ট্যাগ সালাহউদ্দিন আহমেদ

  • মির্জা ফখরুলের চেয়ারে সালাহউদ্দিনকে বসিয়ে কী বার্তা দিল বিএনপি?

    মির্জা ফখরুলের চেয়ারে সালাহউদ্দিনকে বসিয়ে কী বার্তা দিল বিএনপি?

    রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদের আসন ছাড়ার পর তার জায়গায় বসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে নতুন আসনবিন্যাসে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনটি পেয়েছেন তিনি। এতদিন ওই আসনে বসতেন মির্জা ফখরুল।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, সংসদের প্রথম সারিতে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি শুধু বসার জায়গা নয়, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গুরুত্বের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে ফখরুলের আসনে সালাহউদ্দিন আহমদকে বসানোর বিষয়টি বিএনপির ভেতরে-বাইরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। যদিও এটি সংসদের নিয়মিত আসনবিন্যাসের অংশ, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে এর মধ্যে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি প্রতীকী বার্তাও দেখছেন।

    এখন সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদের উপনেতা করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

    তবে সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদের উপনেতা করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি। উপনেতা কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন আসনবিন্যাসকে সরাসরি উপনেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে তাকে বসানোকে ইঙ্গিতবহ মনে করছেন অনেকেই।

    এত দিন সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনে বসতেন বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার পরের চেয়ারে বসতেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর পরে ছিল সালাহউদ্দিনের সিট।

    মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। একই সঙ্গে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

    নতুন বিন্যাসে মির্জা ফখরুল ইসলামের আসনে উঠে এসেছেন সালাহউদ্দিন। তার পরের আসনে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর পরের আসনে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

    সালাহউদ্দিনের আগের আসনে এখন বসছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারির ১০টি আসনের নতুন বিন্যাসে পেছনের সারি থেকে সামনে এসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য আমানউল্লাহ আমান।

    সালাহউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে তার রাজনৈতিক ও সরকারি অবস্থানের কারণেও। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। তা ছাড়া দলের সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে তার নামও আলোচনায় রয়েছে। সরকার ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই নেতাকে সংসদীয় কার্যক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনার চিন্তা আছে কিনা, সে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। এটি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার এখতিয়ার।

    সংসদের উপনেতা পদটি সংসদ নেতার সহায়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। সংসদ নেতার অনুপস্থিতিতে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় উপনেতাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। অতীতেও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের এ পদে রাখার নজির রয়েছে।

    সালাউদ্দিনকে সংসদ নেতার পাশে বসানো এটি কি কেবল নতুন আসনবিন্যাস, নাকি সংসদে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি—সেটি স্পষ্ট হবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এলে।

    তবে বিএনপি অন্যান্য সব পদ পূরণ করলেও এখন উপনেতার পদটি শূন্য রেখেছে। এই পদ ঘিরে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে।

    এই প্রতিযোগিতার কারণে একাদশ সংসদে খালেদা জিয়াও সংসদ উপনেতার পদটি শূন্য রাখেন। আবার ২০০৮ সালের পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলীয় উপনেতার পদটিও শূন্য রেখেছিলেন। তখন তিন সিনিয়র নেতা উপনেতা হওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন। তারা হলেন—ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

  • গুমের আগে কোথায় কীভাবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ্যে

    গুমের আগে কোথায় কীভাবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ্যে

    বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্যতম। সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ তৎকালীন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিনকে ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।

    আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয়।

    ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে দিবসটি পালনের সূচনা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো-‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাও’ (প্রথমে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ)।

    ‘গুম প্রতিরোধ’ দিবস পালনের প্রেক্ষাপটে আজ সামনে এসেছে দেশের সবচেয়ে আলোচিত গুমের ঘটনাটি। অনেকেরই জানার আগ্রহ-ঠিক কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন জায়গা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করা হয়েছিল?

    ঢাকার উত্তরায় যার ফ্ল্যাট থেকে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুম হয়েছিলেন তিনি বাসসকে সেই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।

    দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ৩ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা নিয়ে সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগ রাজধানীর ১৬ জায়গায় অবস্থান কর্মসূচি এবং বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করার প্রস্তুতি নেয়।

    তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা যাতে ঢাকায় প্রবেশ করে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য রাজধানীর প্রবেশমুখে কড়াকড়ি আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সংস্থা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের রাখে কড়া নজরদারিতে। ৪ জানুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপির প্রায় সব সিনিয়র নেতাকে এক এক করে গ্রেপ্তার করে চলেছে সরকার।

    এরই মধ্যে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওই অবস্থায় যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    সেই দায়িত্ব পালনকালে সালাহউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায় এবং গুম করে রাখে। ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তার সন্ধান মেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে।

    গুম হওয়ার আগে তিনি কোথায় কীভাবে ছিলেন-সেই নির্মম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী সালাহউদ্দিন আহমদের একজন ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভেল্লাপাড়ার মিয়াবাড়ির কৃতী সন্তান সৈয়দ হাবিব হাসনাত সে সময়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

    সৈয়দ হাবিব হাসনাতের বর্ণনায়, ‘সালাহউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে আমার আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের এজেন্সি, গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাব-পুলিশ তাকেও গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি শুরু করে এবং সন্দেহজনক সব জায়গায় হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। এ অবস্থায় তিনি গুলশানে নানা কায়দায় বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান করে এবং স্থান বদল করে দলের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তার গুলশানে অবস্থানের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়ে যায়; যদিও তিনি ঠিক কোন বাড়ি বা কোন ফ্ল্যাটে আছেন, তা তখনও তারা নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই তাকে ধরে ফেলবে-এমনটাই ছিল পরিস্থিতি।’

    তিনি বলেন, ‘গুলশানকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পর সালাহউদ্দিন ভাই দলের পরামর্শে দ্রুত এলাকা বদলের সিদ্ধান্ত নেন। আমি তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি, গুলশানে তিনি যেখানে থাকেন, তার কিছুটা দূরেই ছিল আমার অফিস। দল ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে তাকে স্থান বদলের জন্য বিকল্প কয়েকটি জায়গার কথা বলা হলে, তিনি আমার উত্তরার ফ্ল্যাটেই যাওয়ার মনস্থির করেন। ফেব্রুয়ারি মাসের সম্ভবত শেষ দিন, দুপুরে লাঞ্চ করতে যাব-এমন সময় সালাহউদ্দিন ভাই ফোন করলেন। তিনি বললেন, দ্রুত গুলশান থেকে সরে পড়তে হবে এবং তিনি আমার উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠতে চান। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, কোনো সমস্যা নেই, আপনাকে আমিই নিয়ে যাব। সন্ধ্যার পরই আসব, প্রস্তুত থাকবেন।’

    ‘কথামতো বিকেল ৫টার দিকে আমি গাড়ি নিয়ে বের হলাম। গুলশানে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, তা আমরা খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানত না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী এবং দলের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতা শুধু বিষয়টি জানতেন। আমি ওই বাড়ির কিছুটা অদূরে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, পাশে একটি মিষ্টির দোকান আছে, তুমি গিয়ে মিষ্টি খাও। কারণ, ড্রাইভারকে তো কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। আমি নিজে ড্রাইভ করে গাড়ি নিয়ে বাড়িটির নিচে গেলাম এবং সালাহউদ্দিন ভাইকে ফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নেমে এলেন, তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল। তাদের দুজনকে পেছনের সিটে বসিয়ে আমি উত্তরার উদ্দেশে গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। উত্তরা যাওয়ার পথে এমন সব রুট বেছে নিলাম, যেদিকে কোনো পুলিশের চেকপোস্ট ছিল না। তাদের নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সন্ধ্যার কিছু পর উত্তরার বাড়িতে পৌঁছলাম। সেখানে তো দারোয়ানদের জানতে দেওয়া যাবে না। তাই সেখানে দায়িত্বে থাকা দারোয়ানকে ডেকে বললাম, আমি তো ওপরে যাচ্ছি, তুমি আমার জন্য দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এসো, আমি গেটেই দাঁড়াচ্ছি।’

    ‘দারোয়ান বাইরে পা রাখা মাত্রই আমি গাড়ির দরজা খুলে দিলাম-সালাহউদ্দিন ভাই এবং তাবিথ নেমে গেলেন। বললাম, দ্রুত অমুক তলার অত নম্বর ফ্ল্যাটে উঠে যান। সেখানে একজন বাবুর্চি ও সহকারীকে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, তাদের বলে দিলাম-‘মেহমান এখানে থাকবেন, সব ধরনের সেবাযত্ন তোমরা করবে।’ এরপর অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পন্ন করে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলাম। তারপর সেই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন ভাই দলের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকলেন। আন্দোলন চলছিল, সরকারও তাকে খুঁজছিল-এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।’

    হাবিব হাসনাত বলেন, ‘১০ মার্চ আমি উত্তরায় যাই। সন্ধ্যার পর উত্তরা এলাকার প্রতিদিনের দৃশ্যপট কেমন, তা আমার ভালোভাবেই পরিচিত। সেদিন উত্তরা এলাকায় ঢোকার পর থেকেই একধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলাম; কিছু সড়কের বাতি নেভানো, কোথাও কোথাও এক গুমোট পরিবেশ এবং আশপাশে কোনো মানুষের দেখা মিলছে না। আবাসিকের দোকানপাটগুলোও বন্ধ। এলাকার ভেতরে কয়েকটি খেলার মাঠ আছে, যেগুলোতে সন্ধ্যার পর থেকেই তরুণরা খেলাধুলা করে, কিন্তু আজ দেখলাম সেখানেও কেউ নেই! আমার মনে দারুণ এক খটকা লাগল। বাড়ির অদূরে যেতেই দেখা গেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো অবস্থান। আমি সাহস সঞ্চয় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। দারোয়ানটাকে খুব মনমরা দেখলাম, কিন্তু সে কিছু বলল না। ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়েই চমকে উঠলাম-দরজা ভাঙা! আমাকে দেখেই ভেতর থেকে হাউমাউ করে কেঁদে সামনে এল বাবুর্চি আর সহকারী। তারা দুজন কাঁদতে কাঁদতে বলল, মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে!’

    ‘আমি ঠিক কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না! দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি যদি ধরা পড়ি, আমাকেও গুম করা হবে-সেটা বুঝতে বাকি রইল না। আবার আমি যদি বাইরে না থাকি, তাহলে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের আসলে কী ঘটেছে, তা বলারও কেউ থাকবে না। এই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, দ্রুত দেশ ছাড়তে হবে। আমার ভিসা করা ছিল; ওপরের আরেকটি ফ্ল্যাটে আমার স্ত্রী থাকত, তাকে সে অবস্থাতেই সঙ্গে নিয়ে এক কাপড়ে এয়ারপোর্টে চলে গেলাম, আমার সহযোগীরা দ্রুত টিকিটের ব্যবস্থা করল। বিমান যখন দুবাই এয়ারপোর্টে, তখনই উত্তরা থানার ওসির ফোন পেলাম-তিনি আমাকে খুঁজছেন!’

    হাবিব হাসনাতের বর্ণনায়, ‘আমেরিকায় বাঙালি কম থাকে-এমন একটি এলাকায় গিয়ে উঠলাম। সেখান থেকে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ এবং ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হতো। এরই মধ্যে সরকারের তরফে সালাহউদ্দিন ভাইকে তুলে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হলো। ভাবী হাসিনা আহমদ নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সালাহউদ্দিন ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেয়নি, বরং তিনি ‘আত্মগোপনে গেছেন’-এমন অপপ্রচার চালিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে একদিন ম্যাডাম খালেদা জিয়া অন্য একজনকে দিয়ে ফোন করিয়ে আমাকে বললেন, আমি যেন আমেরিকা বা দুবাইয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করি। সংবাদ সম্মেলন করে বলি যে, সালাহউদ্দিন ভাইকে আমার উত্তরার বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে, তিনি আমার ফ্ল্যাটেই ছিলেন এবং সেখান থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। আমিও সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম; কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ফোন করে আমাকে বলা হলো-“চুপ! একদম চুপচাপ থাকবেন। যদি একটি কথাও বলেন, তাহলে চিরজীবন আর দেশেও আসতে পারবেন না।’ এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হলো! এই কারণে আর সংবাদ সম্মেলন করা হয়নি। এভাবেই আমেরিকার মাটিতে কেটেছে আমার অনেক দিন।’

    তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখতে গিয়ে আমি নিজেও সে সময়ে জীবন নিয়ে শঙ্কার মধ্যে ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, তারুণ্যের রক্তে ভেজা অভ্যুত্থানে আমরা সেই জালিমের শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন আমাদের সবার উচিত বিভেদ-বিভক্তি এড়িয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করা, দেশকে সমৃদ্ধশালী করে তোলা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে সবাইকে হাতে হাত মিলিয়ে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এই ঐক্য বিনষ্ট হলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব-কথাটি আমাদের সব সময়ই মনে রাখতে হবে।’

    ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা

    সালাহউদ্দিন আহমদকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে ৭ মার্চ তাঁর দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরদিন ৮ মার্চ সালাহউদ্দিনের খোঁজে গুলশানের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এবং ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় র‌্যাব (উল্লেখ্য, সেই অফিস ও ফ্ল্যাটের মালিক সৈয়দ হাবিব হাসনাত)। এরপর ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়। এর মাঝে একাধিকবার তাঁর গুলশানের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং বাসার গেটে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা পাহারা বসানো হয়েছিল।

    ১৮ মার্চ ঢাকার দুটি জাতীয় দৈনিকে (প্রথম আলো ও নিউ এজ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সালাহউদ্দিনকে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নিয়ে গেছে, এ বিষয়ে ওই এলাকায় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে। যে বাসা থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই এলাকার নিরাপত্তাকর্মী ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পত্রিকা দুটির কাছে এর বর্ণনা দিয়েছেন।’

    উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে ঢাকার কয়েকটি গণমাধ্যম সে সময় প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সালাহউদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই বাসার কাছেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পিকআপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওই পিকআপে আসা সদস্যরা সেখানে কর্তব্যরত ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিয়োগ করা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ১৩-বি নম্বর সড়কটির অবস্থান জানতেও চেয়েছিলেন। ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারীরা সালাহউদ্দিনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে।

    তবে ঘটনার শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে একধরনের উপহাস করে আসছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। সে বছর ১৪ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা তাকে (সালাহউদ্দিনকে) অ্যারেস্ট করার জন্য খুঁজছি। তিনি কোথায়, তার জবাব খালেদা জিয়ারই দিতে হবে। সালাহউদ্দিন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বিবৃতি দিচ্ছিলেন। কিন্তু সবাই জানে, তিনি ওখান থেকেই (গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়) বিবৃতি দিয়েছেন। আট বস্তা ময়লার সঙ্গে তাঁকেও কোথাও পাচার করে দেওয়া হয়েছে কি না, সেই জবাব খালেদা জিয়ারই দিতে হবে।’

    এরপর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও সালাহউদ্দিন কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন-এমন ইঙ্গিত করে বা সরাসরি উল্লেখ করে ঢালাও বক্তব্য দিতে থাকেন। ১৩ মে মেঘালয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমদের খোঁজ মেলার পরও সেই বক্তব্যের রেশ থামেনি।

    ওইদিনই (১৩ মে) রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা (প্রয়াত) সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সালাহউদ্দিন আহমদ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি গুম, অন্তর্ধান কিংবা নিখোঁজ নয়-এটি আত্মগোপন। আত্মগোপন আর গুম এক জিনিস নয়। এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে-এই আত্মগোপন দলীয় প্রধানের নির্দেশেই করা হয়েছে।’