ইউক্রেনের ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ টানা পাঁচ বছর ধরে চলছে। এতে উভয় পক্ষের বহু হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে তবে যুদ্ধ বন্ধে এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো দেশ দুইটির মধ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে। এরইমধ্যে এই যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
ইউক্রেনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, সেনা ও অস্ত্র পাঠানোর পর এবার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটও রাশিয়ায় মোতায়েন করেছে পিয়ংইয়ং।
কোরীয় যুদ্ধের (১৯৫০-এর দশক) পর এটিই কোনো যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তার দাবি, নতুন এই ইউনিটে অন্তত ৯০ জন উত্তর কোরীয় সেনাসদস্য রয়েছেন। তাদের রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত জুলাইয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, রাশিয়া আরও ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা আনার পরিকল্পনা করছে এবং তাদের গ্রহণের জন্য ভোরোনেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করছে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
কত সেনা পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া?
ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়া ১০ থেকে ১২ হাজার সেনা রাশিয়ায় পাঠিয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি জানান, সে সময় রাশিয়ায় ১২ হাজারেরও বেশি উত্তর কোরীয় সেনা অবস্থান করছিল।
পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে উত্তর কোরীয় সেনার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজারে পৌঁছায়।
ইউক্রেনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা চলতি মাসে জানান, বর্তমানে কুরস্কে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ উত্তর কোরীয় সেনা রয়েছে। তবে তারা এখন সরাসরি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে না।
২০২৫ সালের এপ্রিলে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে যে, উত্তর কোরীয় সেনারা কুরস্কে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।
রাশিয়া কুরস্ক পুনর্দখলের দাবি করার পর দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা উত্তর কোরীয় সেনাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে পিয়ংইয়ং জানায়, নেতা কিম জং উনের নির্দেশেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
আরও কী ধরনের জনবল পাঠানোর ঘোষণা?
২০২৫ সালের জুনে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগু জানান, উত্তর কোরিয়া কুরস্কে ১ হাজার মাইন অপসারণ বিশেষজ্ঞ (স্যাপার) এবং ৫ হাজার সামরিক নির্মাণকর্মী পাঠাবে। তাদের দায়িত্ব হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মাইন অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্র্নিমাণে সহায়তা করা।
একই মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ব্রিফিংয়ের বরাত দিয়ে দেশটির আইনপ্রণেতারা জানান, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ায় আরও জনবল পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। পাশাপাশি তারা রাশিয়াকে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এর বিনিময়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে অতিরিক্ত প্রকৌশলী, মাইন অপসারণকারী বা নতুন সেনারা ইতোমধ্যে রাশিয়ায় পৌঁছেছেন কি না, কিংবা তারা যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন কি না- তা এখনও স্পষ্ট নয়।
কী কী অস্ত্র দিয়েছে উত্তর কোরিয়া?
ইউক্রেন ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে লাখ লাখ আর্টিলারি ও মর্টারের গোলা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার কামান এবং মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম (এমএলআরএস) সরবরাহ করেছে।
রয়টার্স ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওপেন সোর্স সেন্টারের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত রুশ পতাকাবাহী চারটি কার্গো জাহাজ উত্তর কোরিয়ার রাজিন বন্দর ও রাশিয়ার বন্দরের মধ্যে ৬৪টি যাত্রা সম্পন্ন করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ১৬ হাজার কনটেইনার গোলাবারুদ পরিবহন করা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের প্রায় অর্ধেকই উত্তর কোরিয়া সরবরাহ করছে। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (জিইউআর) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে প্রায় ৪০ লাখ আর্টিলারি শেল দিয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত তারা ১৪৮টি কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
কেন রাশিয়াকে সহায়তা করছে উত্তর কোরিয়া?
২০২৪ সালের জুনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পিয়ংইয়ং সফরের সময় তিনি ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করেন। ওই চুক্তিতে কোনো একটি দেশ বাইরের আগ্রাসনের শিকার হলে অপর দেশ সহযোগিতা করবে- এমন একটি ধারা রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া বলছে, চুক্তির আওতায় মিত্র দেশকে সহায়তা করতেই তারা সেনা পাঠিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে কিম জং উন বলেন, একটি “ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের” প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়া উত্তর কোরিয়ার সার্বভৌম অধিকারের বৈধ প্রয়োগ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া বৈদেশিক মুদ্রা, তেল, অর্থনৈতিক সহায়তা, রুশ সামরিক প্রযুক্তি এবং বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
এছাড়া উত্তর কোরীয় সেনারা ড্রোন যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, আর্টিলারি সমন্বয় এবং আধুনিক যুদ্ধকৌশলের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের কার্যকারিতাও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে মূল্যায়নের সুযোগ মিলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বলছে, উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েন এবং রাশিয়ায় অস্ত্র সরবরাহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘন করছে।
পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে ২০০৬ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় অন্য দেশগুলো উত্তর কোরীয় সামরিক প্রশিক্ষক, উপদেষ্টা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামরিক বা আধাসামরিক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে আশ্রয় দিতে পারে না।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার কয়েকটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যারা মস্কোকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও দুই দেশের অবৈধ সামরিক সহযোগিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
অন্যদিকে ন্যাটো সতর্ক করে বলেছে, উত্তর কোরিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু ইউরোপ নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ও উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
