দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের কেউ কেউ ইসলামের একত্ববাদ, নৈতিক শিক্ষা ও জীবনব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। মুসলিমদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টও এ আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
কোরিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাতে ইকনা জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিশ ও ত্রিশের কোঠার তরুণ। তবে এ সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
প্রতিবেদনে ‘ইউসুফ’ ছদ্মনামে পরিচিত ত্রিশোর্ধ্ব এক কোরীয় মুসলিমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ২০১৪ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার মাধ্যমে ইসলামের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনা বাড়লে তিনি ধর্মটি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
কোরীয় নওমুসলিমদের অনেকে ইসলামের একত্ববাদের শিক্ষা, সুস্পষ্ট ধর্মীয় মূলনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনে নৈতিক নির্দেশনার বিষয়গুলোকে আকর্ষণীয় বলে মনে করেন। তাঁদের কাছে এসব শিক্ষা জীবন ও মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। সিউলের কেন্দ্রীয় মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ইতাওয়ন এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদে ইসলাম সম্পর্কে জানতে নিয়মিত আসেন আগ্রহী কোরীয়রা। সেখানে তাঁরা ইসলামের বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর শাহাদাতাইন পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
কোরীয় মুসলিম নারী ‘আরিয়ম’ জানান, ইসলামে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মানের শিক্ষা তাঁর কাছে বিশেষভাবে অর্থবহ। কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গেও এই মূল্যবোধের মিল থাকায় পরিবারের কাছে নিজের ধর্মীয় সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা তাঁর জন্য সহজ হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু তরুণ প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও প্রত্যাশার বাইরে ভিন্ন জীবনদর্শন খুঁজছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানতে গিয়ে তাঁদের কেউ কেউ নৈতিকতা, আত্মিক প্রশান্তি ও জীবনযাপনের অর্থ নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পেয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে পরিচিতি
ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে ভূমিকা রেখেছে। মুসলিমদের আচরণ, ধর্মীয় অনুশীলন ও দৈনন্দিন জীবন কাছ থেকে দেখে কেউ কেউ ধর্মটি সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী হয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোরীয় মুসলিমদের কেউ কেউ নিজেদের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, দৈনন্দিন জীবন ও মুসলিম সংস্কৃতি নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে কোরীয় ও আন্তর্জাতিক দর্শকেরা মুসলিমদের জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
কোরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব আয়ানা জিহে মুন কিশোর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ইরাক যুদ্ধের সময় ইসলাম সম্পর্কে জানার পর ধর্মটি নিয়ে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ইন্দোনেশিয়ায় বসবাসকারী কোরীয় মুসলিম ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান।
ইউটিউবার দাউদ কিমও তাঁর ভিডিওতে ইসলাম গ্রহণের অভিজ্ঞতা ও মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতো পরিচিত ব্যক্তিদের কনটেন্টের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে আগে তেমন ধারণা না থাকা মানুষেরাও ধর্মটি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
কোরীয় মুসলিম নারীদের কেউ কেউ হিজাবের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কোরীয় পোশাক হানবকের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন ধরনের ফ্যাশন তুলে ধরছেন। এর মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ ও কোরীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক একসঙ্গে উপস্থাপিত হচ্ছে।
মুসলিম সমাজে খুঁজছেন আপনজনের অনুভূতি
ইসলাম গ্রহণের পর মুসলিম সমাজে নতুন সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আপনজনের অনুভূতি খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কোরীয় নওমুসলিম। পরিচিতজনের কাছ থেকে কেউ কেউ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়লেও মুসলিমদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক তাঁদের মানসিক সমর্থন জুগিয়েছে।
আরিয়ম জানান, সিউলের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথমবার যাওয়ার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন নিজের ঘরে ফিরে এসেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মুসলিম সমাজের আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধও নতুন মুসলিমদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কোরীয় উপদ্বীপে ইসলামের ঐতিহাসিক পরিচিতি
দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম সম্পর্কে পরিচিতি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বণিক, অভিবাসী ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোরীয় যুদ্ধের সময় তুর্কি মুসলিম সেনাদের উপস্থিতি দেশটিতে ইসলাম পরিচিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে বিদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানীয়দের ইসলাম গ্রহণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কিংবা বার্ষিক হিসাবের নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ পরিসংখ্যান সীমিত। তবে নওমুসলিমদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের সক্রিয় উপস্থিতি ইসলাম সম্পর্কে জানার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
ইসলামের একত্ববাদ, নৈতিক জীবনব্যবস্থা, আত্মিক প্রশান্তির সন্ধান এবং মুসলিম সমাজের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক—বিভিন্ন কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু মানুষ ধর্মটি সম্পর্কে আগ্রহী হচ্ছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেশটিতে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
