এমপিওভুক্ত ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধ করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ জন্য এই খাতে দুই হাজার কোটি টাকা বিশেষ থোক বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে শিক্ষক-কর্মচারীদের শঙ্কা, একসঙ্গে পুরো টাকা তাদের এখনই নাও দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে এক লাখ ১০ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন ১০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আগামী ১৫ আগস্ট আয়োজিত কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট– দুই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এককালীন অর্থ বিতরণ কর্মসূচি।
২০২২ সাল থেকে কেউ টাকা পাননি
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ২০২২ সাল থেকে অবসর নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের কেউই অবসর সুবিধার টাকা পাননি। দীর্ঘদিন ধরে তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন। তাদের দুর্ভোগ লাঘবে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ১৫ আগস্ট একযোগে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা পরিশোধ করা হবে।
সচিব জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়কে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭৫ হাজার আবেদনের নিষ্পত্তি হবে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার ব্যক্তি কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থও পাবেন।
সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক হিসাবে একজন শিক্ষক-কর্মচারী গড়ে পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা পাবেন। তবে চূড়ান্ত হিসাব এখনও চলছে। বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা দিন-রাত কাজ করছেন।
সচিব আরও বলেন, এবার প্রথমবারের মতো আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে। এ জন্য সবার জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দালালচক্র বা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না।
২০২৩ সালে অবসর, ২০২৬-এও টাকা মেলেনি
খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর মুক্তময়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শামসুর রহমান ৩৩ বছর ৬ মাস শিক্ষকতা শেষে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যান। একই মাসে অবসর সুবিধার আবেদন করেন। এরপর প্রায় চার বছর কেটে গেলেও তিনি টাকা পাননি।
শামসুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘জুতোর তলা ক্ষয় হয়েছে, কিন্তু টাকার দেখা পাইনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার ঢাকায় এসেছি। প্রতিবারই বলা হয়েছে, অপেক্ষা করুন।’
রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ‘সারাজীবন শিক্ষকতা করেছি। এখন চিকিৎসার টাকাটুকুও পাচ্ছি না। শুধু জানতে আসি, কবে টাকা পাব।’
ময়মনসিংহের শফিকুল ইসলাম বলেন, টাকার আশায় বছর পার হয়ে যাচ্ছে। বয়স হয়েছে, কষ্টও বাড়ছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য টাকার খুব প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবার এসে শুনি, ফাইল প্রসেসে আছে।’
পুরো টাকা পাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সংশয়
সরকার ৭৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, আপাতত সরকারের লক্ষ্য মূলত শিক্ষকদের কাছ থেকে কেটে রাখা মূল অর্থ ফেরত দেওয়া; কিন্তু বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য মুনাফা বা প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
জানা গেছে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও শিক্ষাসচিব মো. আবদুল খালেক গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারা পৃথক বেশ কয়েকটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল, ধাপে ধাপে অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধ করা, অর্থ সংকটের কারণে আপাতত শিক্ষকদের কাছ থেকে কেটে রাখা মূল টাকা পরিশোধ করা, প্রথমে মূল
টাকা ও এক বছর পরে বাকি টাকা পরিশোধ করা। তবে প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মত হননি। তিনি অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে তীব্র অর্থ সংকটের কারণে আপাতত ২ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের নির্দেশ দেন।
তিন বছরে যেভাবে সংকটের তৈরি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত তিনটি কারণে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রথমত, চরম অর্থসংকট। দ্বিতীয়ত, তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা ও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত ব্যাংকে অর্থ বিনিয়োগ। তৃতীয়ত, পরিচালনা কমিটির অকার্যকারিতা এবং সফটওয়্যার জটিলতা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের বিপুল অর্থ সরকারি ব্যাংক থেকে সরিয়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়। বর্তমানে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় নগদ প্রবাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়।
আবেদনের ভয়াবহ জট
অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব অধ্যক্ষ মো. মোশাররফ হোসেন লিটন সমকালকে জানান, অবসর বোর্ডে বর্তমানে ৬৭ হাজারের বেশি আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।
কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যক্ষ মো. ইউসুফ আলী সমকালকে বলেন, কল্যাণ সুবিধার জন্য প্রায় ৪৩ হাজার আবেদন জমা আছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এই আবেদন জমা পড়েছে। তিনি জানান, শুধু কল্যাণ ট্রাস্টের ৪৩ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অথচ ট্রাস্টের হাতে আছে মাত্র ৬০০ কোটি টাকা।
অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকার বড় একটি অংশ নেওয়া হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকেই। এ জন্য চাকরিকালীন তাঁদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য কাটা হয় মূল বেতনের ৪ শতাংশ। এ ছাড়া সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা (৭০ টাকা অবসরের জন্য ও ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য) নেওয়া হচ্ছে। বাকি টাকা সরকার ও চাঁদা জমার সুদ থেকে সমন্বয় করে দেওয়া হয়।
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ৬ শতাংশ হারে টাকা কাটার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আদায় হয়। এফডিআরের লভ্যাংশ হয় প্রতি মাসে আরও ৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে গড়ে অবসর সুবিধার জন্য আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার, যা নিষ্পত্তি করতে প্রতি মাসে দরকার ১১৫ কোটি টাকা। এর মানে হলো প্রতি মাসে ৪২ কোটি টাকা ঘাটতি থাকে; বছরে যা ৫০৪ কোটি টাকা।
সফটওয়্যার বন্ধ, হাতে-কলমে যাচাই
অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জটিলতাও পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে। বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, পুরোনো সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ায় ডিজিটালভাবে আবেদন যাচাই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এখন প্রতিটি আবেদন হাতে-কলমে যাচাই করতে হচ্ছে।
এর ফলে একটি আবেদন নিষ্পত্তিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।
শিক্ষকদের প্রশ্ন, মুনাফার কী হবে
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বড় প্রশ্ন, তাদের বেতন থেকে কেটে রাখা অর্থ বহু বছর বিভিন্ন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। সেই বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা হওয়ার কথা, সেটির কী হবে?
শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে, ১৫ আগস্টের এই অর্থ বিতরণ কর্মসূচি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এতে সামগ্রিক সংকটের একটি অংশের সমাধান হবে মাত্র। কারণ এখনও হাজার হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন। এ জন্য প্রয়োজন কয়েক হাজার কোটি টাকা। আর বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল অর্থ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত অবসর তহবিলের ওপর চাপ পুরোপুরি কাটবে না।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন সমকালকে বলেন, লক্ষাধিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারও চিকিৎসার টাকা নেই, কারও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে কেউ অবসর বা কল্যাণের টাকা পাননি। দ্রুত সব পাওনা পরিশোধ করতে হবে। শুধু মূল টাকা নয়, বিধিমালা অনুযায়ী প্রাপ্য পুরো অর্থ দিতে হবে। অন্যথায় শিক্ষক সমাজ তা মেনে নেবে না।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
