জাতীয় নাগরিক পার্টি ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশের সরকার ফেব্রুয়ারির সংস্কারের গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করছে। বিএনপি সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের খসড়া করছে। বিরোধীরা চাইছে বাস্তবায়ন আদেশে বর্ণিত সংস্কার পরিষদ।
সংশোধনী কারা লিখবে এবং কোন অঙ্গীকারগুলো বহাল থাকবে, তা নিয়েই মতভেদ। সরকার বলছে, সংবিধানের অধীনে সংসদকেই কাজ করতে হবে। জামায়াত ও এনসিপি বলছে, গণভোটের রায় অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে আলাদা পরিষদ গঠন করতে হবে।
সংক্ষেপে
- ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে বৈধ ভোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে। একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়।
- বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ১৮০ কার্যদিবসের মেয়াদের কথা ছিল। বিএনপির সংসদ সদস্যরা পরিষদের শপথ নেননি। পরিষদ কখনো বসেনি। মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার যে হিসাব প্রকাশিত হয়েছে, তা নির্ভর করছে মেয়াদ কখন শুরু হয়েছে, সে বিষয়ে বিতর্কিত একটি ব্যাখ্যার ওপর।
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১২ সদস্যের সংসদীয় সংশোধনী কমিটির সভাপতি। জামায়াত ও এনসিপি এতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। মন্ত্রী বলেছেন, ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল আসতে পারে।
- কমিটি বিলুপ্তি, পরিষদ গঠন এবং স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এনসিপি ৩০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য গণভোটের সুরক্ষাও বিবেচনা করছে সরকার। কমিটির কাজের মাধ্যমে প্রস্তাবিত এই সুরক্ষা এখনো আইনে পরিণত হয়নি।
একই দিনে দুটি ভোট
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর এই সনদ তৈরি হয়। অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসন শেষ হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সনদ নিয়ে আলোচনা করে। রাজনৈতিক দলগুলো ১৭ অক্টোবর ২০২৫ এতে সই করে। সনদের ৮৪ প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতায় পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুরক্ষা।
১২ ফেব্রুয়ারি ফল ঘোষিত ২৯৭ সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জেতে ২০৯টিতে। সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ৩০০টি এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের বিধান আছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনীর জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন সরকার ও তার মিত্রদের রয়েছে।
ভোটাররা গণভোটের প্রস্তাবও সমর্থন করেন। প্রথম গেজেটে প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ ‘হ্যাঁ’ ও ২ কোটি ২১ লাখ ‘না’ ভোট ছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখের সংশোধিত গেজেটে, যা নিয়ে পরদিন খবর প্রকাশিত হয়, প্রায় ৪ কোটি ৭২ লাখ ‘হ্যাঁ’ এবং ২ কোটি ২০ লাখ ‘না’ ভোট ছিল। বৈধ ভোটের আনুমানিক দুটি মোটের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১১ লাখ। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও বসবেন, এমন একটি প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল ওই ভোট।
সংসদ সদস্যদের শপথের আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি এনসিপি সনদে সই করে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ ও পরিষদের দুটি শপথই নেন। বিএনপির সদস্যরা শুধু সংসদের শপথ নেন। দলটির বক্তব্য, পরিষদের দ্বিতীয় শপথের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
পরিষদ ও মেয়াদ শুরুর বিতর্ক
৩১ মার্চ সালাহউদ্দিন সংসদে বলেন, বাস্তবায়ন আদেশ শুরু থেকেই অবৈধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এপ্রিলে প্রতিশ্রুতি দেন, ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদের মাধ্যমে সনদের “প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন ও প্রতিটি বিধান” বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের অবস্থান হলো, গণভোট নিজে সংবিধান সংশোধন করেনি; সাংবিধানিক পরিবর্তন সংসদের মাধ্যমেই করতে হবে।
প্রস্তাবিত ১০০ আসনের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান থাকা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছিল। তারেক দুই পদেই আছেন। জাতীয় ভোটের অনুপাতের বদলে সংসদে আসনের শক্তি অনুযায়ী উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন চায় বিএনপি। গণভোটে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সমর্থন পেলেও দলটির নথিভুক্ত আপত্তি দূর হয়নি।
নাটশেল টুডের ১৭ অক্টোবরের সম্পাদকীয়তে হিসাব করা হয়, সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার দিন ১২ মার্চ থেকে গণনা করলে পরিষদের ১৮০ কার্যদিবসের মেয়াদ প্রায় ১০ ডিসেম্বর শেষ হবে। সম্পাদকীয়তে বিপরীত ব্যাখ্যাও ছিল: পরিষদ কখনো বসেনি বলে এর সময় গণনাই শুরু হয়নি। সেখানে ১৪২ দিন পার হওয়া ও ৩৮ দিন বাকি থাকার হিসাবটি ১৭ অক্টোবরের গণনা; ২৭ অক্টোবরের চলতি হিসাব নয়।
ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, পরিষদ নির্ধারিত সময় পার করলে সংস্কারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হওয়ার একটি বিধান চূড়ান্ত আদেশে বাদ দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত পরিষদ কখনো বৈঠকে বসেনি।
কমিটির কাজের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন
জুলাইয়ে সংসদ সালাহউদ্দিনের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করে। জামায়াত ও এনসিপি এতে অংশ নিতে অস্বীকার করে। সালাহউদ্দিন বিরোধীদের প্রস্তাব আহ্বান করেছেন এবং সেগুলো বিবেচনা করা হবে বলেছেন।
কমিটির সপ্তম বৈঠক, ১৩ অক্টোবরের আলোচনায়, বিশেষজ্ঞরা সংবিধান সংশোধনে বিচার বিভাগের এখতিয়ার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প ব্যবস্থা এবং উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মত দেন। ওই আলোচনা পরবর্তী শনিবার, ২৪ অক্টোবরের বৈঠক থেকে আলাদা।
কমিটির কাজে নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ১৭ অক্টোবর বলেন, ইশতেহারভিত্তিক পদক্ষেপের অনুমতি দেওয়া নোটটি ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত খসড়ায় ছিল না। তাঁর অভিযোগ, সইয়ের দিন সরকারপক্ষের একজন প্রতিনিধি আলোচনা ছাড়াই সেটি যোগ করেন। সনদের পাঠ প্রস্তুত করা নিয়ে এটি এনসিপির অভিযোগ।
সালাহউদ্দিন বলেছেন, কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে চায় এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল আসতে পারে। সুপারিশের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় বিলের খসড়া করবে। এই সময়সূচি এখনো একটি পরিকল্পনা; সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী নয়।
বিক্ষোভে যাচ্ছে বিরোধীরা
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সোমবার তারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, যে গণভোটে তিনি নিজে ভোট দিয়েছেন, এখন তার ফল প্রত্যাখ্যান করছেন। পরওয়ার বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হলেও সরকার একটির ফল মানছে, অন্যটি প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান।
এনসিপি ৩০ অক্টোবর বেলা ৩টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ ঘোষণা করেছে। সংসদীয় কমিটি বিলুপ্ত করে পরিষদ গঠনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ চায় দলটি। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দাবির কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানির ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার কথা বলছে তারা।
গণভোটের সুরক্ষার প্রস্তাব
সালাহউদ্দিন বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য গণভোটের শর্ত বিবেচনা করছে সরকার। এই ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন হয়। প্রস্তাবিত সুরক্ষা ভবিষ্যৎ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার পক্ষে ব্যবস্থাটি বাতিলের ক্ষমতা সীমিত করবে।
মন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের পর ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবনা বা অন্য কিছু সুরক্ষিত বিধানে সংশোধনী আনলে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোট লাগবে। সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারে এই দাবির প্রয়োগ নির্ভর করবে বিলের প্রকৃত বিধানগুলোর ওপর। এই প্রতিবেদনে বর্ণিত পর্যায়ে এমন কোনো বিল উত্থাপিত হয়নি।
সরকার সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংশোধনীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াত ও এনসিপি পরিষদের দাবি বহাল রেখেছে। কমিটির পরিকল্পিত ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের আগে এনসিপির পরবর্তী ঘোষিত বিক্ষোভ ৩০ অক্টোবর।
এরপর কী
- এনসিপির শাহবাগের বিক্ষোভ ৩০ অক্টোবর বেলা ৩টায় হওয়ার কথা।
- কমিটি ডিসেম্বরে প্রতিবেদন শেষ করতে চায়। সালাহউদ্দিন বলছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল উত্থাপিত হতে পারে।
- পরিষদের মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার যেকোনো হিসাবই বিতর্কিত শুরুর তারিখের ওপর নির্ভরশীল। ১৭ অক্টোবরের অনুমিত হিসাব দিয়ে অবিতর্কিত আইনি মেয়াদসীমা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
- বিলের বিষয়বস্তু ও পরবর্তী কোনো আইনি রায় নির্ধারণ করবে, গণভোট ও সংশোধনীর কোন প্রশ্নগুলো বাস্তবে উঠবে।








