চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধুরুং খালের চরে একসময় চাষ হতো মূলা, বেগুনসহ প্রচলিত নানা সবজি। সেই জমিতেই এবার ফলেছে মরুভূমির ফল সাম্মাম। ইউটিউবে ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রথমবারের মতো ৪০ শতক জমিতে সাম্মাম চাষ করেছেন কৃষক মো. এখলাস (৪২)। পরীক্ষামূলক এ চাষে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮০০ কেজি ফল বিক্রি করে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা আয় করেছেন তিনি। বাকি ফল বিক্রি করে মোট আয় ২ লাখ ৮ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন এ কৃষক।
ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর বাইন্যাচোলা ব্রিজসংলগ্ন ধুরুং খালের চরে এখলাসের সাম্মামখেত। নুরুল আলম সরদার বাড়ির বাসিন্দা তিনি। তার বাবার নাম মৃত আবুল কাশেম। আগে থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এখলাস কলা, বড়ইসহ বিভিন্ন ফল ও কৃষিপণ্য চাষ করতেন। একসময় গাছের ব্যবসাও করেছেন। তবে এবার নতুন কিছু করার পাশাপাশি লাভের আশায় প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে সাম্মাম চাষের উদ্যোগ নেন।
এখলাস জানান, ইউটিউবে সাম্মাম চাষের ভিডিও দেখে প্রথমে আগ্রহ তৈরি হয় তার। পরে অনলাইনে বীজ সংগ্রহ করে গত ২২ আগস্ট ৪০ শতক জমিতে মালচিং পেপার ব্যবহার করে ২ হাজার ৪০০টি চারা রোপণ করেন। প্রথমবারের এ চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। চারা রোপণের দেড় মাসের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। প্রায় প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে।
সাম্মামের বাইরের অংশ হালকা সবুজ এবং ভেতরের শাঁস হলুদ রঙের। ফলটি খেতে মিষ্টি, তবে বিশেষ কোনো সুগন্ধ নেই। এখলাস বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৬৫ টাকা দরে ফল বিক্রি করছেন। পাইকাররা সরাসরি খেত থেকে ফল সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। ফটিকছড়ি সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্রেতারা আসছেন।
এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ কেজি সাম্মাম বিক্রি করে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা পেয়েছেন এখলাস। খেতে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ কেজি ফল রয়েছে। সেগুলো বিক্রি হলে আরও প্রায় ১ লাখ টাকা আয় হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রথম মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টাকার ফল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন এ কৃষক।
সাম্মাম চাষ ও অন্যান্য কৃষিকাজে তাঁকে সহযোগিতা করছেন চারজন শ্রমিক। ফসল উৎপাদনে জৈব সার ও সালফার ব্যবহার করেছেন তিনি। পাশাপাশি পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেছেন।
ফটিকছড়িতে সাম্মাম চাষে এখলাস অবশ্য একমাত্র কৃষক নন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আরও পাঁচজন কৃষক এ ফলের চাষ করেছেন। তবে কাঞ্চননগর ইউনিয়নে ধুরুং খালের চরে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সাম্মাম চাষ করেছেন এখলাস। তাঁর খেতে ভালো ফলন হওয়ায় আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও এ ফল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
প্রথমবারের সাফল্যে আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে সাম্মাম চাষের পরিকল্পনা করছেন এখলাস। শীতকাল পার হলে নতুন করে চাষ শুরু করতে চান তিনি। তাঁর আশা, এবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী মৌসুমে আরও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হবে।
কৃষক মো. এখলাস বলেন, ইউটিউবের ভিডিও দেখে সাম্মাম চাষের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এবার পরীক্ষামূলকভাবে ৪০ শতক জমিতে চাষ করেছেন। এতে আর্থিক লাভের পাশাপাশি নতুন ফসল উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। প্রথমবারের সাফল্যে তিনি আশাবাদী। আগামীতে আরও বড় পরিসরে এ ফল চাষ করতে চান।
কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা শিবুরাম কৃষ্ণ দে বলেন, ইউটিউব দেখে এখলাস সাম্মাম চাষের পরিকল্পনা করেন। শুরু থেকেই তার উদ্যোগের খোঁজখবর রাখা হয়েছে। মাঝেমধ্যে খেতে গিয়ে ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
খেতে কাজ করা শ্রমিক রমজান আলী বলেন, সাম্মাম তাদের কাছে নতুন ধরনের ফল। এ ফসল চাষ করতে গিয়ে নতুন অনেক কাজ শিখতে হয়েছে। মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা কাজ করেছেন। খেতে ভালো ফলন হওয়ায় তারাও আনন্দিত।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, মরু অঞ্চলের ফল হিসেবে পরিচিত সাম্মাম ফটিকছড়িতে কয়েক বছর ধরে চাষ হচ্ছে। তবে এবার কৃষি উদ্যোক্তা এখলাসের উদ্যোগে কাঞ্চননগরের ধুরুং খালের চরে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ফলটির চাষ হয়েছে। এতে তিনি ভালো সাফল্য পেয়েছেন। কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা এবং সফল উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা কৃষি বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম। এখলাসের এ সাফল্য অন্য কৃষকদেরও প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন জাতের ফল ও কৃষিপণ্য উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলবে বলে আশা করছেন তারা।
