সুন্দরবনে

  • সুন্দরবনে কমছে ছয় প্রজাতির মাছের মজুদ

    সুন্দরবনে কমছে ছয় প্রজাতির মাছের মজুদ

    অবৈধভাবে মাছ আহরণ, পোনা নিধন ও পরিবেশগত প্রতিকূলতায় সুন্দরবনে অন্তত ছয় প্রজাতির মাছের মজুদ কমছে। বিপরীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধিসহ পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবে নয় প্রজাতির মাছের মজুদ বাড়তির দিকে। বাকি প্রজাতিগুলোর মজুদ রয়েছে সহনীয় বা স্থিতিশীল পর্যায়ে। প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাকুয়েটিক রিসোর্সেস অব দ্য সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

    গবেষণায় দেখা গেছে, অলুয়া বা আমাদি, পারশে, ভেটকি বা কোরাল, পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়ির মজুদ বাড়তির দিকে। অন্যদিকে পায়রা বা চিত্রা বা বিষতারা, নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও শীলা কাঁকড়ার মজুদ কমছে। মাছের মজুদের এই পরিবর্তনের পেছনে অবৈধ আহরণ, ছোট পোনা ধরা এবং পরিবেশগত চাপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

    বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে আট গবেষক এই সমীক্ষা পরিচালনা করেন। বন অধিদপ্তরের ‘প্রটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় আরণ্যক ফাউন্ডেশন ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) গবেষণাটি বাস্তবায়ন করে।

    গবেষণা দলের প্রধান ড. এম এনামুল হক বলেন, ‘আমাদের মূল কাজ ছিল মাছের বর্তমান অবস্থা, মজুদের পরিমাণ, হুমকি ও ভবিষ্যতের ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা। দেখা গেছে, আগে সুন্দরবনে বড় প্রজাতির মাছের, যেমন ভেটকির প্রাচুর্য বেশি থাকলেও এখন ছোট আকারের প্রজাতিগুলোর প্রাচুর্য কিছুটা বেড়েছে।’

    তিনি বলেন, প্রায় ১৫টি মাছ ও চিংড়ির প্রজাতির মজুদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টির মজুদ কমতির দিকে। যেসব প্রজাতির মজুদ কমছে, সেগুলো রক্ষায় জালের ফাঁস ও মাছ আহরণের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।

    গবেষণায় সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভেটকি মাছের অতিরিক্ত আহরণ, খুলনা ও শরণখোলা এলাকায় পাঙ্গাসের মজুদের ওপর চাপ এবং শরণখোলায় গ্যাগড়া টেংরা অতিরিক্ত আহরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব প্রজাতির আহরণ নিয়ন্ত্রণে কোটা নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা এবং পোনা সংরক্ষণের সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে শীলা কাঁকড়া, গলদা ও বাগদা চিংড়ির আহরণেও কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

    বিষ দিয়ে মাছ ধরা বড় হুমকি
    বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের জলজসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ ধরার পাশাপাশি অন্যান্য মাছ, পোনা ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীও মারা যায়। পোনা সংগ্রহের সময় কাঙ্ক্ষিত প্রজাতি রেখে অন্য জলজ প্রাণী ফেলে দেওয়ার প্রবণতাও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে।
    আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ও চলমান ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন প্রকল্পের টিম লিডার ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার জন্য মাছ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অবৈধ শিকার, বিষ প্রয়োগ এবং ছোট পোনা ধরা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি প্রজননের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত ও মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

    নতুন সাত প্রজাতির সন্ধান
    গবেষণায় সুন্দরবনে আগে নথিভুক্ত হয়নি এমন সাত প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি মাছ ও দুটি চিংড়ির প্রজাতি রয়েছে। নতুন শনাক্ত মাছের মধ্যে এক ঠুঁইটা, কুলি বেলে, সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে, ফোঁটা বাট ও বড় আইশ পারশে উল্লেখযোগ্য। নতুন দুটি চিংড়ি হলো মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি।

    গবেষণা দলের প্রধান এনামুল হক জানান, দুই বছরের সমীক্ষায় প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। পূর্ববর্তী গবেষণার তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে সুন্দরবনে বর্তমানে প্রায় ৩৮২ প্রজাতির মাছের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণায় প্রথমবারের মতো ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতিতে সাতটি প্রজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

    গবেষণা দলের প্রধান এনামুল হক বলেন, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মাছের অবস্থা সন্তোষজনক হলেও মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের চাপ রয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার।