বর্ষায় বীজতলা তলিয়ে গেলে কী করবেন?

প্রতিবেদন:

·

,

আষাঢ়-শ্রাবণের এই অতিবৃষ্টিতে যশোরের অনেক নিচু এলাকায় রোপা আমনের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেকেই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন যে সাধের চারাগুলো পচে নষ্ট হয়ে যাবে কি না। মনে রাখবেন, চারা যদি ৩-৪ দিনের বেশি পানির নিচে থাকে, তবেই ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। তবে ভয়ের কিছু নেই, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই চারা দিয়েই আমরা ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারব। বীজতলা রক্ষায় আমার সরাসরি মাঠের কিছু জরুরি পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:

১. পানি সরানোর ব্যবস্থা করুন সবার আগে
মেঘ কেটে রোদ ওঠার সাথে সাথে জমি থেকে পানি বের করার ব্যবস্থা করুন। যদি চারার ডগা সামান্য ডুবে থাকে, তবে নালা কেটে বা সেচ দিয়ে দ্রুত পানি কমিয়ে চারার মাথাটি অন্তত বের করে দিন। বীজতলার আশপাশে কোনো আগাছা বা ময়লা জমতে দেবেন না, এতে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে চারা পচে যায়।

২. কাদার আস্তরণ ধুয়ে ফেলুন

বৃষ্টি বা বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারার গায়ে কাদার একটা পাতলা আস্তরণ বা পলি জমে যায়। কাদা জমে থাকলে চারা রোদের আলো থেকে খাদ্য তৈরি করতে পারে না, ফলে চারা দ্রুত হলুদ হয়ে মারা যায়। তাই পানি নামার সাথে সাথে বালতি দিয়ে পরিষ্কার পানি ছিটিয়ে বা স্প্রেয়ার দিয়ে চারার কাদা ধুয়ে দিন।

৩. এখনই ইউরিয়া সার দেবেন না

পানি নেমে যাওয়ার পরপরই অনেকে তাড়াহুড়ো করে বীজতলায় ইউরিয়া সার দিয়ে ফেলেন—এটি একটি মারাত্মক ভুল কাজ। এতে চারা আরও নরম হয়ে পচে যাবে।

সঠিক নিয়ম: পানি সম্পূর্ণ নেমে যাওয়ার ৩ থেকে ৪ দিন পর চারা যখন সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং কিছুটা সতেজ দেখাবে, তখন সার দেবেন। চারা যদি হলুদ হয়ে যায়, তবে শতাংশ প্রতি ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৪০০ গ্রাম জিপসাম সার একসাথে মিশিয়ে উপরিপ্রয়োগ করুন।

৪. রোগ ও পোকার আক্রমণ ঠেকাতে স্প্রে

পানিতে ডুবে থাকার কারণে চারার গোড়া নরম হয়ে যায় এবং ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে, যাকে আমরা ‘চারা পচা রোগ’ বা ‘বাকানি রোগ’ বলি।

সমাধান: পানি শুকানোর পর পর প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কারবেনডাজিম বা ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন: নোইন বা ডাইথেন এম-৪৫) ভালোভাবে মিশিয়ে পুরো বীজতলায় স্প্রে করুন।
এই সময় মাজরা বা লেদা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে সঠিক কীটনাশক স্প্রে করুন।

৫. চারা তোলার সময় বাড়তি সতর্কতা

জলে ভেজা মাটি থেকে চারা তোলার সময় গোড়া বা শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি নামার সাথে সাথেই চারা তুলবেন না। মাটি হালকা ভেজা ও ঝুরঝুরে থাকা অবস্থায় (যেটিকে আমরা ‘জোঁ’ বলি) অত্যন্ত সাবধানে চারা তুলুন যাতে মূল শিকড় অক্ষত থাকে।

বিশেষ পরামর্শ

যদি কোনো কারণে বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েও যায়, তবে ভেঙে পড়বেন না। এখনও সময় আছে। দ্রুত নাবি বা দেরি করে লাগানো যায় এমন আমনের জাত—যেমন বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৪৬ অথবা নাইজারশাইল ধানের বীজ নতুন করে ফেলুন।

ডাপোগ বীজতলা: জায়গা না থাকলে বাঁশের চটা বা কলার ভেলায় কাদা মাটি দিয়ে “ডাপোগ বীজতলা” তৈরি করুন। এই পদ্ধতিতে মাত্র ১২-১৫ দিনেই রোপণযোগ্য চারা পাওয়া যায়।

নোট: যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি মাঠে কর্মরত আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা সবসময় আপনাদের পাশেই আছি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ