বিশ্বকে বদলে দিয়েছে গাজা-অ্যাবি মার্টিন

প্রতিবেদন:

·

, ,

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীর রাজনৈতিক চিন্তা, মানবাধিকারবোধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যাবি মার্টিন। তার মতে, গাজায় যা ঘটেছে, এরপর বিশ্ব আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকে তিনি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সামগ্রিক মুক্তির লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন র‍্যাপার ম্যাকলমোরের ফিলিস্তিনপন্থি সংগীত সফরের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন অ্যাবি মার্টিন। অনুষ্ঠানে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি গাজাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।

মার্টিন বলেন, ‘গাজা বিশ্বকে বদলে দিয়েছে, আমাদের প্রত্যেককে বদলে দিয়েছে। এটি সবার প্রকৃত অবস্থান উন্মোচন করেছে। এই লড়াইয়ের আগে পৃথিবী যেমন ছিল, আর কখনো সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।’

তার মতে, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নের চিত্রই সামনে আনেনি; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গণমাধ্যম, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের কথা বলা পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান অনেকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গাজা পরিস্থিতিতে নীরব থাকার আর সুযোগ নেই। প্রত্যেককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করবেন।

শিল্পীদের ভূমিকার প্রসঙ্গে মার্টিন বলেন, তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা মানুষকে নিস্তেজ করে রাখবেন, নাকি পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াবেন। সংস্কৃতি ও শিল্পকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নকে আরো বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরে মার্টিন বলেন, ফিলিস্তিনের মুক্তি বিশ্বের সব মানুষের আধিপত্য, নিপীড়ন ও সত্য বিকৃতির বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াই থেকে আলাদা নয়। অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে তিনি বৃহত্তর বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখেন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে সাংস্কৃতিক বয়কট ও সংহতি আন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ প্রচলিত রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের বয়ানের বাইরে গিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখছে। শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদেরও নিজেদের কাজের সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বের সম্পর্ক বিবেচনা করা উচিত।

অ্যাবি মার্টিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের দীর্ঘদিনের সমালোচক। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘গাজা ফাইটস ফর ফ্রিডম’-এও ফিলিস্তিনিদের জীবন, অবরোধ এবং প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এর আগে ‘কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্টিন বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের প্রশ্ন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ইস্যু নয়; বরং মানবজাতির সম্মিলিত মুক্তির প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছে। তার ভাষায়, মানুষের সম্মিলিত স্বাধীনতা ও মুক্তির সঙ্গে গাজা এবং ফিলিস্তিনের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

মার্টিনের মতে, গাজাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে সংহতি ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থানের গুরুত্ব সামনে এনেছে।

প্যারিসের ওই অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নকে তিনি শুধু একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও মানুষের মুক্তির বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ