বেলফো থেকে নাকবা: সশস্ত্র ইহুদিদের কতটা জানত ব্রিটেন?

প্রতিবেদন:

·

, ,

ফিলিস্তিনে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগের বছরগুলোতে ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা, নাশকতা ও হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানত ব্রিটিশ প্রশাসন। এমনকি এসব কর্মকাণ্ডকে ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তাও দিয়েছিল দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ব্রিটেনের ন্যাশনাল আর্কাইভসে সংরক্ষিত একসময়কার গোপন গোয়েন্দা নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য সামনে এনেছে সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরব।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে ফিলিস্তিনে হাগানাহ, ইরগুন ও স্টার্ন গ্যাংয়ের মতো ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বোমা হামলা, হত্যাকাণ্ড ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল। এসব হামলায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের পাশাপাশি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। গ্রাম ধ্বংস, নারী ও শিশু হত্যা এবং ফিলিস্তিনের বাইরে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য ছিল।

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস ব্যালফোর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান ঘোষণা করেন। তবে ওই ঘোষণায় স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের বিদ্যমান অ-ইহুদি জনগোষ্ঠীর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন না করার শর্তও রাখা হয়েছিল। সে সময় ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার বড় অংশই ছিল অ-ইহুদি।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইহুদিবাদী আন্দোলন বেলফোর ঘোষণাকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে থাকে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত ছিলেন না।

১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর এমআই৫-এর মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান জেমস রবার্টসন এক গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বেলফোর ঘোষণা ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটেনকে বাধ্য করেনি। তার মতে, ইহুদিবাদী আন্দোলন ঘোষণাটির মূল উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে এর ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল।

রবার্টসন ব্রিটেন ও আন্তর্জাতিক জনমতের ওপর চাপ সৃষ্টিতে ইহুদিবাদী আন্দোলনের তিনটি কৌশলের কথা উল্লেখ করেন—ব্যাপক প্রচার, অনিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনে অভিবাসন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তার এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইহুদিবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবি ও সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

সন্ত্রাসের নিন্দা করলেও সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহ

ব্রিটিশ নথিতে ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিলিস্তিনে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হ্যারল্ড ম্যাকমাইকেল লন্ডনকে জানান, ইহুদি সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সংগঠন সশস্ত্র হামলার নিন্দা করলেও অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশের তদন্তে সহযোগিতা করতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছিল না।

একই বছরের অক্টোবরে ম্যাকমাইকেল পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তার মূল্যায়ন ছিল, তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরের ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানুভূতি বাড়ছিল। তবে তার এই পর্যবেক্ষণ থেকে ইহুদি সম্প্রদায়ের সবাই হামলাকারীদের সমর্থন করতেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথিতে ইরগুনের প্রচারপত্রের কথাও রয়েছে। এসব প্রচারপত্রে ফিলিস্তিনে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরুর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা বাড়ে যে, ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা থামবে না।

ইহুদি এজেন্সির কার্যালয়ে বোমা হামলা নিয়ে প্রশ্ন

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ জেরুজালেমে ইহুদি এজেন্সির সদর দপ্তরে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ব্রিটিশ আর্কাইভের নথিতে উঠে এসেছে। ওই বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হন। নিহত সবাই ছিলেন ইহুদি। এ ছাড়া ৩৩ জন গুরুতর আহত এবং ৫১ জন সামান্য আহত হন।

ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের শেষ হাইকমিশনার স্যার অ্যালান কানিংহামের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ আগে মার্কিন কনস্যুলেটের একটি গাড়ি ইহুদি এজেন্সির চত্বরে প্রবেশ করেছিল।

গাড়িটির চালক ছিলেন মার্কিন কনস্যুলেটে কর্মরত ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান আন্তন কামিলো দাউদ। তিনি গাড়িটি চত্বরে রেখে ট্যাক্সিতে করে চলে যান। ইহুদি এজেন্সির একজন নিরাপত্তাকর্মী গাড়িটি ও চালককে চিনতে পেরেছিলেন বলে তদন্তে জানান। পরে ওই ট্যাক্সিচালক তদন্তকারীদের বলেন, দাউদ তাঁকে জানিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িটি সেখানে রেখে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন।

ব্রিটিশ তদন্তকারীরা অভিযোগ করেন, ইহুদি এজেন্সি তদন্তে সহযোগিতা করেনি। পরবর্তী এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাগানাহর সদস্যরা পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এজেন্সির চত্বরে প্রবেশ করতে বাধা দেন। ফলে বিস্ফোরণের প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে নথিতে উত্থাপিত এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিস্ফোরণের পেছনে কারা ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

ভবিষ্যৎ ইহুদি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে ব্রিটিশ উদ্বেগ

১৯৪৮ সালের মার্চে এমআই৫-এর পরিচালক পার্সি সিলিটো দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের টনটনে এক গোপন বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়।

ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের আশঙ্কা ছিল, ইহুদি এজেন্সি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে তাদের প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। ভবিষ্যতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এসব প্রতিনিধি কূটনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন, যা বিদেশে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মনে করতেন, নতুন রাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক গোয়েন্দা কাঠামো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের কৌশলগত স্বার্থের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ১৯৪৮ সালের একটি গোয়েন্দা নথিতে ইহুদি এজেন্সিকে সম্ভাব্য ইহুদি সরকারের মতো একটি কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সেখানে নিজস্ব সামরিক ও রাজনৈতিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর হাগানাহর নজরদারির কথাও উল্লেখ ছিল।

ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা ও বাস্তুচ্যুতির তথ্য ছিল ব্রিটিশদের কাছে

১৯৪৮ সালের এপ্রিল নাগাদ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন গ্রামে ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার বিস্তারিত তথ্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে থাকে। ৯ এপ্রিল জেরুজালেমের কাছাকাছি আল-কাস্তাল গ্রামে হামলার বিবরণ দিয়ে একটি বার্তা পাঠান হাইকমিশনার কানিংহাম। এতে বলা হয়, ইহুদিবাদী যোদ্ধারা মর্টার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে গ্রামটির বাড়িঘরে হামলা চালায়। এর ফলে ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

পরবর্তী একটি ব্রিটিশ বার্তায় এক ইহুদি মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। তিনি দাবি করেন, ওই হামলায় ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরো ২০০ জন। তবে হতাহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

ওই মুখপাত্র আরো স্বীকার করেন, আল-কাস্তালে হামলার বিষয়ে হাগানাহর আগে থেকেই জানা ছিল। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের বাইরেও তৎকালীন ট্রান্সজর্ডান পর্যন্ত ভূখণ্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ব্রিটিশ নথিতে তিবেরিয়াস হ্রদের কাছে নাসর আল-দিন গ্রামে প্রায় ২০০ ইহুদিবাদী যোদ্ধার হামলার তথ্যও রয়েছে। ওই ঘটনায় নয়জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং পাঁচজন আহত হন। একই বছরের ১৪ এপ্রিল তিবেরিয়াসের একটি ফিলিস্তিনি বাজারে মর্টার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এ সময় তিনটি বাড়ি বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয়।

ইহুদি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় আরব লিজিয়নের ভূমিকা

ব্রিটিশ আর্কাইভে সংরক্ষিত ১৯৪৮ সালের ২৮ মে তারিখের আরেকটি নথিতে জেরুজালেমের ইহুদি কোয়ার্টারের আত্মসমর্পণের পর সেখানকার ইহুদি বেসামরিক নাগরিক ও বন্দিদের সঙ্গে জর্ডানের আরব লিজিয়নের আচরণের বিবরণ রয়েছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর জর্ডানের বাহিনীর কাছে ওই এলাকার আত্মসমর্পণের সময় লিজিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ আল-তাল।

ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্পেনের কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি পাবলো দে আজকারাতে। তার বিবরণ অনুযায়ী, আত্মসমর্পণের পর ইহুদি বন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের হয়রানি করা হয়নি। আরব সেনারা বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুদের সহায়তা করেছিলেন। বিচ্ছিন্নভাবে লুটপাটের ঘটনা ঘটলে আরব লিজিয়ন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।

আল-তালের ভূমিকার প্রশংসা করে আজকারাতে বলেন, তার নেতৃত্বে পুরো অভিযানে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তার এই সাক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পরে ব্রিটিশ ও মার্কিন সাংবাদিকদের কাছে ঘটনাটি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেরুজালেমে ব্রিটিশ মিশনের পাঠানো এক বার্তায় মার্কিন কনস্যুলেটকে আরব লিজিয়নের আচরণ সম্পর্কে জানানোর প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন, এ বিবরণ মার্কিন সাংবাদিকদের কাছেও পৌঁছাবে।

নথিতে উঠে আসা ব্রিটিশদের জানা তথ্য

ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে ধারাবাহিক তথ্য ছিল। ব্যালফোর ঘোষণার ব্যাখ্যা নিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আপত্তি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা, ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং ভবিষ্যৎ ইহুদি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ—সবই এসব নথিতে উঠে এসেছে।

১৯৪৮ সালের নাকবার আগে ফিলিস্তিনে কী ধরনের সহিংসতা চলছিল এবং সে সম্পর্কে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কতটা অবগত ছিল, তা বুঝতে এসব দলিল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।