৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা

Bangladesh Bank unveils 60,000 crore taka stimulus package

প্রতিবেদন:

·

বন্ধ কলকারখানা চালু, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানিমুখীকরণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা দেবে ব্যাংকগুলো এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ।

এ ঋণের গ্রাহক পর্যায় সুদহার হবে সাত শতাংশ । সরকার ছয় শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এর মাধ্যমে দেশে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন। দুপুর আড়াইটায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কনফারেন্স হলে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। এতে গভর্নর এ বিশেষ তহবিলের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

গভর্নর বলেন, গত তিন বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আগে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পরে তা ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে চাপ বেড়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে গেছে। উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এ বিশেষ স্কিম নেওয়া হয়েছে।

কোন খাতে কত তহবিল

৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতে দেওয়া হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। সিএমএসএমই খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে তিন হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকা তহবিলের মধ্যে রপ্তানি খাতের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে দুই হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে এক হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ ও মাছ রপ্তানি খাতে দুই হাজার কোটি টাকা, পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিনিয়োগে এক হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য এক হাজার কোটি টাকা, স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকা থাকছে। সৃজনশীল অর্থনীতির এ ৫০০ কোটি টাকা সিএসআরের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক খরচ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বন্ধ কলকারখানা চালুর পাশাপাশি কৃষি খাত, পোশাক, সিএমএসএমই ও পরিবেশবান্ধব, সৃজনশীল অর্থনীতি (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) খাতে ঋণ ও অর্থায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

করোনার সময় প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ নিয়ে নয়ছয় হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তা খেলাপি হয়েছে। নতুন প্যাকেজের ঋণ নিয়ে নয়ছয় ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেএ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, আগে এ ধরনের তহবিল থেকে দেখা যেত, একটা গ্রুপ অনেক বেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এবার ওই ধরনের সুযোগ নেই। অনেক কড়াকড়ি করা হয়েছে। অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমরা হব না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের এ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, এ স্কিমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা মূলত রিফাইন্যান্সিংয়ের। ব্যাংক যখন নিশ্চিত হবে যে কোনো গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত, তখনই তাকে ঋণ দেবে এবং পরবর্তী সময়ে সে ঋণের বিপরীতে রিফাইন্যান্স সুবিধা দেওয়া হবে। পুরো স্কিমে সরকার কেবল ছয় শতাংশ সুদ ভর্তুকি দিচ্ছে। ব্যাংক খাতের অর্থ দিয়েই এই প্রণোদনা প্যাকেজ চলবে। এ উদ্যোগে নতুন করে টাকা ছাপানো বা বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই।

গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাত থেকে পাঁচ লাখ কোটি চুরি হয়ে গেছে। ভদ্রভাবে এটাকে খেলাপি বলা হয়। আসলে এটা খেলাপি না। চুরির এসব টাকা পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ ফেরত আনা অনেক সময়সাপেক্ষ। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চুরি হওয়া সম্পদের প্রোপার ডকুমেন্ট নেই। অর্থ ফেরত আনতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। টাকা উদ্ধারে মানি কোট আইন করা হচ্ছে। আইন পাস হলে দ্রুত কাজ করা সম্ভব হবে।

একক গ্রাহক ঋণসীমা বাড়ানো সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন প্রায় ৪০ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামও বেড়েছে। ফলে আগে যে পরিমাণ ঋণে একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল, বর্তমানে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই একক গ্রাহক ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ঋণ বিতরণ করবে।

সুদ কত, কারা পাবে

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, এ তহবিলের ঋণে সরকার ছয় শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে। আর গ্রাহকরা সাত শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। যেসব ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য আছে, তাদের থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে সরকার সুদ ভর্তুকি দেবে ছয় শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক চার শতাংশ।

এম কে

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ