খুব গরম চা বা কফি পান করলে খাদ্যনালির এক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি বাড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত প্রায় ১০ লাখ মানুষের ওপর করা গবেষণাটি মঙ্গলবার ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যানসার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণ পানীয়ের তাপমাত্রা যত বেশি হয়, খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বা এসসিসির ঝুঁকিও তত বাড়ে। যারা পানীয় ‘গরম’ পছন্দ করেন, তাদের এ ক্যানসারের ঝুঁকি উষ্ণ পানীয় পছন্দকারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আর যারা পানীয় ‘খুব গরম’ পছন্দ করেন, তাদের ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি।
খাদ্যনালি বা ইসোফ্যাগাস হলো মুখ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পেশিবহুল নালি, যার মাধ্যমে খাবার ও পানীয় পাকস্থলীতে পৌঁছায়। বিশ্বজুড়ে খাদ্যনালির ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরনগুলোর একটি হলো স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার মধ্যবয়সী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের তারা জানতে চেয়েছিলেন, তারা সাধারণত ‘খুব গরম’, ‘গরম’ নাকি ‘উষ্ণ’ পানীয় পছন্দ করেন। একই সঙ্গে দিনে ছয়টির কম নাকি ছয়টি বা তার বেশি গরম পানীয় পান করেন, সেটিও জানতে চাওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীরা ‘মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’ এবং ‘ইউকে বায়োব্যাংক’—এই দুটি বড় গবেষণা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গড়ে ১৪ দশমিক ২ বছর এবং ১১ দশমিক ১ বছর অনুসরণকালে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মোট ২ হাজার ৩৪৮টি খাদ্যনালির ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেক দিনে ছয়টি বা তার বেশি গরম পানীয় পান করতেন। প্রায় ১৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছিলেন, তারা পানীয় খুব গরম অবস্থায় পান করতে পছন্দ করেন।
শুধু পানীয়ের তাপমাত্রাই নয়, পরিমাণও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় দেখা গেছে। তাপমাত্রার বিষয়টি হিসাবের মধ্যে রাখার পর দেখা যায়, দিনে ছয়টি বা তার বেশি গরম পানীয় পানকারীদের খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার ঝুঁকি ছয়টির কম পানীয় গ্রহণকারীদের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি।
গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি মহামারিবিদ কেরেন পাপিয়ের বলেন, এটি এ পর্যন্ত পরিচালিত সবচেয়ে বড় গবেষণা এবং খুব গরম ও গরম পানীয় এ ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন প্রমাণকে এটি আরো শক্তিশালী করেছে।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা বা আইএআরসি ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। তবে আগের বেশিরভাগ গবেষণা দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত হয়েছিল। নতুন গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের মানুষের প্রচলিত চা-কফি পানের অভ্যাসের ওপর করা হয়েছে।
গবেষকেরা আরো দেখেছেন, চা বা কফিতে দুধ যোগ করা হচ্ছে কি না, তা ক্যানসারের ঝুঁকিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি—যদি পানীয়টি গরমই থাকে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই পানীয়ের তাপমাত্রা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। প্রকৃত তাপমাত্রা কত ছিল, তা সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। ফলে ‘উষ্ণ’, ‘গরম’ বা ‘খুব গরম’—এই শ্রেণিগুলো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক ও শারীরবিজ্ঞানী মুয়-টেক তেহ বলেন, অংশগ্রহণকারীদের অনুভূত তাপমাত্রার ওপর তথ্য নির্ভর করায় গবেষণার ফলাফলকে শক্তিশালী সম্পর্ক হিসেবে দেখা উচিত, কারণ-প্রমাণ হিসেবে নয়।
গবেষণার প্রধান লেখক কেরেন পাপিয়ের বলেন, যারা গরম পানীয় পান করতে পছন্দ করেন এবং এ গবেষণার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য সহজ একটি পদক্ষেপ হলো পানীয়টি কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা। কিছু সময় রেখে দেওয়া, দুধ বা ঠান্ডা পানি যোগ করা কিংবা ছোট ছোট চুমুক দিয়ে পান করার মাধ্যমেও তাপমাত্রা কমানো যায়।
গবেষণায় উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব গরম তরল খাদ্যনালির ভেতরের কোষের ক্ষতি ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা গবেষণায় পাওয়া সম্পর্কের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে খাদ্যনালির ক্যানসার হওয়ার সামগ্রিক সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।গবেষকদের মতে, এই ধরনের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি এখনো ধূমপান। খাদ্যনালির ক্যানসারের প্রকোপ পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকায় তুলনামূলক বেশি। এসব অঞ্চলে অ্যালকোহল গ্রহণ ও ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণও সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
