দেশের বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি হওয়া একাধিক ত্বক ফর্সাকারী (ফেয়ারনেস) ক্রিমে ভয়াবহ মাত্রার বিষাক্ত ধাতু মার্কারির উপস্থিতি পেয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটির পরীক্ষায় ৮টি ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে বাংলাদেশ মানদণ্ডে অনুমোদিত মাত্রার বহু গুণ বেশি মার্কারি শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রসাধনী বিক্রি, বিতরণ, মজুদ ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএসটিআই।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই জানায়, বাজার থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে এসব উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ মান (বিডিএস-১৩৮২) অনুযায়ী প্রসাধনীতে মার্কারির সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১.০০ পিপিএম হলেও পরীক্ষায় কয়েকটি পণ্যে এর চেয়ে শতগুণেরও বেশি মার্কারি পাওয়া গেছে।
বিএসটিআই জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে বিভিন্ন বিদেশি ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের বিক্রি বেড়েছে। এসব পণ্যের বড় একটি অংশ বৈধভাবে আমদানি না হয়ে যাত্রীদের লাগেজ কিংবা চোরাইপথে দেশে প্রবেশ করছে। ফলে এসব পণ্যের মান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে না। এ অবস্থায় বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা চালায় সংস্থাটি।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, পাকিস্তানের এস.জে. এন্টারপ্রাইজের চাঁদনি হোয়াটেনিং ক্রিমে ১২০.৩৯ পিপিএম মার্কারি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের ক্রিয়েটিভ কসমেটিকসের ডিউ বিউটি ক্রিমে ১২৩.৩৭ পিপিএম, নুর এন্টারপ্রাইজের নুর হোয়াটেনিং ক্রিমে ৮২.৭৬ পিপিএম, লোয়া ইন্টারন্যাশনালের নাভিয়া হোয়াটেনিং ক্রিমে ৭৯.৭০ পিপিএম এবং নাভিয়া বিউটি ক্রিমে ৫৯.৮২ পিপিএম মার্কারি শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের কিউসিআই কোম্পানির নিউ ফেস বিউটি ক্রিমে ৪৪.৭২ পিপিএম, গৌরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেডের গৌরি বিউটি ক্রিমে ৫৬.৯৩ পিপিএম এবং চীনের জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকস কোম্পানির ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিমে ৬৭.৪৯ পিপিএম মার্কারি পাওয়া গেছে।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ‘‘জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও ধরনের আপসের সুযোগ নেই। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাই বিএসটিআইয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি কিংবা বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
তিনি জানান, বাজারে নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে বিএসটিআই নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ, বাজার তদারকি, সার্ভিল্যান্স এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে।
একই সঙ্গে ভোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘অজ্ঞাত উৎস বা অনুমোদনহীন ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম কেনা ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রসাধনী কেনার আগে অবশ্যই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ও পণ্যের বৈধতা যাচাই করতে হবে। কোনও সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা বিএসটিআইকে জানানোরও আহ্বান জানান তিনি।
কেনবিপজ্জনকমার্কারি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কারি একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ভারী ধাতু। দীর্ঘদিন মার্কারিযুক্ত স্কিন ক্রিম ব্যবহার করলে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে ত্বক অস্বাভাবিকভাবে পাতলা হয়ে যায়, স্থায়ী দাগ, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।
শুধু ত্বকই নয়, শরীরে ধীরে ধীরে জমতে থাকা মার্কারি কিডনির মারাত্মক ক্ষতি, স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা এবং স্মৃতিশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই বিষাক্ত উপাদান অনাগত শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এ কারণে বিএসটিআই সংশ্লিষ্ট ৮টি ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিম ব্যবহার না করার পাশাপাশি অবৈধভাবে আমদানি হওয়া প্রসাধনী কেনা থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
