ধ্বংসস্তূপে হাজারো মরদেহ, তাঁবুতে তাঁবুতে আতঙ্ক
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরের একটি বালুময় পথে নীল, হলুদ ও সাদা রঙের একটি ফুটবল পায়ে নিয়ে দৌড়াচ্ছিল ১৪ বছর বয়সী কিশোর কারাম। যুদ্ধ শুরুর আগে তার স্বপ্ন ছিল, একজন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার। তবে তার এই স্বপ্ন এখন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে বাস্তুচ্যুত এই কিশোর সিএনএনকে বলেছে, আমার স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় খেলতাম। যুদ্ধের আগে জীবনটা খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু এখন আর জীবন বলে কিছু নেই।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে একসময় ভূমধ্যসাগরের নীল দিগন্ত দেখা যেত, সেখানে এখন শুধু পোড়া কৃষিজমি, ধ্বংসপ্রাপ্ত ফলের বাগান এবং অসংখ্য ধ্বংসস্তূপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিতে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে, তখন গাজার বাসিন্দারা বলছেন, তারা এমন একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যে বসবাস করছেন যার বাস্তব প্রভাব তারা অনুভব করছেন না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইল বিদেশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।
যুদ্ধবিরতি হলেও বাস্তব পরিবর্তন নেই
দীর্ঘ দুই বছরের যুদ্ধ ও অবরোধের পর গত বছরের অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাস দুই ধাপের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন এবং নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠনের কথা ছিল।
কিন্তু আট মাসেরও বেশি সময় পার হলেও এসব পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভ মে মাসেই সতর্ক করেছিলেন যে, গাজা একটি “বিপজ্জনক স্থবির অবস্থার” মধ্যে রয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য গঠিত বোর্ড অব পিস সম্প্রতি সাইপ্রাসে বৈঠক করলেও ভবিষ্যৎ পথ এখনও স্পষ্ট নয়। হামাসের কাছ থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয়ার জন্য যে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের কথা ছিল, তার কোনো সময়সূচি এখনো নির্ধারণ হয়নি। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীও এখনও মোতায়েন হয়নি।
অন্যদিকে ইসরাইল গাজার তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করে আরও এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং হামাসের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত মাসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি সেনাবাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে আরও এলাকা দখলের ইঙ্গিত দেন।
অপরদিকে হামাসও পুনর্গঠিত হয়েছে, অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং গাজার বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ২১ জুন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় গাজায় অন্তত ১ হাজার ৫৯ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৪২৯ জন আহত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, অক্টোবরের পর থেকে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন শিশু নিহত হয়েছে।
জুন মাসে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন অভিযোগ করে, গাজায় শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ইসরাইল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইসরাইল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে “জাতিসংঘের নথির ছদ্মবেশে রাজনৈতিক রক্ত অপবাদ” বলে অভিহিত করেছে।
‘এখানে প্রকৃত কোনো যুদ্ধবিরতি নেই’
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে বাস্তুচ্যুত ত্রাণকর্মী স্যালি সালেহ বলেন, আপনি যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় বোমা হামলার শিকার হতে পারেন। এখানে প্রকৃত কোনো যুদ্ধবিরতি নেই।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তাদের অনেকেই একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
অস্বাস্থ্যকর অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসের কারণে চর্মরোগ ও পরজীবী সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাসের ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকায় এসব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্যালি সালেহ জানান, ইঁদুর, তেলাপোকা ও বেজি রাতে তাঁবুতে ঢুকে শিশু ও নবজাতকদের কামড়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি মানুষের ওপর আক্রমণও করছে।
আমরা এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের সন্তানদের ইঁদুর কামড়েছে। তারা আতঙ্কে আছেন, আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, বলেন তিনি।
আবর্জনা, নোংরা পানি ও মানবিক সংকট
গাজা সিটির পানি কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র হুসনি নাদিম মোহান্না জানান, শৌচাগারের সংকটের কারণে মানুষ মাটিতে গর্ত করে অস্থায়ী পায়খানা তৈরি করছে। এতে মাটি ও পানিদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
ইঁদুর ত্রাণের চাল ও আটা নষ্ট করে ফেলছে। অনেক পরিবার খাবারের পাত্র তাঁবুর ছাদে ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
ইসরাইলি সংস্থা সিওজিএটি দাবি করেছে, গত অক্টোবর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে, যা চুক্তিতে নির্ধারিত ন্যূনতম সংখ্যা। তাদের ভাষ্য, গাজার মানবিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে ইসরাইলি বিধিনিষেধ এবং ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলার কারণে মানবিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না।
ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজারো মরদেহ
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৭৮৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও অন্তত ৭ হাজার ৫০০ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির জেরুজালেমভিত্তিক মুখপাত্র প্যাট গ্রিফিথস বলেন, দীর্ঘদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকলে মরদেহ শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় উচ্চতা, আঙুলের ছাপ, দাঁতের গঠন, পুরোনো আঘাত বা জন্মদাগের মতো তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিশুদের খেলায়ও যুদ্ধের ছাপ
স্যালি সালেহ জানান, গাজার শিশুরা খেলতে গিয়েও জানাজা ও দাফনের দৃশ্য অভিনয় করছে, যা তাদের মানসিক ট্রমার গভীরতা প্রকাশ করে।
গাজা সিটিতে বাস্তুচ্যুত ২৪ বছর বয়সী লেখক ইয়াহইয়া আলহামারনা বলেন, যুদ্ধ শুধু ভবিষ্যৎ নয়, মানুষের পরিচয়ও কেড়ে নিচ্ছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে গাজায় বেকারত্বের হার বেড়ে ৮৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পূর্বে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ।
আলহামারনা বলেন, ফিলিস্তিনিদের প্রায়ই শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, মানুষ হিসেবে নয়। এটি অমানবিক।
তিনি বলেন, ধ্বংসের মধ্যেও মানুষ লিখছে, কথা বলছে এবং আশা ধরে রেখেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিহত ফিলিস্তিনি লেখক ও অধ্যাপক রিফাত আল-আরিরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তিনি চিন্তা, সংস্কৃতি ও শব্দের শক্তির প্রতীক ছিলেন। মানুষ এখনও লিখছে, কথা বলছে এবং আশা করছে। আর এটিই এক ধরনের প্রতিরোধ।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
