সাহিত্য

  • একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী মারা গেছেন

    একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী মারা গেছেন

    একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের সার্জিক্যাল আইসিউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

    এর আগে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি সমস্যাসহ মাল্টি অর্গান ফেইলিয়র নিয়ে ২৩ এপ্রিল থেকে ২৬ মে পর্যন্ত একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাসায় ফিরে প্রায় দুই সপ্তাহ কিছুটা সুস্থ ছিলেন। ফের সমস্যা বাড়তে থাকায় ৪ জুন উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে ১৫ জুন পর্যন্ত রাখা হয়।

    বাড়িতে নিয়ে আসার একদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পরায় ১৬ জুন ফের উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ৮৬ বছর বয়সী আল মুজাহিদী দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যাসহ হৃদরোগে ভুগছিলেন। এক বছর আগে চিকুনগুনিয়া হওয়ায় তখন থেকেই তিনি একেবারে শয্যাসায়ী। আল মুজাহিদী একসময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

    সাহিত্যের সকল শাখায় বিচরণকারী এই গুণী ব্যক্তিত্ব ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কবিতা, উপন্যাস, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্যে অসংখ্য কালজয়ী কাজ উপহার দিয়েছেন।

    হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘যুদ্ধ নাস্তি’, ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা’ প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। ‘প্রথম প্রেম’, ‘চাঁদ ও চিরকুট’, ‘প্রপঞ্চের পাখি’ – উপন্যাস ও গল্প ।

    সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ ছাড়াও জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

  • আজ মীর নিসার আলী তিতুমীরের মৃত্যুবার্ষিকী

    আজ মীর নিসার আলী তিতুমীরের মৃত্যুবার্ষিকী

    বিপ্লবী ও বিদ্রোহী মীর নাসির আলী বেশি পরিচিত শহীদ তিতুমীর হিসেবে। তিনি শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেননি, তিনি বাংলার জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তার বাঁশের কেল্লা থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মীর নিসার আলী তিতুমীরের নাম উজ্জল হয়ে আছে। আজ এই বিপ্লবীর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি সর্বপ্রথম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মীর নিসার আলী তিতুমীর ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা জেলার বারাসত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মা আবিদা রোকেয়া খাতুন।গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের পর তিনি স্থানীয় একটি মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। কোরান ও হাদিস বিষয়ে অল্প বয়সেই তিনি পাণ্ডিত্য লাভ করেন।পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কায় অবস্থানকালে তিতুমীর মুক্তি সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফিরে তিনি সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন।

    তিতুমীর জীবন শুরু করেছিলেন একজন সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কারক হিসাবে। তখন মুসলমান সমাজে যেসব বিদআত (এমন রীতি যা ইসলামসম্মত নয়) এবং শিরক্ (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করা বা তার উপাসনা করা) ঢুকে গিয়েছিলো, সেগুলোকে দূর করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি তার কাজ শুরু করেছিলেন।

    কিন্তু এই ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট পরে একটা অর্থনৈতিক এবং ব্রিটিশ বিরোধী প্রেক্ষাপটে পরিণত হয়েছিলো।

    তিতুমীর হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে উৎসাহিত করেন। ২৪ পরগণা ও নদীয়ার অনেক কৃষক তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    কৃষকদের নিয়ে তিতুমীরের আন্দোলন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। তিতুমীরের আন্দোলন, সংগ্রাম, কর্মকাণ্ড এবং জীবনাদর্শ সব কিছুকেই আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে ঔপনিবেশিক পটভূমিতে।

    এই বাংলায় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশী যুদ্ধে জয়ী হবার সুবাদে প্রথম রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং সেখান থেকেই ক্রমাগত সারা উপমহাদেশে তাদের রাজ্যসীমা সম্প্রসারিত হয়। আবার এই বাংলা থেকেই ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিরোধ আন্দোলন। একাধিক এবং অসংখ্য প্রতিরোধ আন্দোলন হয়েছে বাংলায় ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে।

    ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলোর পটভূমিতে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে তিতুমীরের সংগ্রাম।

    প্রজাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার তিতুমীর করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে ও সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে বারাসাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কোম্পানির বিরুদ্ধে এটাই ছিলো তার প্রথম বিদ্রোহ।

    তিনি ২৪ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহ ‘বারাসাতের বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহে ৮৩ হাজার কৃষক সেনা তিতুমীরের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন।

    তার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিলো উপনিবেশ বিরোধিতায়। এবং এই উপনিবেশ বিরোধিতা করতে গিয়ে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজের শক্তি পরীক্ষা করতে গিয়ে, তিনি কখনও ভাবেননি যে তিনি অত্যন্ত অসচ্ছল, ক্ষুদ্র একটি শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং তার বিপরীতে আছে বিরাট, বিশাল, শক্তিধর ইংরেজ রাজশক্তি। বারাসাত বিদ্রোহের পর তিতুমীর বুঝতে পারেন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য।

    ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বারাসাতের কাছে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে সেখানে অস্ত্র জমা করেন। বাঁশ এবং কাদা দিয়ে তিনি ও তার অনুসারীরা এই কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন।

    তার আন্দোলনের একটি বড় প্রতীকী তাৎপর্য ছিলো অন্যায়, এবং শাসকবর্গের অসঙ্গত শোষণের বিরুদ্ধে একটি ন্যায়সঙ্গত অবস্থান নিয়ে দাঁড়ানো এবং প্রতিবাদে জ্বলে ওঠা।

    তিতুমীরের আন্দোলনের দ্বিমাত্রিক একটা তাৎপর্য রয়েছে। তিনি শুধু উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন একথা বললে তার অবদানকে কিছুটা সীমিত করা হয়, খণ্ডিত করা হয়। সমাজে অন্যায়, অবিচার, শোষণের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ, আন্দোলন ও সংগঠন- সেসব ব্যাপারে তার যে অবদান ছিলো, ঐটিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।

    ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী ও বন্দুকধারী সৈন্যদের একটি বিশাল বাহিনী পাঠায় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তিতুমীরের সঙ্গে লড়াইয়ের লক্ষ্যে। নারিকেলবাড়িয়ায় ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে ভীষণ যুদ্ধ হয়।

    ব্রিটিশ সৈন্যরা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদের বাঁশের কেল্লা। তিতুমীর তার অনুসারীদের অভয় দিয়ে বলেন মৃত্যুকে ভয় পলে চলবে না। এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ দেশ উদ্ধার করবে। এই লড়াইয়ের পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।

    ইংরেজদের কামানের গোলাবর্ষণে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। তিতুমীর ও তার চল্লিশজন সঙ্গী যুদ্ধরত অবস্থায় সেই বাঁশের কেল্লাতেই প্রাণ হারান।

    তিতুমীরের এই আন্দোলন, দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগ সব স্বাধীনতাকামীদের মনে প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।