মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে বৈঠক ১ নভেম্বর
নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও এখনো ঝুঁকিমুক্ত হয়নি সামষ্টিক অর্থনীতি। জ্বালানি সংকটের কারণে অর্থনীতিতে আমদানির চাপ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো উচ্চ। বিনিয়োগে কোনো সুখবর নেই। রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি। কর্মসংস্থানেও উন্নতি নেই।
ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে মনে করে অর্থ বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা আহ্বান করেছে অর্থ বিভাগ। সভায় অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনু বিভাগের যুগ্ম সচিব মনজুরুল হক সভাপতিত্ব করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি সরকারের ২০২৮-২৯ অর্থবছর হতে এপ্রিল-মার্চ মেয়াদে অর্থবছর চালুর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল অর্থবছর বিবেচনা করে জুলাই-মার্চ মেয়াদি ৯ মাসের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের হিসাব করা হবে।
বিবিএসের তথ্যমতে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও তা এখনো আট শতাংশের ওপরে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরে ৪.১৪ শতাংশে আটকে আছে। চলতি বছরও প্রবৃদ্ধির ধারা শ্লথ। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নেমেছে নিম্নতম স্তরে। ফলে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্থিতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমন বাস্তবতায় বৈঠকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। অর্থনীতির বর্তমান ঝুঁকি চিহ্নিত করে আগামী দিনে কোন খাতে কী ধরনের নীতি সহায়তা প্রয়োজনÑসে বিষয়েও দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
বাড়ছে জ্বালানি আমদানির চাপ
গত কয়েক মাসে আমদানি ব্যয়ের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি খাত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি বিল রেকর্ড ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে, যা আগের অর্থবছরের ৫.১৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে বাড়তি ডলারের চাহিদা, রিজার্ভের ওপর চাপ, জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে আমদানি ব্যয় এখন সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
সবশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে সেপ্টেম্বরে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮.৩২ শতাংশে উঠেছে। আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কা
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা প্রবৃদ্ধিতে। বিবিএসের সবশেষ সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ, কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও প্রবৃদ্ধি এখনো আগের দশকের ছয় শতাংশের বেশি গড় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারেনি। প্রতিবছরই প্রবৃদ্ধির এই ধারা শ্লথ।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬.৫০ শতাংশ। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমান প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ থেকে এক অর্থবছরে প্রায় আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর বড় লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস সরকারের লক্ষ্যের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। আইএমএফ চলতি সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে দুর্বল পূর্বাভাস দিয়েছে এবং আর্থিক, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের চাপের কথা বলেছে। বিশ্বব্যাংকও অর্থনীতিতে ধীর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের চাপ ও দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি এখন বেসরকারি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। মে মাসে এই হার ছিল ৪.৯৮ শতাংশ। এর আগে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও এখন তা নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
কর্মসংস্থানে বাড়ছে চাপ
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তির আকার সাত কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার এবং নারী দুই কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। আর প্রতিবছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ, প্রতিবছর প্রায় ১৩-১৪ লাখ নতুন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
