বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ১৩টি দেশে ইসলাম ধর্মে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নতুন অনুসারীর অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রে।
গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যারা মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন, তাদের প্রতি পাঁচজনের একজন শৈশবে মুসলিম ছিলেন না। অর্থাৎ দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমদের ২০ শতাংশ এমন মানুষ, যারা বড় হওয়ার সময় ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন অথবা কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে বেড়ে ওঠেননি।এ দিক থেকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার ওপরে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ‘অৎড়ঁহফ ঃযব ডড়ৎষফ, গধহু চবড়ঢ়ষব অৎব খবধারহম ঞযবরৎ ঈযরষফযড়ড়ফ জবষরমরড়হং’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় ধর্ম পরিবর্তন বলতে একজন ব্যক্তি শৈশবে যে ধর্মীয় পরিচয়ে বড় হয়েছেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যে ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করছেন—এই দুইয়ের পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি গবেষণার মূল মাপকাঠি ছিল না।এ দিক থেকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার ওপরে।প্রতি পাঁচজনের একজন শৈশবে মুসলিম ছিলেন না
পিউর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম প্রাপ্তবয়স্কদের ৮০ শতাংশ শৈশব থেকেই মুসলিম হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ১৭ শতাংশ শৈশবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং ৩ শতাংশ কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই বড় হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশ মুসলিম আমেরিকান এমন পরিবার বা পরিবেশ থেকে এসেছেন, যেখানে ইসলাম তাদের শৈশবের ধর্ম ছিল না।
অন্য ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ খ্রিস্টান পটভূমির।পিউর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ১৩ শতাংশ শৈশবে খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। বাকি ৪ শতাংশের মধ্যে অন্য ধর্মীয় পটভূমির মানুষ এবং ৩ শতাংশ এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যারা কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই বেড়ে উঠেছিলেন।
এ পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও পরিচয় পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। দেশটিতে ইসলাম এখনো মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশের ধর্মীয় পরিচয়। ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মান্তরিতদের অনুপাত তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও, এর অর্থ এই নয় যে দেশটির মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ সাম্প্রতিক সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
১৩ দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের হার সর্বোচ্চ
পিউ রিসার্চ সেন্টার বিশ্বের ৩৬টি দেশে ধর্মীয় পরিবর্তন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেও মুসলিমদের ধর্মীয় পরিবর্তন বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত নমুনা পাওয়া গেছে ১৩টি দেশে। এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই ইসলাম ধর্মে প্রবেশের হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ‘অ্যাকসেশন’ বা প্রবেশের হার বলতে বর্তমানে কোনো ধর্মের অনুসারী ব্যক্তিদের মধ্যে কত শতাংশ শৈশবে সেই ধর্মের অনুসারী ছিলেন না, তা বোঝানো হয়েছে। এই মাপকাঠিতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের অ্যাকসেশন হার ২০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কেনিয়ায় এই হার ১১ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শৈশবে ইসলাম পালন না করা মানুষের অনুপাত কেনিয়ার তুলনায়ও প্রায় দ্বিগুণ।
তবে এই তুলনাকে দেশের মোট জনসংখ্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। উদাহরণ হিসেবে, কেনিয়ায় মোট প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১১ শতাংশ মুসলিম হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ১ শতাংশ। তাই যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণের অনুপাত বেশি হলেও দেশটির মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমদের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট।
অধিকাংশ ধর্মান্তরিতের খ্রিস্টান পটভূমি
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারীদের বড় অংশ খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে উঠেছেন- এ তথ্য নতুন নয়। পিউর আগের গবেষণাগুলোতেও মার্কিন মুসলিমদের ধর্মীয় পটভূমিতে বৈচিত্র্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, ইসলাম গ্রহণকারী মার্কিন মুসলিমদের বড় অংশ শৈশবে খ্রিস্টান ছিলেন। বিশেষ করে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক পটভূমি থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও সম্পর্কিত।
পিউর ২০২৫ সালের বৃহত্তর ধর্মীয় পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে শৈশবের ধর্মীয় পরিচয় থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে পরিবর্তন একটি ব্যাপক সামাজিক প্রবণতা। দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের ২০.২ শতাংশ শৈশবে কোনো ধর্মের অনুসারী থাকলেও বর্তমানে নিজেদের ধর্মীয়ভাবে অননুষঙ্গী হিসেবে পরিচয় দেন। বিপরীতে শৈশবে কোনো ধর্মীয় পরিচয় না থাকা মানুষের মধ্যে ৩.৫ শতাংশ বর্তমানে কোনো ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন শুধু ইসলাম গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়া, নতুন ধর্ম গ্রহণ এবং কোনো ধর্মীয় পরিচয় না নেওয়া- সব মিলিয়ে দেশটির ধর্মীয় মানচিত্রে পরিবর্তন ঘটছে।
ইসলাম ছাড়ার প্রবণতাও আছে
পিউর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণের পাশাপাশি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। দেশটিতে শৈশবে মুসলিম হিসেবে বেড়ে ওঠা মানুষের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ও মুসলিম পরিচয় ধরে রেখেছেন। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখার হার সবচেয়ে কম।
শৈশবে মুসলিম হিসেবে বেড়ে ওঠা মার্কিনদের একটি অংশ পরবর্তীতে কোনো ধর্মীয় পরিচয় না নেওয়ার দিকে গেছেন। আবার একটি ছোট অংশ খ্রিস্টান পরিচয় গ্রহণ করেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিবর্তন দুই দিকেই ঘটছে।
গবেষকরা ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনকে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। তাই শুধু কোনো একটি কারণকে ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি পিউ রিসার্চ সেন্টার।
প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের প্রসঙ্গ
ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সহজলভ্য তথ্য মানুষের ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ অনেক বাড়িয়েছে- এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পিউর এই গবেষণা সরাসরি প্রযুক্তি বা তথ্যপ্রবাহকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণের কারণ হিসেবে প্রমাণ করেনি।
গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষ শৈশবে কোন ধর্মীয় পরিচয়ে বেড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে কোন পরিচয় ধারণ করছে- তার তুলনা করা। ফলে ইসলাম গ্রহণের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো বিষয়কে গবেষণার সরাসরি ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় মানচিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয় স্থির কোনো বিষয় নয়। দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ জীবনের কোনো পর্যায়ে শৈশবের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করছেন। এর মধ্যে কেউ ধর্মীয় পরিচয় ছেড়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ নতুন ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
ইসলামের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের ১৩টি দেশে পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মুসলিমদের মধ্যে শৈশবে ইসলাম পালন না করা মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ অন্য ধর্ম বা কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছাড়া বেড়ে উঠে পরে মুসলিম হয়েছেন।
তবে এই তথ্যকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছেন- এমন হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা জীবনকালের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে; এটি কোনো নির্দিষ্ট বছরে কতজন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তার হিসাব দেয় না।
সব মিলিয়ে গবেষণার ফলাফল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জন্মসূত্রে মুসলিম নন। শৈশবে অন্য ধর্ম বা কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছাড়া বেড়ে ওঠা মানুষের একটি অংশ পরবর্তী জীবনে মুসলিম পরিচয় গ্রহণ করেছেন। এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
