ইসলাম ও জীবন

  • চাকরিজীবনে যেভাবে ইসলাম চর্চা করবেন

    চাকরিজীবনে যেভাবে ইসলাম চর্চা করবেন

    জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন নানা পেশার মানুষ। কারও গন্তব্য অফিস, কারও কারখানা বা দোকান, আবার কেউ ছুটছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে।সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কর্মজীবন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে একজন মুসলিমের কাছে চাকরি শুধু বেতন পাওয়ার মাধ্যম নয়; কর্মক্ষেত্রও সততা, আমানতদারি, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির পরীক্ষাস্থল। ইসলাম কর্মমুখরতা শেখায়, হালাল জীবিকা অর্জনে উৎসাহিত করে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সুরা : আল-জুমুআহ, আয়াত : ১০)
    তাই হালাল পথে জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি সেই উপার্জনের পথে ইসলামের নীতিমালা মেনে চলাও জরুরি।

    বেতনের প্রতিটি টাকায় থাকুক হালালের স্বস্তি

    একজন চাকরিজীবী মাস শেষে বেতন হাতে পান। সেই অর্থ দিয়ে বাজার করেন, বাড়িভাড়া দেন, সন্তানের মাদরাসা/স্কুলের ফি পরিশোধ করেন, মা-বাবার জন্য ওষুধ কেনেন। তাই উপার্জনের উৎস পবিত্র হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো ভক্ষণ করেনি।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
    সময় ও দায়িত্বের আমানত কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় ও দায়িত্বের আমানত। একজন কর্মী যে সময়ের বিনিময়ে বেতন নিচ্ছেন, সেই সময়টুকু প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করা তাঁর দায়িত্ব এবং এটি তাঁর কাছে আমাতন। কোনো কারসাজির মাধ্যমে এই আমানতের খেয়ানত করলে আল্লাহর দরবারে এর হিসাব দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)
    অতএব, ইচ্ছাকৃতভাবে আমানতের খেয়ানত করার জন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা নিষিদ্ধ।

    কর্মক্ষেত্রে পরিচয় হোক চরিত্রে

    কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে যোগ্যতার সঙ্গে উত্তম চরিত্রের সমন্বয় না থাকলে সেই যোগ্যতা অনেক সময় কল্যাণ বয়ে আনে না। একজন কর্মকর্তা অধীন কর্মীর সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন, একজন কর্মী সহকর্মীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছেন—এসবও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর্মস্থলে কাউকে ছোট করা, সহকর্মীর ভুলকে বাড়িয়ে বলা, তাঁর পেছনে নিন্দা করা, অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা অহংকার করা নিন্দনীয় কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি উপহাস কোরো না…এবং একে অন্যের গিবত কোরো না।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১১-১২)

    কর্মজীবন হোক ইবাদতের সহযাত্রী

    কর্মজীবনের ব্যস্ততা অনেক সময় মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করে যে জীবিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও পরিবারের প্রাপ্য সময়ও কমে যায়। অথচ জীবিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে জীবনের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা: আন-নিসা, আয়াত: ১০৩)

    কর্মস্থলে নামাজের সময় হলে যথাসম্ভব নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা এবং কাজের কারণে ফরজ ইবাদতকে অবহেলা না করা একজন মুসলিমের দায়িত্ব।

    একই সঙ্গে নিজের পেশায় দক্ষতা অর্জন করাও দায়িত্বের অংশ। চিকিৎসককে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হতে হবে, শিক্ষককে নিজের বিষয়ে জ্ঞানী হতে হবে, প্রকৌশলীকে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে হবে এবং ব্যবসায়ীকে লেনদেনের বিধান জানতে হবে। অযোগ্যতা লুকিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা নিজের ও অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতএব, দিনশেষে ঘরে ফেরার সময় ক্লান্ত শরীরের সঙ্গে যদি একজন মানুষ এই প্রশান্তি নিয়েও ফিরতে পারে যে, ‘আজ আমি কারো হক নষ্ট করিনি, হারাম উপার্জন করিনি এবং আমার দায়িত্বে ফাঁকি দিইনি’, তাহলে তার কর্মজীবনও হতে পারে সফল এবং ইবাদতের একটি সুন্দর মাধ্যম।

  • রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই

    রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই

    রিজিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দেওয়া সবচেয়ে বড় একটি নিয়ামত। সাধারণত রিজিক সম্পর্কে আমরা ধারণা করি, তা শুধু খাদ্যসামগ্রী আর সম্পদ; তবে সেটি সমীচীন নয়। বরং রিজিক হচ্ছে আমাদের জীবনোপকরণের যাবতীয় সবকিছু।রিজিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত। এ সম্পর্কে পবিত্র কালামুল্লাহ মাজিদে ইরশাদ হচ্ছে, ‘পৃথিবীর প্রত্যেক জীবের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই (উল্লেখ) এক সুবিন্যস্ত কিতাবে (লওহে মাহফুজে) রয়েছে।’ (সুরা হুদ : ৬) অপর আয়াতে কারিমায় আল্লাহতায়ালা রিজিক নিয়ে আশ্বস্ত করে বলছেন, ‘আকাশে রয়েছে তোমাদের রিজিক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু।’ (সুরা জারিয়াত : ২২)

    এখন কথা হচ্ছে, আমরা সাধারণত ধারণা করি যে আমি যদি অমুক কাজটি না করতাম, অমুক ব্যক্তির কাছে ভরসা না করতাম বা অমুক লোকটি আমার জীবনে যদি না থাকত, তাহলে হয়তো আমি চলতে পারতাম না, আমার ভালো থাকায় বাধা-বিঘ্নতা সৃষ্টি হতো অথবা ভালো থাকতে পারতাম না, ভালো-মন্দ খেতে কিংবা পড়তে পারতাম না; এটি নিছক ভুল ধারণা ছাড়া কিছু নয়।

    আমরা সামান্য বিষয় নিয়ে হতাশায় ডুবে যাই, ভেঙে পড়ি—এটি নিছকই শয়তানের প্ররোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষ চেষ্টা করার পরও অনেক সময় রিজিক কমবেশি হয়। এটি আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে স্রেফ পরীক্ষা। মহান রব আমাদের জানান দিচ্ছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব, কখনো ভয়ভীতি, কখনো অনাহার, কখনো তোমাদের জানমাল ও ফসলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। (তবে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্যধারণ করতে হবে) তুমি ধৈর্যশীলদের (জান্নাতের) সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা : ১৫৫)

    পার্থিব জীবনে পরিস্থিতি ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মানুষ রিজিক নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকে। কিন্তু আল্লাহতায়ালা রিজিক নিয়ে চিন্তা-টেনশন না করতে অভয়বাণী শুনিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং তিনি তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দান করেন, যার উৎস সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা আত-ত্বালাক : ৩)

    আমার-আপনার রিজিক আমাদের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়, সঠিক উৎস থেকে পৌঁছে যাবে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মোতাবেক। আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় নিয়ামত কী হতে পারে, যেখানে আমাদের রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই নিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা সমস্ত সৃষ্টির ভাগ্যলিপি লিখে রেখেছেন, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে, তখন আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর।’ (মুসলিম : ২৬৫৩)

    এবার ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা যাক। তিনি বলেছেন, ‘যা কিছু তোমার জন্য লিখিত সেটি পাহাড়ের চূড়ায় থাকলেও তোমারই হবে, আর যা কিছু তোমার জন্য লেখা হয়নি সেটি দুই ঠোঁটের মধ্যখানে থাকলেও তোমার হবে না।’ তাই রিজিক নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

    সুতরাং আসুন, রিজিক নিয়ে চিন্তিত না হই এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভরসা করি রবের ওপর; যিনি আমাদের রাজ্জাক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।

  • বন্ধ হোক ধর্মের নামে অধর্ম

    বন্ধ হোক ধর্মের নামে অধর্ম

    এই বদ্বীপকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’। হজরত শাহজালাল, শাহ পরান, খান জাহান আলীসহ অসংখ্য মহান বুজুর্গ শত শত বছর আগে দূর দেশ থেকে পথ পেরিয়ে এই মাটিতে এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন? তাওহিদের আলো ছড়িয়ে দিতে। শিরক আর কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করতে। মানুষকে এক আল্লাহর পথে আনতে। অথচ সেই বুজুর্গদের কবরকে কেন্দ্র করে যা চলছে, তা দেখলে মনে হয়—কবরে শুয়ে থাকা সেই মহামানবরাই আজ সবচেয়ে বড় অসহায়ত্বের শিকার। তারা সারাজীবন যেসবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাদের সমাধিস্থলকে ঘিরে আজ সেসবেরই জয়জয়কার।ধর্মের নামে অধর্ম

    মাজারে কত কী হয়, তা কে না জানেন। কবরের পাশে হুক্কার ধোঁয়া, গাঁজার আড্ডা, জটাধারী ভণ্ড ফকিরের ভিড়, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অবৈধ যৌনাচার—এসব দৃশ্য দেশের বহু মাজারে পরিচিত। অথচ ইসলামে প্রতিটি নেশাদ্রব্য হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মাদকদ্রব্যই হারাম।’ (মুসলিম: ২০০৩)

    কবরে সিজদা দেওয়া, কবরের গ্রিল ধরে ফরিয়াদ করা, কবরে মানত করা, কবরের চাদরে কপাল স্পর্শ করা, চুম্বন করা, তাজিম-সম্মানার্থে মাথা ঝোঁকানো—এসবই সম্পূর্ণ হারাম এবং এগুলোর কোনো কোনোটি শিরক। রাসুল (সা.) স্পষ্ট বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ইহুদি-নাসারাকে ধ্বংস করুন! তারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে।’ (মুসলিম : ৫৩০)

    মৃত মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া শিরক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য, সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।’ (সুরা জিন: ১৮)। মানতের নামে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা হাতানো, তথাকথিত ‘প্রেম’ ও ‘ভক্তি’র আড়ালে শিরকি আচার-অনুষ্ঠানকে বৈধতা দেওয়া—এসবই কোরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে হারাম। বরং একজন মুমিনের ঈমানের মূল ভিত্তি তাওহিদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাজারে আর কী কী হয়, এর বিস্তারিত লেখাটাও অরুচিকর ও লজ্জার। আল্লাহ রক্ষা করুন।

    আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি

    মাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা জমা পড়ে দানবাক্সে। এই অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। মাজারের খাদেম, তথাকথিত পির বা গদিনশিন ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সাধারণ মানুষ ভাবেন, মাজারে দেওয়া অর্থ গরিবের কাজে লাগবে। কিন্তু সেই অর্থ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। এটি শুধু অর্থের অপব্যবহার নয়, বিশ্বাসেরও অপব্যবহার। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব দুর্নীতিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা, যার মূল ভিত্তি সাধারণ মানুষের আবেগ পুঁজি করা।সাহসী একটি পদক্ষেপ

    এই দীর্ঘ অন্ধকারে একটি আলোর রেখা সম্প্রতি দেখা গেছে। সিলেটের সদ্য সাবেক ডিসি সারোয়ার আলম প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। প্রথমবারের মতো মাজারের দানবাক্সের অর্থের সুষ্ঠু হিসাব-নিকাশ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। মাজারকেন্দ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগ ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ এতদিন যে ব্যবস্থায় কেউ হাত দেওয়ার সাহস পাননি, সেখানে প্রথমবার জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে। এটি মাজার-সংস্কারের পথে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

    ওয়াক্‌ফ সম্পদ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

    মাজারের দানবাক্সের অর্থ, মাজারের জমি—সবই ওয়াক্‌ফ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। এই সম্পদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া, জাতীয় কোষাগারে জমা হওয়া এবং জনকল্যাণে ব্যয় হওয়া এখন সময়ের দাবি। দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে অর্থ গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল রেকর্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা করা জরুরি। মাজারকেন্দ্রিক অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়তে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

    দান হোক কেবল আল্লাহর উদ্দেশে

    দাতাদেরও দায়িত্ব আছে। তাদের বুঝতে হবে মাজারে দান করার কোনো নির্দেশনা ইসলামে নেই। বরং মাজারে দেওয়া প্রতিটি টাকা ওই দুর্নীতির সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী করে। দান হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’ (সুরা আনআম : ১৬২)

    বুজুর্গদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে আল্লাহকে খুশি করার নিয়তে এতিমখানায়, মাদরাসায়, হাসপাতালে ও গরিবকে সাদাকা করা যেতে পারে। দেশে হাজারো পরিবার আছে, যারা কয়টি টাকার জন্য দুবেলা পেট পুরে খেতে পারে না, মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে পারে না, কিংবা মায়ের বা সন্তানের চিকিৎসা করতে পারে না। এমনকি আপনার নিকটাত্মীয়দের অনেকেই আছেন গ্রামে, যারা নিত্যদিন অর্থকষ্টে কাটাচ্ছেন। আপনি এসব জরুরি খাতে ব্যয় না করে পাগলা মসজিদ বা অমুক-তমুকের দরবারে হুমড়ি খেয়ে দান করার কোনো মানে হয় না।

    শেষকথা

    যারা মাজারে শুয়ে আছেন, তারা এসেছিলেন আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকতে—কবরের সামনে সিজদা নিতে নয়। তাদের নাম ভাঙিয়ে যেসব অপকর্ম চলছে, তাতে তাদের আত্মা কষ্ট পায় বৈকি। ডিসি সারোয়ার আলমের মতো যারা এই অন্ধকারে আলো জ্বালানোর সাহস দেখাচ্ছেন, তাদের সমর্থন করা নাগরিক ও সরকারের দায়িত্ব। মাজারকেন্দ্রিক শিরক ও দুর্নীতির বেড়াজাল ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ছিন্ন করতে হবে। অলি-আউলিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা থাকুক মনে; কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন কোনো শিরকি আচারে পরিণত না হয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসার এখনই সময়।

    এ এম

  • ২০২৭ সালের হজের রোডম্যাপ প্রকাশ

    ২০২৭ সালের হজের রোডম্যাপ প্রকাশ

    ২০২৭ সালের (হিজরি ১৪৪৮) হজের রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। রোডম্যাপ অনুসারে, চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে হজযাত্রী নিবন্ধন কার্যক্রম।

    গতকাল রোববার (৭ জুন) মন্ত্রণালয়ের হজ-১ শাখা থেকে এ রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে।

    গত ২৯ মে সৌদি হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের জেদ্দায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রমের সময়সূচি ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন দেশের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রীদের কাছে তা হস্তান্তর করে।

    ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং সৌদি হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী ড. আল হাসান বিন ইয়াহইয়া আল মানাখরাহ তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হজের রোডম্যাপ হস্তান্তর করেন।

    রোডম্যাপ অনুসারে, চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে হজযাত্রী নিবন্ধন কার্যক্রম। ৮ নভেম্বর স্বাক্ষরিত হবে দ্বিপাক্ষিক হজচুক্তি। ২০২৭ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে হজ ভিসা ইস্যু শুরু হবে এবং ৮ এপ্রিল শুরু হবে হজ ফ্লাইট।

    চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৫ মে (৯ জিলহজ) অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের হজ।

    সৌদি প্রান্তের খরচের অর্থ নুসুক মাসার প্লাটফর্মের ই-ওয়ালেটে সরাসরি স্থানান্তর কার্যক্রম চলবে এ বছরের ১৫ জুলাই থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। নুসুক মাসারের মাধ্যমে সামগ্রিক সেবা প্যাকেজ (তাঁবু, সার্ভিস প্যাকেজ, মক্কা ও মদিনায় হোটেল, ক্যাটারিং ও পরিবহন সেবা) নেওয়ার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর শুরু হবে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই এবং তা শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৩ জানুয়ারি।

    হজযাত্রীদের ডাটা নুসুক মাসার সিস্টেমে আপলোড করতে হবে ১৪ আগস্ট থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে। হজযাত্রী পরিবহনকারী এয়ারলাইন্সের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর ও নুসুক মাসারে ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করতে হবে চলতি বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ নভেম্বরের মধ্যে।

    ঘোষিত এ রোডম্যাপ অনুযায়ী হজের কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করেছে মন্ত্রণালয়।

    এ এম

  • যে গোনাহের কারণে ভূমিকম্পে ধ্বংস হয় কোরআনে বর্ণিত সেই জাতিটি

    যে গোনাহের কারণে ভূমিকম্পে ধ্বংস হয় কোরআনে বর্ণিত সেই জাতিটি

    শহিদুল ইসলাম কবির ইতিহাসের পাতা এবং কোরআনের আদ্যোপান্ত বিবরণে মানবজাতির সামনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বহু জাতির উত্থান-পতনের গল্প। এসব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঠিক পথের প্রতি আহ্বান করা এবং অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। এমনই একটি জাতি হলো কওমে সামূদ, যাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রচণ্ড ধ্বনির মাধ্যমে ধ্বংস করেছিলেন। কওমে সামূদ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী একটি জাতি। পাহাড় কেটে তারা ঘরবাড়ি নির্মাণ করত, উন্নত নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্যের জন্য তারা প্রসিদ্ধ ছিল। আল্লাহ তাদের কাছে হযরত সালেহ আ:-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদে ডেকে আনলেন, অন্যায়-অবিচার পরিহার করতে বললেন এবং আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানালেন। কিন্তু এই জাতির অধিকাংশ মানুষ নবীর ডাকে সাড়া না দিয়ে উল্টো তাকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দেয়।

    আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি স্পষ্ট নিদর্শন প্রদান করা হয়—মিরাকল উষ্ট্রী। এটিকে কষ্ট দেয়া বা হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বিদ্রোহী সম্প্রদায় নবীর সতর্কতা অমান্য করে ওই উষ্ট্রীকে হত্যা করে। এটাই ছিল তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাজিল হওয়ার কারণ।

    পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, তাদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ ভূমিকম্প (আর-রজফাহ) এবং আকাশবিদারী প্রচণ্ড ধ্বনি (আস-সাইহাহ)। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ধ্বংস হয়ে যায় এবং তাদের বিলাসী জনপদ এক ভয়াল নিস্তব্ধতায় পরিণত হয়। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে—

    ‘অতঃপর তাদেরকে ভূমিকম্প গ্রাস করল; ফলে তারা তাদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সূরা আল আ’রাফ, আয়াত : ৭৮)

    ‘ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে গ্রাস করল; তারা তাদের ঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।’ (সূরা হুদ, আয়াত : ৬৭)

    কওমে সামূদের এই পরিণতি মানবইতিহাসে সতর্কবার্তা হিসেবে চিরস্মরণীয়। উন্নয়ন, শক্তি কিংবা সম্পদ কাউকে রক্ষা করতে পারে না, যদি ন্যায়-নীতি, সত্য এবং আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে যায়।আজকের পৃথিবীতেও ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছার কাছে সে সর্বদাই অসহায়। কওমে সামূদের ঘটনা তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং মানুষের জন্য নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা।

    সাম্প্রতিক সময়ে ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে ৪টি ভূমিকম্পের ঘটনা আমাদেরকে সতর্ক করিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে মহান আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলতে হবে এবং রাসূলে কারীম সা:-এর দেখানো পথে বাকি জীবন পরিচালনা করতে আবারো অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। অতীতের গুনাহের থেকে পরিত্রাণ পেতে অধিক পরিমাণে তাওবা ইস্তেগফার পড়ার অভ্যাস করতে হবে।

    লেখক : সম্পাদক, মাসিক মদীনার পয়গাম

  • অন্ধকার কবরে নিরাপদে থাকবেন যারা

    অন্ধকার কবরে নিরাপদে থাকবেন যারা

    মৃত্যু এমন এক সঠিক সত্য, যেখান থেকে কেউ পালাতে পারে না। মানুষ দুনিয়ায় যত ব্যস্তই থাকুক, শেষ অবধি তাকে নামতে হবে সেই নীরব ঘরে—কবরের অন্ধকারে। কবরই আখিরাতের প্রথম মনজিল; এখানেই শুরু সুখের যাত্রা বা দুঃখের পরীক্ষা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—সবাইকে সেখানে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না। কিছু সৌভাগ্যবান আল্লাহর বিশেষ রহমতে কবরের ফিতনা ও প্রশ্ন থেকে মুক্ত ও নিরাপদ থাকবেন।

    কে তারা? কেন তারা বিশেষ মর্যাদা পাবেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েক শ্রেণির লোকের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তাদের পরিচয় জানলে মনে আলো জ্বলে ওঠে, দুনিয়ার কষ্টও সহজ মনে হয়। যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে কবরের প্রশ্ন করা হবে না, তারা হলেন-

    ১. যারা ইসলামি ভূখণ্ড বা সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে মারা যান

    হযরত সালমান ফারেসি (রা.) বলেন, আমি শুনেছি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

    رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِى كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِىَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ

    ‘একটি দিন ও রাতের প্রতিরক্ষা কাজ একমাস (নফল) সিয়াম ও নামাজ অপেক্ষা উত্তম। মরার পরও তার সেই আমল জারি থাকে যা সে জীবিত অবস্থায় করত। তার রুজি জারি হয় এবং (কবরের) যাবতীয় ফিতনা থেকে সে নিরাপত্তা লাভ করে।’ (মুসলিম ৫০৪৭, তিরমিজি ১৬৬৫, নাসাঈ ৩১৬৮)

    এরা মৃত্যুর পর প্রথম মনজিলেই নিরাপদ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হন।

    ২. যারা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হন

    হজরত মিকদাম ইবনে মাদি কারিব (রাঃ) বর্ণনা করেন—

    لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سِتُّ خِصَالٍ يُغْفَرُ لَهُ فِي أَوَّلِ دَفْعَةٍ وَيَرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ وَيُجَارُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَيَأْمَنُ مِنَ الْفَزَعِ الأَكْبَرِ وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهَا خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَيُزَوَّجُ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنَ الْحُورِ الْعِينِ وَيُشَفَّعُ فِي سَبْعِينَ مِنْ أَقَارِبِهِ

    শহিদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ছয়টি পুরস্কার বা সুযোগ আছে—

    > তার প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ক্ষমা করা হয়

    > তাকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হয়

    > কবরের আজাব হতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়

    > সে কঠিন ভীতি হতে নিরাপদ থাকবে

    > তার মাথায় মর্মর পাথর খচিত মর্যাদার টুপি পরিয়ে দেওয়া হবে। এর এক একটি পাথর দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছু হতে উত্তম।

    > তার সঙ্গে ৭২ জন জান্নাতি হুরকে বিয়ে দেওয়া হবে

    > তার ৭০ জন নিকটাত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কুবুল করা হবে। (তিরমিজি ১৬৬৩)।

    শহিদের প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ক্ষমা করা হয় এবং কবরের প্রশ্নও তাকে স্পর্শ করে না।

    খান

  • মিতব্যয় মানুষের জীবনে বরকত ও শান্তির চাবিকাঠি

    মিতব্যয় মানুষের জীবনে বরকত ও শান্তির চাবিকাঠি

    মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য এবং মধ্যপন্থার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয় ইসলাম। শক্তি, অর্থ, সময় এবং সুযোগ—এ সব কিছুর মধ্যে মিতব্যয়ী হওয়া, অপব্যয় ও অতিরিক্ততা পরিহার করা শুধু দুনিয়াতেই নয়, পরকালেও শান্তি এবং মুক্তি অর্জনের জন্য অপরিহার্য। এ জন্য মানবতার সেবায় সব সময় মিতব্যয় ও মধ্যপন্থাকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে ইসলাম।

    মধ্যপন্থা ও মিতব্যয়ের তাৎপর্য

    ইসলাম ধর্মে জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা ও মিতব্যয়ের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তার বান্দাদের হুকুম দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের সম্পদ, সময় ও শক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করে এবং কোনো কিছুতেই অতিরিক্ততা বা অপচয় না ঘটায়।

    মধ্যপন্থা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা, যার মাধ্যমে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে চলতে পারে এবং একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না বরং সমাজের উপকারে আসে। এটি মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক শান্তি, সামাজিক ভারসাম্য ও দুনিয়া এবং পরকালে সফলতা অর্জনের জন্য অপরিহার্য।

    মিতব্যয় শুধু অর্থের সংরক্ষণ নয় বরং এটি ব্যক্তিগত আচরণ ও আধ্যাত্মিক চরিত্রের একটি পরিচায়ক। ইসলামি শিক্ষা অনুসারে, আল্লাহ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপব্যয়, কৃপণতা বা অতিরিক্ত খরচের বিপক্ষে সতর্ক করেছেন। কারণ মিতব্যয়ী জীবনই বরকত আনে এবং একে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

    وَ لَا تَجۡعَلۡ یَدَكَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِكَ وَ لَا تَبۡسُطۡهَا كُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا

    ‘আর তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত (নিঃস্ব) হয়ে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৯)

    এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর নিয়ামতগুলো যদি তার নির্দেশিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা না হয়, তবে মানুষ বিপদ-আপদ, অভাব-অনটনের সম্মুখীন হয় এবং রিজিকের বরকত চলে যায়। আর যে ব্যক্তি মধ্যপন্থায় থাকে, সে শুধু নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলে না বরং তার আশপাশের পরিবেশেও শান্তি ও সমৃদ্ধি আনে। তাই মানুষের উচিত, আল্লাহর নিয়ামতসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যাতে অপব্যয় ও কৃপণতা পরিহার করা যায় এবং জীবনে শান্তি ও বরকত আসে।

    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী এবং ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, মিতব্যয়ী জীবনযাপন মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করে এবং এটি আল্লাহর বরকত অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তিনি বলেছেন-

    ‘যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় করে, সে নিঃস্ব হয় না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৭/৩০৩)।

    মধ্যপন্থা ও মিতব্যয়ী হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি অতিরিক্ত খরচ, আর্থিক সংকট, দারিদ্র্য এবং সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। উপরন্তু, এটি পরকালেও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের পথ সুগম করে।

    অপব্যয়ের ক্ষতিকর প্রভাব

    অপব্যয় শুধু আর্থিক দিকেই ক্ষতি সৃষ্টি করে না, বরং এর মাধ্যমে মানুষের রিজিকের বরকতও চলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

    یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَكُمۡ عِنۡدَ كُلِّ مَسۡجِدٍ وَّ كُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ

    ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও এবং পান কর। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ: আয়াত ৩১)

    রাসূলুল্লাহ (সা.)ও নিজ জীবনযাপনে অপব্যয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন। একবার তিনি সাদ (রা.)-কে অজুর মধ্যে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে প্রশ্ন করেছিলেন-

    مَا هَذَا السَّرَفُ ” فَقَالَ أَفِي الْوُضُوءِ إِسْرَافٌ قَالَ ” نَعَمْ وَإِنْ كُنْتَ عَلَى نَهَرٍ جَارٍ ”

    ‘হে সাদ! অপচয় করছ কেন?’ সাদ (রা.) বলেছেন, ‘অজুতে কি অপচয় হয়?’ তখন নবী (সা.) বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, প্রবহমান নদীতে বসেও যদি তুমি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করো, তা অপচয়।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫)

    মিতব্যয়ী জীবন: দারিদ্র্য মুক্তির উপায়

    যারা উপার্জন ও ব্যয়ে পরিমিতবোধের চর্চা করবে, তারা কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না। রাসুল (সা.) হাদিসে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যারা মিতব্যয়ী জীবনযাপন করেন, তারা কখনো দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন- ‘যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় করে, সে নিঃস্ব হয় না।’ (মুসনাদে আহমাদ ৭/৩০৩)

    আল্লাহর পছন্দ ও অপছন্দ

    অনেক সময় আমরা খরচের ক্ষেত্রে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, লোকদেখানো খরচ করি, যা পরকালে কোনো লাভ বয়ে আনে না। হাদিসে এসেছে-

    ‘আল্লাহ আমাদের তিনটি বিষয় পছন্দ করেন—তার ইবাদত করা, তার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করা এবং ঐক্যবদ্ধ থাকা। অন্যদিকে, তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন— অহেতুক কথা বলা, অহেতুক প্রশ্ন করা এবং অনর্থক সম্পদ বিনষ্ট করা। ’(মুসলিম ১৭১৫)

    অতএব, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিতব্যয়ী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা, ভাইবোন ও স্ত্রী-সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করা উচিত, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো অনর্থক খরচ না হয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

    اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ كَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَ كَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّهٖ كَفُوۡرًا

    ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান নিজ প্রতিপালকের প্রতি ঘোর অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৭)

    আসুন, আমরা সবাই ইসলামিক আদর্শে মিতব্যয়ী জীবনযাপন করি। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও বরকত অর্জন করি। মিতব্যয়ী হয়ে পরকালেও শান্তি এবং মুক্তি অর্জনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।