দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকদের সেবা মাশুলে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনও গ্রাহক মাসে তিনবারের বেশি ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নগদ টাকা উত্তোলন করলে তাকে অতিরিক্ত ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হতে পারে। পাশাপাশি আরও ১৪ ধরনের ব্যাংকিং সেবায় নতুন ফি আরোপ বা বিদ্যমান মাশুল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়— এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, যেকোনও প্রস্তাব অনুমোদনের আগে এর প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা হবে।
এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী— মাসে তিনবারের বেশি কাউন্টার থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি; দীর্ঘদিন অচল থাকা ব্যাংক হিসাব পুনরায় সচল করতে ৫০০ টাকা ফি; ঋণ প্রক্রিয়াকরণ (লোন প্রসেসিং) ফি কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব; বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবায় নতুন ফি সংযোজন এবং বিদ্যমান চার্জ বৃদ্ধি।
ব্যাংকারদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শাখাভিত্তিক সেবার ওপর চাপ কমবে এবং গ্রাহকরা ডিজিটাল ব্যাংকিং, এটিএম ও বিকল্প চ্যানেল ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, “গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ফি বা চার্জ আরোপ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে। তাই এই ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব দিক বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে সেবা মাশুলের ওপর নির্ভর না করে ঋণ বিতরণ ও অন্যান্য স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গ্রাহকদের উদ্বেগ
প্রস্তাবটি সামনে আসার পর সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং সেবার খরচও বাড়ানো হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট আমানতকারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যেসব গ্রাহক এখনও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও অনেক শহরতলিতে কাউন্টার থেকেই অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত লেনদেন করেন। তাদের জন্য অতিরিক্ত ফি নতুন আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে উৎসাহ নাকি বাড়তি চাপ?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, কাউন্টারে লেনদেন নিরুৎসাহিত করে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের লক্ষ্য ইতিবাচক হলেও, বিকল্প সেবাগুলো সবার জন্য সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ না হলে শুধু ফি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
তাদের মতে, এটিএম বুথের সংখ্যা বৃদ্ধি, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবায় অভ্যস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরই এ ধরনের নীতি কার্যকর করা উচিত। অন্যথায় এটি ব্যাংকিং সেবার ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি
এবিবির প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া নতুন কোনও ফি বা চার্জ কার্যকর হবে না। তাই গ্রাহকদের আপাতত অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানাবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
