সবজি-মাছে স্বস্তি

  • সবজি-মাছে স্বস্তি, চাল-মুরগির চাপে মধ্যবিত্ত

    সবজি-মাছে স্বস্তি, চাল-মুরগির চাপে মধ্যবিত্ত

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাসের শেষ সপ্তাহে আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় শাকসবজির দাম কমেছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম ২০ থেকে ৪০ টাকা এবং মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা কমেছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।সবজি ও মাছের বাজারে স্বস্তি ফিরলেও চাল এবং ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে। ফলে একদিকে সবজি ও মাছ কিনতে কিছুটা কম টাকা খরচ করতে হলেও অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক খাদ্যব্যয় সামাল দিতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

    গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আনন্দ বাজার, জগত বাজার, মেড্ডা বাজার ও কাউতলী বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাজারে সবজি নিয়ে আসছেন। পাশাপাশি খুচরা ক্রেতাদেরও ভিড় দেখা গেছে। গত সপ্তাহের তুলনায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, কাঁচা মরিচ, করলা, ধনেপাতা, টমেটো ও লাউয়ের দাম কমেছে।

    অন্যদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৫ কেজির বস্তায় চালের দাম ৭০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাজারে আসা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।কমেছে সবজির দাম

    গত সপ্তাহে প্রতি পিস ফুলকপি ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁধাকপির দাম ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা হয়েছে। প্রতি কেজি পটল ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৯০ টাকা থেকে ৭০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ১০০ টাকা থেকে ৭০ টাকায় নেমেছে।

    এ ছাড়াও প্রতি কেজি করলা ৯০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা, ধনেপাতা ১০০ টাকা থেকে ৭০ টাকা এবং টমেটো ১২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা হয়েছে। গত সপ্তাহে প্রতিটি লাউ ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন আকারভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।কমেছে মাছ ও ডিমের দাম

    শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি নামতে শুরু করায় এবং মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রেতা কম আসায় মাছের দাম কমেছে। গত সপ্তাহে রুই ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এখন ৩২০ টাকা। কাতলা ৪০০ টাকা থেকে কমে ৩৫০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩২০ টাকা থেকে ২৯০ টাকা, কার্ফু ৩০০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা, পাঙাশ ২২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা কেজি হয়েছে।

    ডিমের দামও গত এক সপ্তাহে হালিপ্রতি ৪-৫ টাকা কমেছে। লাল ডিম ৫০ টাকা থেকে কমে ৪৬ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৪ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি কক ৮৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।

    দাম কমায় সবজি ও মাছ কিনতে আসা ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। তবে পরিবারের দৈনন্দিন বাজারের মোট খরচ চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম ও মাংসের মতো অন্যান্য পণ্যের দামের ওপরও নির্ভর করে।

    চাল ও মুরগিতে বাড়তি খরচ

    সবজির দাম কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও শুক্রবার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। অর্থা
    ৎ এক সপ্তাহে কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০ টাকা।

    ২৫ কেজির বস্তায় আটাশ চালের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১২৮০ টাকা, এখন ১৩৫০ টাকা। বিআর-২৯ চাল ১২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৩০ টাকা, নাজিরশাইল ১৭০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকা, কাটারিভোগ ১৯৫০ টাকা থেকে ২১৫০ টাকা এবং মিনিকেট ১৬০০ টাকা থেকে ১৭৫০ টাকা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মৌসুমী বোরো চালের। গতু সপ্তাহে এর দাম ছিল ২৩৫০ টাকা, এখন ২৮০০ টাকা।

    যেসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৮০০ টাকা ও খাসির মাংস ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, দেশি রসুন ৮০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০ টাকা, আদা ১৪০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৫০ টাকা ও মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেল পাঁচ লিটার ১ হাজার টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ২০৮ টাকা, ডায়মন্ড আলু ২০ টাকা ও দেশি আলু ৩৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

    নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ওপর চাপ

    নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্য কেনায় ব্যয় হয়। চাল, ডাল ও মাংসের মতো পণ্যের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। সবজির দাম কমায় কিছুটা সুবিধা হলেও চালের দাম বাড়ায় সামগ্রিক ব্যয় কমছে না। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

    বাজারে সবজি কিনতে আসা শিক্ষক আবদুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারের সবকিছুই নাগালের বাইরে। সবজির দাম আপাতত কম হলেও অন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।

    মাছ কিনতে আসা ক্রেতা নীহার রঞ্জন সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় মাছের দাম কিছুটা কম। তবে দাম বাড়ার সময় যে পরিমাণ বাড়ে, সে তুলনায় দাম কমে না। এ কারণে আমাদের মতো নিম্নবিত্তের সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যায়।

    মেড্ডা বাজারে সবজি কিনতে আসা রইস মিয়া বলেন, বর্তমানে বাজারের অবস্থা টালমাটাল। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার, এখন তৃপ্তি মিটিয়ে খাবার খাওয়ার দিন শেষ। সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে পারি না, মাছ কিনতে পারলে মাংস কিনতে পারি না।

    আনন্দ বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শিপলু ও ওয়াসিম মিয়া জানান, মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে ক্রেতা কম। এ ছাড়াও নদীতে পানি নেমে যাওয়ায় চাষের মাছের চাহিদা কম, তাই এখন মাছের দাম কম।

    মুরগির দাম বাড়ার বিষয়ে আনন্দ বাজারের আল্লাহর দান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাশেদ মিয়া বলেন, এখন শীত মৌসুম শুরু হওয়ায় মুরগিতে ভাইরাসের ক্ষতি বেশি হয়, যে কারণে দাম বাড়ছে।

    চালের দাম বাড়ার বিষয়ে আনন্দ বাজারের মেসার্স জালাল এন্টারপ্রাইজের প্রবাস উদ্দিন জানান, বর্তমান মৌসুমে পুরোনো চাল শেষ পর্যায়ে। পুরোনো চালের চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে।

    সবজির দাম কমার বিষয়ে সবজি বিক্রেতা মো. মাহবুব বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ক্রেতা কম, আর শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়ায় দাম কমছে।

    এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইফতেখারুল আলম রিজভীকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

    ক্রেতারা বলছেন, সবজি ও মাছের বাজারে সাময়িক স্বস্তি মিললেও চালের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নিত্যদিনের হিসাব এলোমেলো করে দিচ্ছে। এক খাতে সামান্য সাশ্রয় হলেও অন্য খাতের বাড়তি খরচে মাসের শেষে টানাটানি থেকেই যাচ্ছে। তাই সিন্ডিকেট রোধ, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ও জোরদার বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।

    কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম শাহীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শীতকালীন সবজি ও মাছের দাম কিছুটা কমলেও চাল ও মুরগির মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি চরম উদ্বেগের। বিশেষ করে নতুন চাল আসার ঠিক আগমুহূর্তে পুরোনো চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হচ্ছে। এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলছে।

    তিনি আরও বলেন, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান না চালিয়ে চালের মিল পর্যায়ে ও পাইকারি আড়তগুলোতে তদারকি বাড়ানো জরুরি। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নিয়মিত কঠোর মনিটরিং ও বাজার তদারকি অব্যাহত রাখার জোর দাবি জানাচ্ছি।