ওয়াইল মানে দুর্ভোগ বা ধ্বংস। কেউ কেউ বলেন, ওয়াইল জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন শ্রেণির পাপীদের জন্য এই ‘ধ্বংস’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নিম্নে তাদের বিষয়ে বর্ণনা করা হলো :
চরম মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক চরম মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীর জন্য।’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৭)
আজ হোক, কাল হোক, মিথ্যাবাদীর পতন অনিবার্য।
কাফিরদের জন্য ধ্বংস : পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘(তিনি) আল্লাহ, যাঁর জন্য আছে আসমান ও জমিনের সব কিছু।আর কাফিরদের জন্য আছে কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ২)
আয়াতের মূল কথা হলো, যারা কোরআনের নিয়ামত অস্বীকার করে এবং অন্ধকারেই থাকতে পছন্দ করে, তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস ও বিপর্যয়।
(তাফসির ফাতহুল কাদির)
সামনে ও পেছনে নিন্দাকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে।’ (সুরা : আল-হুমাজাহ, আয়াত : ১)
আয়াতে ‘হুমাজাহ’ ও ‘লুমাজাহ’ দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।বেশির ভাগ তাফসিরকারের মতে, হুমাজাহ এর অর্থ গিবত অর্থাৎ পশ্চাতে পরনিন্দা করা এবং লুমাজাহ অর্থ সামনাসামনি দোষারোপ করা ও মন্দ বলা। এ দুটি কাজই জঘন্য গুনাহ। (আদওয়াউল বায়ান)
সম্পদ জমাকারী ও বারবার গণনাকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘(দুর্ভোগ তারও) যে ধন-সম্পদ জমা করে আর বারবার গণনা করে।’ (সুরা : হুমাজাহ, আয়াত : ২)
আয়াতের অর্থ হলো যে সম্পদ জমা করে ও গুনে গুনে রাখে; গুছিয়ে গুছিয়ে রাখে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তার জন্য ধ্বংস। সাধারণভাবে মাল সঞ্চয় করে রাখা কোনো নিন্দনীয় কাজ নয়।নিন্দনীয় তখনই হয় যখন তার জাকাত দেওয়া না হয়, দান-খয়রাত এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করা হয়।
সালাতে উদাসীন ও অমনোযোগী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব, সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন।’
(সুরা : মাউন, আয়াত : ৪-৫)
নামাজে অমনোযোগী বা উদাসীন বলে ওই সব লোককে বোঝানো হয়েছে, যারা মোটেই নামাজ পড়ে না অথবা প্রথম দিকে পড়ত, অতঃপর তাদের মধ্যে অলসতা এসে পড়েছে অথবা নামাজ যথাসময়ে আদায় করে না; বরং যখন মন চায় তখন পড়ে নেয় অথবা দেরি করে আদায় করতে অভ্যাসী হয় অথবা বিনয়-নম্রতার (ও একাগ্রতার) সঙ্গে নামাজ পড়ে না ইত্যাদি। এসব ত্রুটি ওই অর্থের শামিল। অতএব, নামাজের ব্যাপারে এসব আচরণ থেকে বাঁচা প্রয়োজন।
লোক-দেখানো আমলকারী ও ক্ষুদ্র গৃহসামগ্রী দানে অনীহা প্রকাশকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘(ধ্বংস তাদের জন্যও) যারা লোক-দেখানোর জন্য তা (সালাদ আদায়) করে এবং প্রয়োজনীয় গৃহসামগ্রী ছোটখাটো সাহায্য দানে বিরত থাকে।’ (সুরা : আল-মাউন, আয়াত : ৬-৭)
মাউন ছোট ও সামান্য পরিমাণ জিনিসকে বলা হয়। এমন ধরনের জিনিস, যা লোকদের কোনো কাজে লাগে বা এর থেকে তারা ফায়দা অর্জন করতে পারে।
সাধারণত প্রতিবেশীরা একজন আরেকজনের কাছে সাধারণ মানবতারূপে গণ্য হয়; যথা—কুড়াল, কোদাল অথবা রান্নাবান্নার পাত্র—এসবই মাউনের অন্তর্ভুক্ত। প্রয়োজনে এসব জিনিস প্রতিবেশীর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া দোষণীয় মনে করা হয় না। কেউ এগুলো দিতে অস্বীকৃত হলে তাকে বড় কৃপণ ও নীচ মনে করা হয়। কারো কারো মতে, আলোচ্য আয়াতে মাউন বলে জাকাত বোঝানো হয়েছে। জাকাতকে মাউন বলার কারণ সম্ভবত এই যে জাকাত পরিমাণে আসল অর্থের তুলনায় খুবই কম। অর্থাৎ ৪০ ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে।
প্রতিদান দিবসকে অস্বীকারকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন ধ্বংস রয়েছে অস্বীকারকারীদের জন্য, যারা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করে।’
(সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১০-১১)
যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় : পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর (পথ), আসমানসমূহ ও জমিনের সবকিছুই যার মালিকানায় এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাবের দুর্ভোগ। যারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাত থেকে অধিক পছন্দ করে, আর আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং তাতে বক্রতার সন্ধান করে; তারা ঘোরতর ভ্রষ্টতায় আছে।’ (সুরা : ইব্রাহিম, আয়াত : ২-৩)
মতভেদ তৈরি করা ও সত্য গোপন করা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরপর তাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন দল মতভেদ করল। কাজেই মহাদিবস প্রত্যক্ষকালে কাফিরদের ধ্বংস অনিবার্য।’ (সুরা : মারিয়াম, আয়াত : ৩৭)
আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রটনাকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘বরং আমি মিথ্যার ওপর সত্য নিক্ষেপ করি; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং নিমিষেই তা বিলুপ্ত হয়। আর তোমাদের জন্য আছে দুর্ভোগ, তোমরা যা বলছ (আল্লাহ সম্পর্কে) তার জন্য।’
(সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১৮)
সৃষ্টিজগেক অনর্থক মনে করা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আসমান, জমিন এবং এই দুইয়ের মধ্যে যা আছে তা আমি অনর্থক সৃষ্টি করিনি। এটা কাফিরদের ধারণা, সুতরাং কাফিরদের জন্য আছে জাহান্নামের দুর্ভোগ।’
(সুরা : সোয়াদ/সদ, আয়াত : ২৭)
আল্লাহর জিকির থেকে যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে : পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষ খুলে দিয়েছেন, ফলে সে তার রবের পক্ষ থেকে নুরের ওপর আছে (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়?); অতএব, ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ২২)
নিজ হাতে কিতাব লিখে আল্লাহর বাণী বলে দাবি করা : মহান আল্লাহ বলেন, “সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে। তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে তা তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করতে পারে। সুতরাং তাদের হাত যা লিখেছে তার পরিণামে তাদের জন্য ধ্বংস, আর তারা যা উপার্জন করেছে তার কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস।” (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৭৯)
আল্লাহর সঙ্গে শিরককারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, ‘আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে তোমাদের ইলাহ কেবলমাত্র এক ইলাহ। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৬)
পরিমাপে ও ওজনে কম দানকারী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পরিমাপে কম দেয়।’
(সুরা : আল-মুতাফফিফিন, আয়াত : ১)
ইসলামে মাপ ও ওজনে কম দেওয়া হারাম করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাপ করার জন্য কড়া তাগিদ করা হয়েছে। তবে আয়াতে উল্লিখিত নিন্দা শুধু মাপ ও ওজনের মধ্যেই সীমিত থাকবে না; বরং মাপ ও ওজনের মাধ্যমে হোক, গণনার মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোনো পন্থায় প্রাপককে তার প্রাপ্য কম দিলে তা এই নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয়ে হারাম হবে।
এ এম
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
