আঙুল ফোটানো

  • আঙুল ফোটালে হাড় ক্ষয় হয়?

    আঙুল ফোটালে হাড় ক্ষয় হয়?

    ‘আঙুল ফুটিও না, হাড় ক্ষয় হয়ে যাবে!’ ছোটবেলা থেকে আমরা প্রায় সবাই এই সতর্কবাণী শুনে বড় হয়েছি। কেউ বলেন, জয়েন্টে ‘পানি’ কমে যাওয়ায় এই শব্দ হয়। কেউ বলেন, হাড় একে অপরের সঙ্গে ঘষা লাগার কারণেই এই আওয়াজ। আবার অনেকে মনে করেন, বারবার আঙুল ফোটালে ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আসুন, জেনে নেওয়া যাক জয়েন্টের এই রহস্যময় শব্দের আসল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

    জয়েন্টের ভেতরে কী থাকে

    আমাদের শরীরের প্রতিটি সচল জয়েন্ট একটি বিশেষ ক্যাপসুল দ্বারা আবৃত থাকে। এর ভেতরে থাকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড, যা এক ধরনের স্বচ্ছ ও পিচ্ছিল তরল। এই তরল জয়েন্টকে সহজে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে এবং হাড়ের ঘর্ষণ কমায়। এই তরলের মধ্যে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।

    ‘ফট’ শব্দটি আসে কোথা থেকে

    যখন আমরা আঙুল বা অন্য কোনো জয়েন্ট টেনে হঠাৎ প্রসারিত করি, তখন জয়েন্টের ভেতরের চাপ দ্রুত কমে যায়। চাপ কমে যাওয়ার ফলে সাইনোভিয়াল তরলে দ্রবীভূত গ্যাস মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট গ্যাস বুদবুদ (বাবল) তৈরি করে। এই বুদবুদ তৈরির ঘটনাকেই ট্রাইবোনিউক্লিয়েশন বলা হয়। এই আকস্মিক বুদবুদ সৃষ্টির সময়ই ‘ফট’ বা ‘কট’ ধরনের শব্দ শোনা যায়। আগে মনে করা হতো, শব্দটি গ্যাস বুদবুদ ফেটে যাওয়ার কারণে হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, শব্দটি বুদবুদ ফেটে যাওয়ার কারণে নয়, বরং বুদবুদ তৈরি হওয়ার মুহূর্তেই হয়। অর্থাৎ, শব্দটি হাড়ের ঘর্ষণ থেকে নয়, বরং জয়েন্টের ভেতরে গ্যাসের বুদবুদ তৈরি হওয়ার ফল।

    কেন সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোটানো যায় না

    অনেকে লক্ষ করেছেন, একবার আঙুল ফোটানোর পর সঙ্গে সঙ্গে আবার শব্দ হয় না। এর কারণ তৈরি হওয়া গ্যাস বুদবুদটি আবার ধীরে ধীরে সাইনোভিয়াল তরলে মিশে যেতে কিছুটা সময় লাগে। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর আবার একই জয়েন্টে শব্দ করা সম্ভব হয়।

    সব জয়েন্টের শব্দ কি একই কারণে হয়

    না। জয়েন্টের শব্দ মূলত দুধরনের হতে পারে। প্রথমটি স্বাভাবিক শব্দ (ফিজিওলজিকাল)। ব্যথা নেই, ফোলা নেই, নড়াচড়ায় সমস্যা নেই; মাঝে মাঝে ‘ফট’ বা ‘কট’ শব্দ হয়। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। দ্বিতীয়টি রোগজনিত শব্দ (প্যাথলজিকাল)। যদি শব্দের সঙ্গে থাকে—ব্যথা, ফোলা, জয়েন্ট আটকে যাওয়া, নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা ও আঘাতের ইতিহাস, তাহলে এটি কার্টিলেজ ক্ষয়, লিগামেন্ট ইনজুরি, মেনিস্কাস ছিঁড়ে যাওয়া, টেনডন স্ন্যাপিং বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের লক্ষণ হতে পারে।আঙুল

    ফোটালে কি আর্থ্রাইটিস হয়

    বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আঙুল ফোটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণিত হয়নি।

    তবে অতিরিক্ত জোরে বা অভ্যাসবশত বারবার জয়েন্ট টানাটানি করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লিগামেন্ট বা নরম টিস্যুতে সামান্য আঘাত লাগতে পারে, হাতের গ্রিপ শক্তি কমে যেতে পারে বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই অকারণে বারবার জয়েন্ট ফোটানোর অভ্যাস না করাই ভালো।

    কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

    নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শব্দের সঙ্গে ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, হাঁটতে বা কাজ করতে সমস্যা, জয়েন্ট বারবার লক হয়ে যাওয়া, আঘাতের পর নতুন করে শব্দ শুরু হওয়া, কিংবা শব্দের সঙ্গে অস্থিরতা বা দুর্বলতা অনুভব করা।

    শেষকথা, জয়েন্টের ‘ফট’ শব্দ মানেই রোগ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি জয়েন্টের ভেতরে সাইনোভিয়াল তরলে থাকা গ্যাসের বুদবুদ তৈরির একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। তবে যদি এই শব্দের সঙ্গে ব্যথা, ফোলা বা চলাফেরায় অসুবিধা থাকে, তাহলে সেটিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ তখন এটি কোনো অর্থোপেডিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে। মনে রাখবেন, শব্দ নয়, শব্দের সঙ্গে থাকা উপসর্গই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

    লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, নিটোর, ঢাকা