ফোল্ডেবল ফোনের পর প্রযুক্তির নতুন চমক কী?

প্রতিবেদন:

·

একসময় ছোট আকারের মোবাইল ফোন ছিল আধুনিকতার প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনে বড় পর্দার স্মার্টফোন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বড় ডিসপ্লের সুবিধা পেতে ফোনের আকারও বড় রাখতে হতো। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রযুক্তি নির্মাতারা নিয়ে আসে ফোল্ডেবল বা ভাঁজ করা যায় এমন ফোন। ভাঁজ করা অবস্থায় ছোট, আর খুললেই বড় পর্দা—এই উদ্ভাবন স্মার্টফোনের নকশায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা এখানেই শেষ নয়। এবার আলোচনায় এসেছে রোলেবল ডিসপ্লে, যেখানে পর্দা ভাঁজ করার পরিবর্তে গুটিয়ে রাখা কিংবা প্রয়োজনমতো প্রসারিত করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, ফোল্ডেবল ফোনের পর স্মার্টফোনের দুনিয়ায় পরবর্তী বড় পরিবর্তন কি আনবে এই প্রযুক্তি?

ভাঁজ নয়, এবার গুটিয়ে রাখার প্রযুক্তি

ফোল্ডেবল ফোনের ডিসপ্লে একটি নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে ভাঁজ হয়ে যায়। ফোনটি খুললে দুটি অংশ মিলে বড় পর্দা তৈরি করে। রোলেবল প্রযুক্তিতে পদ্ধতিটি আলাদা। এ ধরনের ডিসপ্লে একটি বিশেষ কাঠামোর মধ্যে গুটিয়ে রাখা যায়। প্রয়োজনের সময় যান্ত্রিক ব্যবস্থার সাহায্যে পর্দাটি বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে এবং এর প্রদর্শনক্ষেত্র বড় হতে পারে। ব্যবহার শেষে সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

এতে ফোনের মূল কাঠামো তুলনামূলক ছোট রেখেও বড় ডিসপ্লে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, বহন করার সুবিধা এবং বড় পর্দায় কাজ করার অভিজ্ঞতা—দুটি সুবিধাই একটি যন্ত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নমনীয় পর্দাই মূল ভিত্তি

রোলেবল ডিসপ্লে তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্দার নমনীয়তা। প্রচলিত স্ক্রিনের বিভিন্ন স্তর ও উপাদান বারবার বাঁকানো বা গুটিয়ে রাখার উপযোগী নয়। তাই এমন উপাদান প্রয়োজন, যা দীর্ঘদিন প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ার চাপ সহ্য করতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে OLED প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুলনামূলক পাতলা গঠন এবং নমনীয়ভাবে তৈরির সুবিধার কারণে OLED ডিসপ্লে এ ধরনের উদ্ভাবনের জন্য উপযোগী। তবে শুধু পর্দাকে নমনীয় করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ডিসপ্লের সুরক্ষা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, ব্যাটারি এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের অবস্থানও এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পুরো ব্যবস্থাটি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে।

প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাবে পর্দার আকার

রোলেবল ফোনের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে একই ডিভাইসে ভিন্ন আকারের ডিসপ্লে ব্যবহারের সুবিধা। পকেটে রাখার সময় ফোনটি থাকবে ছোট আকারে। কল করা, বার্তা পাঠানো কিংবা সাধারণ কাজের জন্য এই আকারই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু ভিডিও দেখা, ই-বুক পড়া কিংবা বড় নথি নিয়ে কাজ করার সময় পর্দাটি প্রসারিত করে নেওয়া যাবে।

এতে ফোনের পুরো শরীর বড় না করেও দৃশ্যমান পর্দার জায়গা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী স্মার্টফোনের ব্যবহার-পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে পারে।

স্মার্টফোনের বাইরেও সম্ভাবনা

রোলেবল ডিসপ্লের ব্যবহার শুধু মোবাইল ফোনে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। ল্যাপটপে অতিরিক্ত বড় পর্দা, গাড়ির ড্যাশবোর্ডে প্রয়োজনমতো দৃশ্যমান ডিসপ্লে কিংবা কম জায়গায় সংরক্ষণযোগ্য টেলিভিশন তৈরিতেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। বহনযোগ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার নিয়ে সম্ভাবনা রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, ভবিষ্যতের কোনো বহনযোগ্য কম্পিউটার ছোট আকারে রাখা গেলেও কাজের সময় তার পর্দা বড় হয়ে যেতে পারে। একইভাবে ঘরে জায়গা বাঁচাতে টেলিভিশনের ডিসপ্লে গুটিয়ে রাখার ধারণাও বাস্তব রূপ পেতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার ব্যাপক বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদনব্যয়ের ওপর।

স্থায়িত্বই বড় পরীক্ষা

রোলেবল ডিসপ্লের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দীর্ঘস্থায়িত্ব। একটি পর্দাকে বারবার গুটিয়ে রাখা ও প্রসারিত করার ফলে এর বিভিন্ন স্তরে চাপ ও ঘর্ষণ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ডিসপ্লের কার্যকারিতা কমে যাওয়া কিংবা যান্ত্রিক অংশে ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এ কারণে এমন প্রযুক্তি তৈরি করা জরুরি, যা অসংখ্যবার ব্যবহারের পরও স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি স্ক্রিনের ওপর আঁচড় পড়া, ক্ষতি হওয়া এবং অন্যান্য বাহ্যিক প্রভাব থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

ফোনের অভ্যন্তরীণ নকশাও আরেকটি জটিল বিষয়। ডিসপ্লে বড়-ছোট হওয়ার সময় ব্যাটারি, ক্যামেরা, প্রসেসর ও সার্কিটের বিন্যাস কীভাবে কার্যকর রাখা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পর্দা সরানোর জন্য মোটর বা যান্ত্রিক ব্যবস্থা যুক্ত হলে ফোনের ওজন, পুরুত্ব ও বিদ্যুৎ খরচ বাড়তে পারে। ধুলাবালি ও আর্দ্রতা থেকে চলমান অংশগুলোকে সুরক্ষিত রাখাও সহজ হবে না।

দাম কমবে কি?

নতুন প্রযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদনব্যয় সাধারণত বেশি থাকে। নমনীয় ডিসপ্লে, বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা এবং জটিল যান্ত্রিক কাঠামো যুক্ত হলে রোলেবল ফোনের দামও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শুরুতে এটি সীমিতসংখ্যক ক্রেতার মধ্যেই জনপ্রিয় হতে পারে।

তবে উৎপাদনপ্রক্রিয়া উন্নত হলে এবং প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত হলে খরচ কমার সুযোগ তৈরি হবে। তখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছেও এ ধরনের ফোন পৌঁছাতে পারে। অবশ্য সেটি নির্ভর করবে নির্মাতাদের উদ্ভাবন, বাজারের চাহিদা এবং উৎপাদনব্যয় কমানোর সক্ষমতার ওপর।

স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

রোলেবল ডিসপ্লে কেবল পর্দার আকার পরিবর্তনের নতুন কৌশল নয়; এটি ভবিষ্যতের স্মার্ট ডিভাইসের নকশা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। এত দিন একটি যন্ত্রের পর্দার আকারকে নির্দিষ্ট হিসেবেই ভাবা হয়েছে। কিন্তু রোলেবল প্রযুক্তি সেই ধারণার বাইরে গিয়ে একই ডিভাইসে ছোট ও বড় পর্দা ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

তবে এই প্রযুক্তিই যে ফোল্ডেবল ফোনের পর স্মার্টফোনের পরবর্তী বড় অধ্যায় হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আকর্ষণীয় নকশার পাশাপাশি একটি ডিভাইসকে হতে হবে টেকসই, নির্ভরযোগ্য, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং ক্রেতার সাধ্যের মধ্যে। এসব শর্ত পূরণ করতে পারলেই রোলেবল ফোন বাজারে উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নিতে পারবে।

ফোল্ডেবল ফোন দেখিয়েছে, প্রয়োজনে স্মার্টফোনের পর্দা ভাঁজ করা যায়। রোলেবল ডিসপ্লে সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—যেখানে পর্দা গুটিয়ে রাখা এবং প্রয়োজনমতো প্রসারিত করার সুযোগ থাকবে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই উদ্ভাবন বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে ভবিষ্যতের স্মার্টফোনের চেহারা ও ব্যবহার, দুটিই বদলে যেতে পারে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ