ষক প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ। ফলে গণিত, বিজ্ঞান ও পাঠ দক্ষতায় ধারাবাহিকভাবে বিশ্বসেরাদের মধ্যে অবস্থান। উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি। কানাডার বহু প্রদেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন : দলগত শিক্ষা। প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন। সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতার বিকাশ। ফলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও সহযোগিতামূলক মনোভাব বৃদ্ধি পায়। জাপানে আনন্দময় শিক্ষার সঙ্গে শৃঙ্খলা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের শিশু শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্জিত সুন্দর আচার-আচরণ শিক্ষা দেওয়া। তাদের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে। দলগত কাজ ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা করে। নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এর ফলে দায়িত্ববোধ, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ডে দেখা যায়, এ দেশের শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর আগ্রহ, সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে, শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে। শেখাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

    জন ডুয়ি বলেছেন, ‘Education is not preparation for life; education is life itself.’

    মারিয়া মন্টেসোরি বলেছেন, ‘শিশু স্বাভাবিকভাবেই শেখার প্রতি আগ্রহী। আনন্দময়, স্বাধীন ও অনুসন্ধানভিত্তিক পরিবেশে শিশু সবচেয়ে ভালো শেখে।’

    মনোবিজ্ঞানী লেভ ভাইগোটস্কির মতে, সামাজিক যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং দলগত কার্যক্রম শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও অর্থবহ করে তোলে। শিক্ষক ও সহপাঠীর সহযোগিতায় শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ শেখার সুযোগ পায়।

    জেরোমি ব্রানার আবিষ্কারভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, শিক্ষার্থীরা নিজেরা আবিষ্কার করে শিখলে শেখা আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

    হাওয়ার্ড গার্ডনারের মতে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার ধরন ভিন্ন। শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্যময় প্রতিভা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে।

    খেলাধুলা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আনন্দময় কর্মকাণ্ড শিশুর বুদ্ধি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আনন্দের পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শেখার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহী হয়। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অর্থবহ ও স্থায়ী শেখা সম্ভব হয়। ভয়, অতিরিক্ত চাপ ও পরীক্ষাভীতি কমে। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা তৈরি করা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ে। ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জিত হয়। আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। অন্যের মতামতকে সম্মান করার অভ্যাস তৈরি হয়। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বাস্তব জীবনে দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয়। সৃজনশীল ও দক্ষ জনশক্তি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। যুক্তিবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের চর্চা বৃদ্ধি পায়। তবে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

    অনেক শিক্ষক এখনো প্রচলিত বক্তৃতানির্ভর পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এক শ্রেণিতে ৫০-৮০ বা তারও বেশি শিক্ষার্থী থাকে। এত বড় শ্রেণিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা কঠিন। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাব রয়েছে।

    শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য পরীক্ষায় ভালো ফল। ফলে আনন্দময় ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অনেক সময় গুরুত্ব হারায়

    অভিভাবক প্রায়ই মনে করেন, কঠোর পড়াশোনা ও বেশি পরীক্ষা মানেই ভালো শিক্ষা। যদি মূল্যায়ন প্রধানত লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সহযোগিতার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হয় না। শহরের তুলনায় অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষক, প্রযুক্তি ও শিক্ষা-উপকরণের ঘাটতি বেশি।

    শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে ঘন ঘন পরিবর্তন হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

    শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে উপযুক্ত কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি এসব সংকট দূর করতে হবে। আমাদের উচিত ফিনল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভালো করে পর্যালোচনা করে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

  • শিক্ষার চেয়ে ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে বেশি অর্থ: ইউনেস্কো

    শিক্ষার চেয়ে ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে বেশি অর্থ: ইউনেস্কো

    শিক্ষা ডেস্ক:

    বিশ্বের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার শিক্ষা হলেও, এই দেশগুলোতে এখন শিক্ষার পেছনে ব্যয়ের চেয়ে ঋণের সুদ পরিশোধেই বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে।

    জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

    ইউনেস্কোর ‘পলিসি পেপার অন রিস্টোরিং ফিসক্যাল স্পেস টু সেভ এডুকেশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখন মানসম্মত শিক্ষা লাভের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মূল কারণ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের পেছনে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে এসব দেশের সরকার সামাজিক উন্নয়নের চেয়ে ঋণের কিস্তি শোধ করাকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে।

    প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শিক্ষাব্যয়ের ৩ দশমিক ৩ গুণ ব্যয় হচ্ছে ঋণ পরিশোধে। বর্তমানে গ্লোবাল সাউথের ১১৩টি দেশে ঋণ পরিশোধের ব্যয় শিক্ষার পেছনে মোট সরকারি বরাদ্দকে ছাড়িয়ে গেছে। এসব দেশে বিশ্বের প্রায় ৬১০ কোটি মানুষ বসবাস করে।

    ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনকারী বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে গ্র্যাজুয়েশন বা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে এই গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়াটি আরও তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হয়েছে। উন্নয়নের এই যাত্রাপথের মধ্যেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের চাপ, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিক্ষা খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দে।

    চলতি অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দের চেয়ে ঋণ পরিশোধেই সরকারের তিন গুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। অপরদিকে সরকারি তথ্য ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে নতুন করে কোনো ঋণ না নিলেও কেবল আগের নেয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে সরকারকে।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালামের মতে, সরকার যখন বিশাল অংকের বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধে ব্যস্ত থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য খাতগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। তবে তিনি মনে করেন, ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার বাজেট কমানো কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। সরকার চাইলে অন্য কোনো খাতের খরচ কমিয়েও শিক্ষার বরাদ্দ পুরোপুরি বজায় রাখতে পারে। কারণ শিক্ষা খাতের ব্যয়টি হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক অবস্থানের সহজে উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

    বর্তমানে সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবেই বিবেচনা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতেও এ অগ্রাধিকার অব্যাহত রাখতে হবে। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে যদি কোনো খাতে ব্যয় কমাতেই হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে শিক্ষা খাতকে এ ধরনের বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।

    ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে গড়ে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত ১ ডলার বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত শিক্ষা ব্যয় দশমিক ২৮ ডলার করে

    হ্রাস পেয়েছে। এ নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তাদের শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের ১৩৭টি দেশ আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত শিক্ষা অর্থায়নের ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পারছে না। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-৪ অর্জনের জন্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো বর্তমানে বার্ষিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারের স্থায়ী অর্থায়ন ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

    ইউনেস্কোর মতে, এ সংকটের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে অভ্যন্তরীণ ঋণ। ঐতিহাসিকভাবে কেবল বৈদেশিক ঋণ নিয়ে আলোচনা হলেও বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ঋণ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ ঋণের মেয়াদ সাধারণত কম হয় এবং সুদের হার থাকে অত্যন্ত চড়া। বর্তমানে মোট ঋণ পরিশোধের প্রায় ৬২ শতাংশই হলো অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং ১০১টি দেশ তাদের মোট ঋণ পরিশোধের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় করছে দেশের ভেতরের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ঋণদাতাদের পেছনে।অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার সবচেয়ে বড় অংশটি যাবে অভ্যন্তরীণ খাতের ট্রেজারি বন্ড ও বিলের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পরিশোধে। এর পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ। এ সময় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ম্যাচিউর বা মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। এর বাইরে কেবল ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি (আসল) বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সামনের অর্থবছরে সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায়।