কেউ হত্যাকাণ্ড বা বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে—এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনে এমন ইঙ্গিত মিললেও পুলিশকে জানানো হচ্ছে না কেন? ব্যক্তিগত কথোপকথনের গোপনীয়তা রক্ষা, নাকি সম্ভাব্য প্রাণঘাতী হামলা ঠেকানো—কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো? কানাডায় স্কুলে বন্দুক হামলার আগে হামলাকারীর চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের তথ্য সামনে আসার পর এ প্রশ্ন নতুন করে উঠেছে। এআইয়ের কাছে সহিংসতার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আইনজ্ঞ ও গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।
২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার টাম্বলার রিজে ভয়াবহ বন্দুক হামলা চালায় ১৮ বছর বয়সি জেসি ভ্যান রুটসেলার। প্রথমে সে নিজের বাড়িতে মা ও সৎভাইকে হত্যা করে। পরে টাম্বলার রিজের একটি স্কুলে গিয়ে পাঁচ শিক্ষার্থীসহ আরো ছয়জনকে হত্যা করে। এরপর সে নিজেও আত্মহত্যা করে। প্রায় চার দশকের মধ্যে এটি ছিল কানাডায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্কুলে বন্দুক হামলা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগে জেসি গণহত্যা নিয়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন করেছিল। গত ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জেসির সঙ্গে হামলার পরিকল্পনায় ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনে।
এ ঘটনায় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকার ওপেনএআই ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগে বলা হয়, হামলা ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি এবং জেসির কথোপকথন সম্পর্কে তাদের জানাশোনা ছিল। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও আলাদাভাবে মামলা করেছেন। কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে না পারার ব্যর্থতার জন্য ওপেনএআইয়ের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
এ বিষয়ে আলজাজিরা মন্তব্য জানতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানটি সাড়া দেয়নি।
তবে কথোপকথনে সহিংসতার ইঙ্গিত পেলেই পুলিশকে জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। নাগরিক অধিকারবিষয়ক আইনজীবী জেনিন ইউনুসের মতে, বাধ্যতামূলক নজরদারি ও তথ্য প্রকাশের নিয়ম নাগরিক স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা বা অস্বস্তিকর ভাবনা পুলিশকে জানানো হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলে অনেকে এআই চ্যাটবট ব্যবহার এড়িয়ে যেতে পারেন।
অন্যদিকে, এআইয়ের মাধ্যমে এমন তথ্য পাওয়া সম্ভব, যা বড় ধরনের প্রাণঘাতী হামলা সংঘটনে সহায়তা করতে পারে। তাই সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কতটুকু, তা নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত আগস্টে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক এক ব্যবহারকারীর কথোপকথনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেইকে হত্যার হুমকির ইঙ্গিত পেয়ে সান ফ্রান্সিসকো পুলিশকে সতর্ক করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ব্যবহারকারী এআর-১৫ রাইফেলের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং আমোদেইকে নিজের নিশানায় রেখেছেন বলে দাবি করেছিলেন। তবে ওই ব্যক্তি পরে সান ফ্রান্সিসকো স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, তিনি মজা করেছিলেন এবং কাউকে আঘাত করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। এ ঘটনায় তাকে আটক করা হয়নি, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক ফজল বারেজ বলেন, বর্তমান এআই মডেলগুলো কাল্পনিক আলোচনা ও বাস্তবে সহিংসতা ঘটানোর বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে পার্থক্য করতে পারে না। সতর্ক করার সীমা খুব নিচে নির্ধারণ করা হলে লেখক ও গবেষকদের কথোপকথনও ভুলভাবে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আবার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করতে একাধিক কথোপকথনের ধরন ও ধারাবাহিকতা পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিচ্ছাকৃতভাবে সহিংস চিন্তা মাথায় আসা আর বাস্তবে হামলার পরিকল্পনা করা এক বিষয় নয়। কোনো কথোপকথনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির উদ্দেশ্য, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও আচরণের ধারাবাহিকতা বোঝা জরুরি।
ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক চিনমায়ি শর্মা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করার দায়িত্বের সঙ্গে এআই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের কিছুটা মিল রয়েছে। তবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রশিক্ষিত কর্মী, সুস্পষ্ট মানদণ্ড ও প্রয়োগযোগ্য নিয়ম নেই। ফলে কোন কথোপকথন পুলিশকে জানানো হবে, তা নির্ধারণে পক্ষপাতের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বক্তব্য অতিরিক্ত সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বোল্ডার ক্যাম্পাসের আইন বিভাগের অধ্যাপক ব্রায়ান চোইয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করার আইনি বাধ্যবাধকতা কিছু পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বর্তমান আইনি নজির অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, চ্যাটবট কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোচিকিৎসক নয় এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ কোনো সম্পর্কও নেই। তবে অবহেলা বা পণ্যের দায়সংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকতে পারে। যদিও তা প্রমাণ করা কঠিন।
সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে হুমকি শনাক্ত ও কর্তৃপক্ষকে জানানোর মানদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শুধু প্রয়োজনীয় তথ্যই ভাগ করা উচিত, যাতে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় থাকে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, তাদের কথোপকথন কখন পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে এবং কোন পরিস্থিতিতে সেই তথ্য অন্যের কাছে প্রকাশ করা হতে পারে।
তবে হত্যার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো কখন পুলিশকে জানাবে, আর কখন ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষা করবে—এ প্রশ্নের কোনো সর্বজনস্বীকৃত সমাধান এখনো নেই।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
