ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহু কি গ্রেপ্তার হতে পারেন ?

প্রতিবেদন:

·

, ,

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

তবে বিরোধী শিবির আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করে যদি নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে দেয়, তবু তাঁকে ও ইসরায়েলকে ঘিরে যেসব আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ চলছে, তা তাঁর সরকারের পতন সত্ত্বেও টিকে থাকবে।

নেতানিয়াহু পদত্যাগ করলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল হবে না বা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা গণহত্যার মামলা থেমে যাবে না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পদত্যাগ করলে বা তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে নেতানিয়াহু সেই ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন, যা কয়েকটি দেশ তাঁকে গ্রেপ্তার না করার বাহানা হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে তিনি আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বিদেশি জাতীয় আদালতগুলোয় বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বেন।

গাজায় অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, হত্যা, নিপীড়নসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।

গত বছর গাজাগামী একটি ত্রাণ বহরে ইসরায়েলের বাধা দেওয়ার ঘটনার জেরে নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তুরস্কের আদালতেও নেতানিয়াহুর অনুপস্থিতিতে বিচার ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

এরপর কী ঘটতে পারে

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বৈধ থাকবে?

হ্যাঁ। পরোয়ানাটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি পদে বহাল থাকছেন কি না, তার ওপর এই অপরাধের বিচারকাজ নির্ভর করছে না।

তবে বিচারকাজ কেবল তখনই শুরু হতে পারে, যদি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হস্তান্তর করা হয়।

রোম সংবিধির ধারা ৫৮(৪) অনুসারে, আদালত অন্য কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকবে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাঝাত শামিম খান সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিলেন, পরোয়ানা প্রত্যাহারের জন্য আদালত কোনো পদক্ষেপ নেননি।

তবে ইসরায়েল এখনো আদালতের এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে, যার মূল ভিত্তি হলো তারা আদালতের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তি ‘রোম সংবিধি’–এর সদস্য নয়।

২০২৫ সালের এপ্রিলে আইসিসির আপিল চেম্বার প্রাক্‌–বিচার চেম্বারকে ইসরায়েলের এ চ্যালেঞ্জটি পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশ দেন। তবে বিচারকেরা বিচারপ্রক্রিয়ার সময় পরোয়ানা স্থগিত রাখতে রাজি হননি।

ইসরায়েলের দুটি আপিল এখনো বিচারাধীন।

নেতানিয়াহু কি তাঁর দায়মুক্তি হারাবেন

আইসিসি ও বিভিন্ন দেশের আদালতগুলোর ক্ষেত্রে দায়মুক্তির নিয়ম আলাদা।

আইসিসির ক্ষেত্রে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকা নেতানিয়াহুকে কোনো দায়মুক্তি দেওয়া হবে না।

রোম সংবিধির ধারা ২৭–এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি পদমর্যাদা বিচারে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। আদালতের অবস্থান হলো, পদের সঙ্গে থাকা দায়মুক্তি বা ‘ইমিউনিটি’ কোনো আসামিকে তাঁর বিচারিক এখতিয়ার থেকে রক্ষা করে না কিংবা সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ বাস্তবায়ন থেকে অব্যাহতি দেয় না।

যেসব দেশ আইসিসির সদস্য নয়, সেসব দেশের নেতাদের ক্ষেত্রেও আদালত এই নীতি প্রয়োগ করেছেন।

২০১৯ সালে আইসিসির আপিল চেম্বার রায় দিয়েছিলেন, জর্ডানের দায়িত্ব ছিল সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল–বশিরকে গ্রেপ্তার করা, যদিও সুদান আইসিসির সদস্য ছিল না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হওয়ায় মঙ্গোলিয়া তার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে বলে ২০২৪ সালেও বিচারকেরা পর্যবেক্ষণ দেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

তবু কিছু সদস্যরাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত দায়মুক্তির ওপর ভিত্তি করে আইসিসির সদস্য নয়, এমন রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতাসীন নেতাকে গ্রেপ্তার করতে তারা বাধ্য নয়।

মিডল ইস্ট আই আগেও ব্যাখ্যা দিয়ে উল্লেখ করেছিল, আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের জন্য দুই ধরনের দায়মুক্তি স্বীকার করে, সেটা হচ্ছে ব্যক্তিগত দায়মুক্তি। এটি একটি সীমিত গোষ্ঠীকে রক্ষা করে। অপরাধের ধরন যা–ই হোক না কেন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে বিদেশের কোনো আদালতে গ্রেপ্তার ও বিচার থেকে তাঁরা সুরক্ষা পান। এটি সাময়িক ও তাঁরা পদত্যাগ করলে এটি শেষ হয়ে যায়।

কার্যকর দায়মুক্তি, সরকারি ক্ষমতাবলে পরিচালিত কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং কর্মকর্তা পদ থেকে চলে গেলেও তা বহাল থাকে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের দায়মুক্তির ক্ষেত্রেও যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবে বহু আগেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নেতানিয়াহু পদত্যাগ করা মাত্রই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভোগ করা ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন। তাঁর কাছে তখন শুধু কার্যকর দায়মুক্তিই অবশিষ্ট থাকবে।

কোন কোন দেশ দায়মুক্তির দোহাই দিয়েছে

২০২৪ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স বলেছিল, আইসিসির বাইরের দেশগুলোর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে যেসব দায়মুক্তি প্রযোজ্য, তা নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও খাটবে এবং গ্রেপ্তারের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার সময় এটি বিবেচনা করতে হবে। তবে দায়মুক্তি–বিষয়ক গবেষক ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানিও দায়মুক্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, দায়মুক্তির বিষয়টিকে সম্মান জানাতে হবে।

হাঙ্গেরি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহুর সফরের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার না করার পক্ষে ধারা ৯৮–এর দায়মুক্তির যুক্তি উপস্থাপন করেছিল। পরবর্তী সময় আইসিসি রায় দেন, হাঙ্গেরি তার সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।

তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর পদ হারালেও নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তার নিশ্চিত হয়ে যাবে না। আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই এবং তারা পরোয়ানা কার্যকর করার জন্য সদস্যরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে।

ইসরায়েলের পরবর্তী কোনো সরকার আদালতের সঙ্গে সহযোগিতা করার এবং তাঁকে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।

বিদেশি আদালতে কি নেতানিয়াহুর বিচার হতে পারে

একবার ক্ষমতা থেকে সরে গেলে নেতানিয়াহু তাঁর সেই ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন, যা কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারপ্রধানকে বিদেশি জাতীয় কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তার ও বিচার থেকে সুরক্ষা দেয়।

বিশ্বের অনেক দেশ সর্বজনীন এখতিয়ারের অধীনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিধান রেখে থাকে। এটি তাদের আদালতকে দেশের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলেও বিদেশে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার সুযোগ দেয়।

উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক ২০২৫ সালে গাজাগামী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ অবরোধের ঘটনায় নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভিরসহ বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারালে এ ধরনের মামলার জন্য বড় এক বাধা দূর হবে। তবে নেতানিয়াহু তখনো কার্যকর দায়মুক্তির (যা সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে করা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত) সুযোগ পাবেন কি না, তা আদালতের প্রয়োগ করা আইনের ওপর নির্ভর করবে।

সাবেক নেতারা অতীতেও এমন বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। চিলির অগাস্তো পিনোশে ১৯৯৮ সালে স্পেনের এক পরোয়ানায় লন্ডনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরের বছর হাউস অব লর্ডস রায় দেয়, নির্দিষ্ট কিছু নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে পিনোশে দায়মুক্তি দাবি করতে পারেন না।

বাশার আল–আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানা বাতিল করে দেন। তবে আদালত জানিয়েছিলেন, তাঁর বিদায়ের পর নতুন পরোয়ানা জারি করা যেতে পারে। আদালত এ–ও উল্লেখ করেন, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের বিচারে কার্যকর দায়মুক্তি সাবেক নেতাদের কোনো সুরক্ষা দেয় না।

নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক সফর তাঁর গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। তবে কিছু দেশ তাঁর উপস্থিতি ছাড়াই তদন্ত করতে এবং পরোয়ানা জারি করতে পারে।

নেতানিয়াহুকে হেফাজতে নেওয়া বাস্তবিক এক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। কারণ, তিনি গ্রেপ্তারের ভয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে পারেন। এ ছাড়া ইসরায়েল রাষ্ট্রও তাঁকে হস্তান্তর করতে সম্মত না–ও হতে পারে।

আইসিজের গণহত্যা মামলার কী হবে

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা গাজায় গণহত্যার অভিযোগ এনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাটি করেছিল। সেই মামলা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন এই মামলায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সুতরাং প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নেতানিয়াহু বিদায় নেওয়ার পরও তাঁর বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো গণহত্যার অভিপ্রায়ের মূল প্রমাণ হিসেবেই বিচারে থেকে যাবে।

ইসরায়েল ২০২৬ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা অভিযোগের বিপরীতে তাদের পাল্টা যুক্তি দাখিল করেছে, যার মধ্যে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তিও রয়েছে।

আদালত দক্ষিণ আফ্রিকাকে উত্তর দেওয়ার জন্য ২০২৭ পর্যন্ত এবং ইসরায়েলকে জবাব দেওয়ার জন্য ২০২৯ সালের ২২ মে পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ওই মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে এখনো বহু বছর বাকি।

নেতানিয়াহুর দুর্নীতির মামলার কী হবে

প্রধানমন্ত্রী পদ হারালেও ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর দুর্নীতির বিচার শেষ হয়ে যাবে না।

২০২০ সাল থেকে তিনটি ভিন্ন মামলায় ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলছে। তবে তিনি কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করে আসছেন।

নেতানিয়াহু ২০২৫ সালের নভেম্বরে নিজের দোষ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এপ্রিলে হারজগের কার্যালয় জানায়, ক্ষমার আবেদনে সাড়া দেওয়ার আগে দুই পক্ষকে আদালতের বাইরে কোনো সমঝোতায় আসার চেষ্টা করা উচিত।

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, নেতানিয়াহু দোষ স্বীকার না করা এবং রাজনীতি থেকে অবসর না নেওয়া পর্যন্ত হারজগ তাঁকে ক্ষমা করতে পারেন না।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ