সড়ক দূঘটনা

  • শখের মোটরসাইকেলেই শেষ হলো জুবায়েরের জীবন

    শখের মোটরসাইকেলেই শেষ হলো জুবায়েরের জীবন

    চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি

    ‘মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার পর থেকেই ভয় হতো। বাইরে থাকলে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলেই বুক কেঁপে উঠত ,এই বুঝি কোনো দুঃসংবাদ এলো।’ ছেলের মরদেহের পাশে বসে কথাগুলো বলছিলেন জুবায়ের হোসেনের বাবা আলীম দফাদার। কিছুক্ষণ পরপর কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

    রোববার সকালে যশোরের চৌগাছায় পিকআপের ধাক্কায় নিহত হয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন (১৫)। তার সঙ্গে মোটরসাইকেলে থাকা আরও দুই সহপাঠী আহত হয়েছে। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ফাসতলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

    জুবায়ের উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের আলীম দফাদারের ছেলে। আহত দুই শিক্ষার্থী হলো একই গ্রামের লিখন (১৫) ও ফাহিম (১৫)। তারা তিনজনই চাঁদপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

    স্বজনেরা জানান, সকালে জুবায়েরের পালসার মোটরসাইকেলে করে তিন বন্ধু প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল। ফাসতলা এলাকায় পৌঁছালে মহেশপুরের দিক থেকে আসা একটি পিকআপ মোটরসাইকেলটিকে সামনে থেকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনজনই সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে পিকআপটি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

    স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জুবায়েরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত লিখন ও ফাহিমকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তারা আশঙ্কামুক্ত।

    হাসপাতালে ছেলের মরদেহের পাশে বসে আলীম দফাদার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে সিঙ্গাপুরে থাকে। জুবায়ের নবম শ্রেণিতে পড়ত। অনেক দিন ধরেই মোটরসাইকেলের জন্য বায়না করছিল। আমি কিনে দিতে চাইনি। পরে ওর ভাইও বলল, যেহেতু বায়না করছে, কিনে দিতে। সাত-আট মাস আগে পালসার মোটরসাইকেলটি কিনে দিয়েছিলাম।’

    তিনি বলেন, ‘যেদিন মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছি, সেদিন থেকেই ও বাইরে থাকলে ভয় হতো। অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলেই মনে হতো, এই বুঝি কোনো দুঃসংবাদ এলো। আজ সেই ভয়টাই সত্যি হলো।’

    এ কথা বলতে বলতে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি।

    ছেলের মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন জুবায়েরের মা। আহাজারি করে তিনি বলছিলেন, ‘ও বাবা, তুই কেন কথা শুনলি না? মোটরসাইকেল নিতে তোকে নিষেধ করেছিলাম। তোর বাবাও নিষেধ করেছিল। তুই কেন শুনলি না?’

    জুবায়েরের কয়েকজন বন্ধু জানান, মোটরসাইকেল চালানোর প্রতি তার বেশ আগ্রহ ছিল। তাদের দাবি, জুবায়ের প্রায়ই ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে মোটরসাইকেল চালাত। তবে রোববারের দুর্ঘটনার সময় মোটরসাইকেলটির গতি কত ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

    চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে জুবায়েরের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত পিকআপটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

  • সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ, দিনে গড়ে ১৪ মৃত্যু

    সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ, দিনে গড়ে ১৪ মৃত্যু

    দেশে গত সেপ্টেম্বর মাসে সড়কে ৪৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে । এসব দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে নারী ৭৩, শিশু ৬১। রোববার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

    প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫৪ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন, যা মোট নিহতের ৩২.৮৬ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৪.৮৪ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫.৫ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, অর্থাৎ ১২.৫২ শতাংশ।

    এই সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছেন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

    যানবাহনভিত্তিক নিহতের হিসাবে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৯ জন, বাসের যাত্রী ২৬ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ট্রলি আরোহী ১৯ জন এবং মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জীপের আরোহী ২১ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া থ্রি-হুইলার—অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৮৮ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র ও টমটমের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ৬ জন নিহত হয়েছেন।

    দুর্ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। সেপ্টেম্বর মাসে ১৭৮টি দুর্ঘটনা আঞ্চলিক সড়কে, ১৪৫টি জাতীয় মহাসড়কে, ৬৩টি শহরের সড়কে এবং ৫৬টি গ্রামীণ সড়কে সংঘটিত হয়েছে। শতাংশের হিসাবে আঞ্চলিক সড়কে ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ, জাতীয় মহাসড়কে ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ, শহরের সড়কে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

    দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ। এছাড়া ৯৮টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১০৯টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা, ৬১টি যানবাহনের পেছনে আঘাত এবং ৬টি দুর্ঘটনা অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

    সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার, ১১৩টি বাস, ৯৩টি ট্রাক, ২৯টি কাভার্ডভ্যান, ১৭টি পিকআপ, ১২টি মাইক্রোবাস, ১৫টি প্রাইভেটকার, ৮টি অ্যাম্বুলেন্স, ৫টি জীপ এবং ৪৬টি অজ্ঞাত যানবাহন রয়েছে।

    সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে সকালে। এ সময়ে ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকালে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

    বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রাণহানি, খুলনা বিভাগে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রাণহানি এবং রাজশাহী বিভাগে ১২ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।

    অন্যদিকে বরিশালে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রাণহানি, সিলেটে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রাণহানি, রংপুরে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রাণহানি এবং ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন।

    রাজধানীতেও দুর্ঘটনার চিত্র উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

    নিহতদের পেশাগত পরিচয়েও উঠে এসেছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাণহানির চিত্র। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের ২৪ জন নেতাকর্মী, স্থানীয় পর্যায়ের ২৫ জন ব্যবসায়ী, ১৮ জন এনজিও কর্মী, ১৪ জন দিনমজুর এবং ১৩ জন শিক্ষক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এছাড়া ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা কর্মচারী ১১ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, প্রকৌশলী ৪ জন, মোটর মেকানিক ৪ জন, সাংবাদিক ৩ জন, মসজিদের ইমাম/খাদেম ৩ জন, পুলিশ সদস্য ২ জন ও চিকিৎসক ২ জন নিহত হয়েছেন। সেনা সদস্য, কাস্টমস কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী একজন করে এবং একজন বিদেশি নাগরিকও নিহত হয়েছেন।

    শুধু সড়কেই নয়, সেপ্টেম্বর মাসে নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছেন।

    রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। তাই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

    সংস্থাটি আরও বলেছে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

    রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল এবং তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো। পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।