৫১টি সুপারিশের মাত্র একটি গ্রহণ করেছে সরকার: স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের ৫১টি মূল সুপারিশের মধ্যে সরকার এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান।

চট্টগ্রামের রাউজানে হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন

প্রতিবেদন:

·

,

স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান কথা বলেছেন বিডি গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে।

প্রশ্ন ১. আপনি স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পেছনে তাকালে কমিশনের কোন সুপারিশগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর কোনগুলো গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয়?

উত্তর: বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৫ ছিল স্থানীয় সরকার সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য গঠিত অষ্টম জাতীয় পর্যায়ের কমিশন। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে একটি শক্তিশালী, স্বশাসিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ সুপারিশ করা ছিল কমিশনের দায়িত্ব।

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল, আগে গঠিত কমিশনের সুপারিশ, সাত বিভাগে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ৬৪ জেলার ৪৬ হাজার ৮০ জন মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে কমিশন স্থানীয় সরকার সংস্কারে ৫১টি মূল সুপারিশ দেয়। এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকার এর মধ্যে মাত্র একটি সুপারিশ গ্রহণ করেছে।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের (২০২৫) অন্যতম মূল সুপারিশ ছিল দলনিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ফিরিয়ে আনা, যা ২০১৫ সালের আগে প্রচলিত ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন চালু করে, ফলে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পান। এই বিধান স্থানীয় নির্বাচনকে চরম সহিংস করে তোলে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব দুর্বল করে, সামাজিক বন্ধন নষ্ট করে এবং স্থানীয় শাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। একটি স্বাগত জানানোর মতো অগ্রগতি হলো, ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বর্তমান সংসদ প্রচলিত আইন থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্ত শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে কমিশনের বহু সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও আরও কার্যকর করতে তিনটি বড় ক্ষেত্রের সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা উচিত। সেগুলো হলো:

কাঠামোগত সংস্কার:

বর্তমান স্থানীয় সরকারব্যবস্থা খণ্ডিত, কাঠামোগতভাবে অসংগতিপূর্ণ এবং এর সমন্বয় দুর্বল। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে এতে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের তিন স্তরে তিনটি প্রতিষ্ঠান: জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে দুটি স্থানীয় সংস্থা রয়েছে: বড় শহরে সিটি করপোরেশন এবং ছোট শহরে পৌরসভা।

গ্রাম পর্যায়ে শুধু ইউনিয়ন পরিষদেই সরাসরি নির্বাচন হয়। উপজেলা পরিষদে আংশিক সরাসরি পদ্ধতি চালু আছে: শুধু চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা স্থানীয় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, আর উপজেলার ভেতরের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেন, যদিও এর পরিচালনায় তাঁদের সরাসরি ম্যান্ডেট নেই। জেলা পরিষদ গঠিত হয় পরোক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। জেলার ভেতরের নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা এর সদস্য হিসেবে কাজ করেন, অথচ জেলা পরিষদের ওপর তাঁদের সরাসরি প্রতিনিধিত্বমূলক ম্যান্ডেট নেই। এই ব্যবস্থা কাঠামো ও জবাবদিহিতে ফাঁক তৈরি করে, যা জেলা পরিষদের কার্যকর কাজে বাধা দেয়। অন্যদিকে শহর পর্যায়ে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা দুটিই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংস্থা।

কমিশনের সুপারিশ হলো, পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেরই (জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) একই নকশার কাঠামো থাকা উচিত, বিশেষ করে প্রতিটি স্তরে যৌক্তিক ওয়ার্ডব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন, যাতে সবগুলো একইভাবে কাজ করতে পারে।

এর পাশাপাশি কমিশন সুপারিশ করেছে, দক্ষভাবে কাজ করার জন্য গ্রাম ও শহরের পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেই একই সাংগঠনিক কাঠামো থাকা উচিত। জাতীয় পর্যায়ের সংসদীয় সরকারব্যবস্থার আদলে কমিশন প্রস্তাব করেছে, প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দুটি আলাদা অংশ থাকবে: আইনসভা অংশ ও নির্বাহী অংশ। আইনসভা অংশে থাকবেন চেয়ারম্যান (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার প্রধান) বা মেয়র (শহুরে স্থানীয় সংস্থার প্রধান) এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সব নির্বাচিত সদস্য। অন্যদিকে নির্বাহী অংশে থাকবেন চেয়ারম্যান এবং পাঁচ থেকে ছয়জন পূর্ণকালীন সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদ, যাঁরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্বে থাকবেন। নির্বাচিত সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন করবেন। গ্রাম ও শহরের স্থানীয় শাসনের জন্য একই ধরনের সাংবিধানিক কাঠামো ভারতে ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হয়, যা ১৯৯৩ সালে কার্যকর হয়।

এই ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান বা মেয়রের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে সাহায্য করবে এবং নির্বাচিত সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রয়োগের সুযোগ দেবে। এটি ক্ষমতার ভাগাভাগি বাড়াবে, গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করবে এবং স্থানীয় শাসনে জবাবদিহি বাড়াবে।

নির্বাচনী সংস্কার:

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের জরুরি একটি সংস্কার হলো নির্বাচনী সংস্কার, যা আগে বলা কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন আইন ও পদ্ধতিতে হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান করতে প্রথমেই প্রতিটি স্তরে জনসংখ্যার আকার অনুযায়ী যৌক্তিকসংখ্যক ওয়ার্ড থাকা উচিত।

বর্তমানে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে। কিছু ইউনিয়ন বড়, কিছু তুলনামূলক ছোট; আয়তন প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার থেকে ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। যেমন, সব ইউনিয়ন পরিষদে ৯টি ওয়ার্ড থাকলেও ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৪ লাখ পর্যন্ত। এত বড় পার্থক্য সত্ত্বেও সব ইউনিয়ন পরিষদ নয়টি ওয়ার্ডে ভাগ করা, ফলে সম্পদের বণ্টন অসম এবং প্রায়ই অদক্ষ হয়। কমিশন প্রস্তাব করেছে, একেকটি ইউনিয়নে ৯ থেকে ৩৯টি ওয়ার্ড থাকতে পারে, প্রতিটি ওয়ার্ডে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন মানুষ।

অন্যদিকে উপজেলা ও জেলা পরিষদে কোনো ওয়ার্ড নেই। ইউনিয়ন পরিষদের মতো উপজেলা ও জেলা পরিষদকেও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নির্বাচনী ওয়ার্ডে পুনর্গঠন করা যায়। যেমন, উপজেলা পরিষদের ভেতরে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে তিনটি ওয়ার্ড হিসেবে ধরা যায়; তাহলে পাঁচ ইউনিয়নের একটি উপজেলায় মোট ১৫টি নির্বাচনী ওয়ার্ড হবে। একইভাবে জেলা পরিষদের ভেতরে প্রতিটি উপজেলাকে তিন থেকে পাঁচটি ওয়ার্ড হিসেবে ধরা যায়। এই ওয়ার্ডগুলো শুধু নির্বাচনের উদ্দেশ্যে তৈরি হবে, যাতে প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি বাড়ে।

জাতীয় পর্যায়ে প্রচলিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে কমিশন চেয়ারম্যান (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার নেতা) বা মেয়রের (শহুরে স্থানীয় সংস্থার নেতা) সরাসরি নির্বাচনের বিধান বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে। এর বদলে সদস্য (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থা) বা কাউন্সিলররা (শহুরে স্থানীয় সংস্থা) জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং পরে নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করবেন। কমিশন দেখেছে, বর্তমান ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান বা মেয়রের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো “এক ব্যক্তির শাসনে” পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচিত সদস্যদের অর্থবহ ভূমিকা প্রায় থাকে না বা একেবারেই থাকে না। ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে কমিশন এই ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে, যার মাধ্যমে কর্তৃত্বের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইনি সংস্কার:

পাঁচটি স্থানীয় সংস্থা একই সময়ে গঠিত না হওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় সরকার চলে পাঁচটি আলাদা আইন ও শত শত বিধিমালার অধীনে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে জারি করা বিপুলসংখ্যক পরিপত্র ও গেজেট রয়েছে। আইন ও বিধির এই আধিক্য স্থানীয় সরকারের কাজে বিভ্রান্তি ও দ্বৈততা তৈরি করে, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি হয়, স্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদান ব্যাহত হয়। তা ছাড়া নির্বাহী আদেশে সময়ে সময়ে গেজেট ও পরিপত্র জারির বিদ্যমান বিধান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

শওকত আলী কমিশন ২০০৮-এর সুপারিশ অনুসরণ করে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৫ও স্থানীয় সংস্থাগুলোকে দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য একটি ছাতা আইনের সুপারিশ করেছে। কমিশন গ্রাম ও শহরের স্থানীয় সংস্থার জন্য দুটি আলাদা ছাতা আইনের পরামর্শ দিয়েছে।

প্রশ্ন ২. ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো মূলত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা চালাচ্ছেন। সেবা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে এর অর্থ কী দাঁড়িয়েছে?

উত্তর: প্রশাসকেরা স্থানীয় সংস্থার ব্যবস্থাপনা হাতে নিলে কার্যত তাঁরাই হয়ে ওঠেন “স্থানীয় কর্তৃপক্ষ”, যাঁরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মতো একইভাবে সেবা দিতে কম সক্ষম হতে পারেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর অনেক নির্বাচিত স্থানীয় সরকার নেতা পদ শূন্য রেখে পালিয়ে যান। সেসব স্থানীয় সরকার সংস্থার কাজ চালু রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেয়।

স্থানীয় সংস্থায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা সাধারণত শুধু রুটিন কাজ করেন এবং স্থানীয় চাহিদার প্রতি সীমিত সাড়া দিয়ে সেবা দেন। অন্যদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জবাবদিহি করেন, তাই কার্যকরভাবে সেবা দেওয়ার জন্য তাঁদের তাগিদ বেশি থাকে। তা ছাড়া এলাকার মানুষ প্রশাসকদের চেয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বেশি কাছের মনে করেন। এই দ্বিমুখী সম্পর্ক সেবা প্রদানে সাড়া ও জবাবদিহি শক্তিশালী করে। প্রশাসকেরা নেতৃত্বে থাকলে স্থানীয় সংস্থাগুলোতে এটির অভাব থাকে।

প্রশ্ন ৩. নির্বাচন কমিশন নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা স্থগিত করেছে এবং এখন আগামী বছরের প্রথমার্ধে, ৬ জুনের আগে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। কী হলে স্থানীয় নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে, আর তা দলীয় প্রতীকে হওয়া উচিত নাকি প্রতীক ছাড়া?

উত্তর: হ্যাঁ, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং আমরা আশাবাদী যে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় নির্বাচন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তা ছাড়া স্থানীয় সরকার কমিশন ২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন করার সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নির্বাচনী সহিংসতা কমাতে এবং অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি সরকার স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বিবেচনা করতে পারে, যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

প্রশ্ন ৪. কমিশন সুপারিশ করেছে, চেয়ারম্যান ও মেয়র সরাসরি নির্বাচিত না হয়ে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এতে ভোটার ও পরিষদের জন্য কী বদলাবে?

উত্তর: আগেই বলেছি, বর্তমান ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে, যেখানে চেয়ারম্যান বা মেয়র সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন এবং অন্য নির্বাচিত সদস্যদের অর্থবহ ভূমিকা সামান্যই থাকে। নির্বাচন যদি শুধু সদস্য বা কাউন্সিলর পদে হয় এবং তাঁরা পরে নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করেন, তাহলে সদস্যরা ক্ষমতায়িত হবেন এবং চেয়ারম্যান বা মেয়রকে তাঁদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চা শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে, যা পরে সেবা প্রদানকে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন ৫. পরিষদগুলো কেন্দ্রের অনুদানের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের জন্য অর্থ ও কর্তৃত্বের দিক থেকে কী প্রয়োজন?

উত্তর: আর্থিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারের একটি বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর থাকা উচিত।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ছাড়া সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের বেতন দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর করে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্তরের জন্য আলাদা আর্থিক বরাদ্দ বা অনুদান দেওয়া হয়। উন্নয়ন সহযোগীরাও নানা ধরনের উল্লম্ব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ও স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে কম সমন্বয়ে। ফলে স্থানীয় সংস্থাগুলো নিজেদের বাজেট পরিচালনা এবং স্থানীয় অগ্রাধিকার অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে খুব সামান্য বা কোনো স্বায়ত্তশাসনই পায় না।

আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ এগিয়ে নিতে ২০২৫ সালের কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ বিকেন্দ্রীকৃত “জেলা পরিকল্পনা” প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে জেলা এবং এর অন্তর্ভুক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনা একত্র করা হবে। এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। জেলার জন্য বরাদ্দ অর্থ বণ্টন এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষমতা জেলাকে দেওয়া উচিত। এই পদ্ধতি স্থানীয় আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে, উন্নয়ন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করবে এবং সরকারি সম্পদ স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত অগ্রাধিকারের দিকে যাওয়া নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশের সংবিধান সরকারকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশে স্থানীয় জনগণের নির্বাচিত একটি স্থানীয় সরকার সংস্থা থাকবে। স্থানীয় সংস্থার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোরও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যালয় আছে, যেগুলোকে একই ধরনের, পরস্পর জড়িয়ে যাওয়া দায়িত্ব দেওয়া আছে; এতে কাজের দ্বৈততা ও সম্পদের অপচয় হয়। সরকার ইতিমধ্যে ৯টি বিভাগ ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং ১৬টি বিভাগ উপজেলা পর্যায়ে হস্তান্তর করেছে। তবে এসব হস্তান্তর এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, কারণ এসব বিভাগের সংশ্লিষ্ট তহবিল, কর্মী ও অর্থ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা হয়নি।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে দক্ষ ও কার্যকর করতে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি বিভাগগুলোর দায়িত্বের সঙ্গে তাদের তহবিল ও কর্মীদেরও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা উচিত। এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে, প্রশাসনিক দ্বৈততা কমবে এবং সমন্বয় ও সেবা প্রদান উন্নত হবে।

প্রশ্ন ৬. সংসদ সদস্যদের কি স্থানীয় পরিষদে কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকা উচিত, নাকি দুটিকে আলাদা রাখা উচিত?

উত্তর: ভৌগোলিকভাবে সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্বাচনী এলাকা এক হলেও তিনটি প্রধান কারণে স্থানীয় সরকার সংস্থায় সংসদ সদস্যদের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকা উচিত নয়:

প্রথমত, সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা; তাঁদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন এবং সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। তাই তাঁদের প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত জনগণের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং জাতীয় নীতির পর্যায়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায়, তা নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। আইনপ্রণেতা সংসদ সদস্যদের এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগের সুযোগ দিলে ক্ষমতা পৃথক্‌করণের নীতি দুর্বল হতে পারে।

তৃতীয়ত, সংসদ সদস্যদের জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব যেন উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের (অর্থাৎ উপজেলা পরিষদের) নেতৃত্ব দিতে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের কর্তৃত্বকে ছাপিয়ে না যায়, সে জন্য তাঁদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা রাখা উচিত। তা না হলে সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আধিপত্য করবেন, যা উপজেলা পরিষদের স্বায়ত্তশাসন ও গুরুত্ব ক্ষুণ্ন করবে।

প্রশ্ন ৭. স্থানীয় পরিষদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন আছে। এসব আসনের কি প্রকৃত ক্ষমতা আছে, আর কী হলে তা বদলাবে?

উত্তর: স্থানীয় পর্যায়ে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই বিধান কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ আইন ১৯৯৭ ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে নারীদের তিনটি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান চালু করে। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক নির্বাচিত নারী সদস্য তিনটি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন, যার প্রতিটিতে একজন নির্বাচিত পুরুষ সদস্যও আছেন। ফলে পুরুষ ও নারী সদস্যদের এখতিয়ারে প্রায়ই সংঘাত ও দ্বৈততা দেখা দেয়, যেখানে পুরুষ সদস্যরাই প্রায়ই সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রাখেন। এভাবে বর্তমান ব্যবস্থা স্থানীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

নারীর অংশগ্রহণ আরও কার্যকর করতে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ ওয়ার্ড নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা যায়, যা পরপর নির্বাচনী চক্রে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে পূরণ হবে। যেমন, বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ কাঠামোয় পরপর তিনটি নির্বাচনে নয়টি ওয়ার্ডেই নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। প্রথম নির্বাচনে নারীরা সরাসরি তিনটি ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, পাঁচ বছর পরের নির্বাচনে পরের তিনটি ওয়ার্ডে, এবং তার পরের নির্বাচনেও এভাবে চলবে।

প্রশ্ন ৮. কোন একটি সংস্কার জেলা ও গ্রামের মানুষের কাছে রাষ্ট্রের পৌঁছানোর পথ সবচেয়ে বেশি উন্নত করবে?

উত্তর: রাষ্ট্রকে তৃণমূলের মানুষের কাছাকাছি আনতে পারে, এমন একক কোনো সংস্কার চিহ্নিত করা কঠিন। তবে বৃহত্তর অর্থে এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নীতির মাধ্যমে সরকারি সেবা প্রদানের উন্নতি, যা প্রশাসনিক ও আর্থিক দুই ধরনের বিকেন্দ্রীকরণই নিশ্চিত করবে। স্থানীয় সংস্থাগুলোর নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন থাকা উচিত। স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয়ভাবে, জেলা পর্যায়ে প্রণয়ন করা উচিত। এ জন্য কমিশনের সুপারিশ করা জেলা পরিকল্পনার ধারণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ