দেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার ও নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের চাপে রয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা চালু করায় একদিকে বাড়ছে ব্যবসার ব্যয়, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত ঝুঁকি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ২০২৫-২৭ মেয়াদের সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের মতে, পোশাক খাতের তিনটি বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন। এর মধ্যে জ্বালানি সমস্যার দ্রুত সমাধান সবচেয়ে জরুরি। কারণ পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কারখানাগুলো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।
তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে একটি কারখানায় দৈনিক ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করা হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে এখন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। অর্ডার ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা চালাতে হচ্ছে কারখানাগুলোকে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজের সময়সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন ও আমেরিকা-ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর পোশাক কেনায় তারা তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয় করছেন। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আদেশে।
অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে আগ্রহী নয়। কারণ বাংলাদেশকে ভারত, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও চীনের মতো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতায় থাকতে হচ্ছে। ক্রেতারা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উৎপাদনমূল্যের পাশাপাশি পরিবহন, আমদানি শুল্কসহ সার্বিক ‘ল্যান্ডেড কস্ট’ বিবেচনা করে। ফলে বাংলাদেশের কারখানাগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিজেদেরই বহন করছে।
এই পরিস্থিতিতে সুদের হার কমানো অথবা কম সুদের তহবিল দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের কিছু অংশ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পোশাকশিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা অবকাঠামো। পণ্যের বৈচিত্র্য, বাণিজ্যনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রবন্দরের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে লিড টাইম তুলনামূলক বেশি।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পণ্য জাহাজে পাঠাতে অনেক ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, কলম্বো অথবা মালয়েশিয়া হয়ে যেতে হয়। গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা থাকায় ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের রপ্তানিকারকদের এ ধরনের বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয় না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের লিড টাইম কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ঋণের সুদের হার কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার ও বাজার ধরে রাখা উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়বে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
