শিক্ষক আন্দোলন

  • শিক্ষকেরা দাবিতে অনড়, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারে লো পেন

    শিক্ষকেরা দাবিতে অনড়, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারে লো পেন

    ফ্রান্সের শিক্ষকেরা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর বলেছেন, সরকারের শিক্ষা খাতের ছাড় আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণ করবে না। নিরাপত্তা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মারিন লো পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরুর দুই দিন পর এই প্রতিক্রিয়া এসেছে। ৩১ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর আরও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

    ছবির ক্যাপশন: শিক্ষা আন্দোলনের একটি প্ল্যাকার্ডে বিদ্যালয়কে ভগ্নদশায় থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফাইল ছবি: FreCha, CC BY-SA 4.0, উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে।

    সংক্ষেপে

    • অরলেয়াঁয় ন্যাশনাল র‍্যালির সম্মেলনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন লো পেন। তিনি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ফেরানো, অপরাধী বিদেশিদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী ও মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেন। জর্দান বারদেলা আবার দলীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁকে লো পেনের পছন্দ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
    • জুলাইয়ে আপিল আদালত তাঁর অর্থ আত্মসাতের দণ্ড বহাল রাখলেও সরকারি পদে থাকার কার্যকর নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে ইতিমধ্যে ভোগ করা মেয়াদে আনে। কারাদণ্ডের মধ্যে এক বছর ইলেকট্রনিক নজরদারিতে কাটানোর বিধান রয়েছে। পরবর্তী আপিলের বিচার চলাকালে এর কার্যকর প্রয়োগ স্থগিত থাকতে পারে।
    • সরকারের সোমবারের প্যাকেজে কিছু উচ্চবিদ্যালয়ের শ্রেণিতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৮-এ সীমিত করা, বিদ্যালয় সংস্কারে ৪০০ কোটি ইউরো ঋণ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১০০ কোটি ইউরো বিনিয়োগ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে ভর্তি পদ্ধতি বদলানোর কথা রয়েছে। বাজেটমন্ত্রী ব্যয় ৫০০ কোটি ইউরো বলেছেন। অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে তা সমন্বয় করা হবে।
    • শিক্ষার্থী নেতারা প্যাকেজকে প্রথম পদক্ষেপ বলেছেন এবং আন্দোলন চালানোর অঙ্গীকার করেছেন। পরবর্তী বিক্ষোভ শনিবার এবং দেশব্যাপী ধর্মঘট ৫ নভেম্বর হওয়ার কথা।

    অরলেয়াঁয় প্রচার শুরু

    অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন লো পেন: সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ফেরানো, অপরাধী বিদেশিদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী ও মাদক পাচারকারীদের দমন। সম্মেলনে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। উপস্থিত ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার আগে তিনি বলেন, “আমরা বলি, ‘আগে ভালো ছিল, আগামীকাল আরও ভালো হবে’।” তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যৎ আমাদের।”

    অর্থনীতি নিয়ে তিনি ব্যয় সংযম, ব্যবসার কর কমানো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং শিল্প, উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। অবসরের বয়স আরও বাড়ানোর বিরোধিতা করেন তিনি। ইউরোপের প্রশ্নে ফ্রান্সকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার কথা বলেননি। বরং ব্রাসেলসের প্রভাব কমানো, সীমান্ত ও আইনে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ ফেরানো এবং বিদেশের যুদ্ধ থেকে ফ্রান্সকে দূরে রাখার কথা বলেছেন।

    সম্মেলনে নেতৃত্বের একটি স্থির জুটি তুলে ধরার আয়োজন ছিল। বারদেলা আবার ন্যাশনাল র‍্যালির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে লো পেনের পছন্দ বলা হয়। একটি ইহুদি শিক্ষার্থী ইউনিয়নের কর্মীরা তাঁর বক্তব্যে বাধা দেন। তরুণ বয়সে তিনি ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য করেছিলেন, এমন অভিযোগের দিকে তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বারদেলা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০১১ সালে বাবা জ্যঁ-মারি লো পেনের কাছ থেকে দলের নেতৃত্ব পাওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে দলটিকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন লো পেন। দলের ভাবমূর্তি নরম করা এবং অভিবাসনবিরোধী সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো তাঁর প্রচেষ্টার অংশ।

    লো পেনের প্রচারের সামনে একটি অমীমাংসিত আইনি প্রক্রিয়াও রয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ আত্মসাতের দায়ে প্যারিসের একটি আদালত ২০২৫ সালের মার্চে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার দুই বছর স্থগিত। সঙ্গে ১ লাখ ইউরো জরিমানা এবং সরকারি পদে থাকার ওপর তাৎক্ষণিক পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ৭ জুলাই প্যারিসের আপিল আদালত দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রেখে নিষেধাজ্ঞা ৪৫ মাসে নামায়, যার ৩০ মাস স্থগিত। বাকি ১৫ মাস তিনি ইতিমধ্যে ভোগ করেছিলেন। তাঁর কারাদণ্ড হয় তিন বছর, যার দুই বছর স্থগিত এবং এক বছর ইলেকট্রনিক নজরদারিতে কাটানোর কথা।

    তিনি কুর দ্য কাসাসিওঁতে আরও আপিলের ঘোষণা দেন। রায় নিয়ে লো মঁদের বিবরণ অনুযায়ী, ওই আপিলের বিচার চলাকালে ইলেকট্রনিক নজরদারির দণ্ড কার্যকর করা স্থগিত থাকবে। নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা ও কারাদণ্ড কার্যকর করা দুটি আলাদা প্রশ্ন। প্রচারে শেষ পর্যন্ত কী বিধিনিষেধ থাকবে, তা ওই প্রক্রিয়ার ফলের ওপর নির্ভর করছে।

    ছাড় ও তার ব্যয়

    সেপ্টেম্বরে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় অবরোধ শুরু করেন। পরে সরকারি সেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেয় শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্টের কর্মীরা। ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভে সরকার ৭০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম মোতায়েন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ বলেছেন, পরবর্তী বিক্ষোভেও ব্যাপক নিরাপত্তা উপস্থিতি থাকবে।

    সোমবার প্যারিসে শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর সরকার প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু উচ্চবিদ্যালয়ের শ্রেণিতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৮-এ সীমিত করার অঙ্গীকার, বিদ্যালয় সংস্কারে ৪০০ কোটি ইউরো ঋণ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১০০ কোটি ইউরো বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে শিক্ষার্থী অনুদান বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষায় আরও ১৫ হাজার আসন। শিক্ষার্থীরা যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পদ্ধতিকে সামাজিকভাবে অন্যায্য বলছেন, তা ২০২৮ সালের মধ্যে বদলানো হবে। ২০২৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনের বিস্তারিত মানদণ্ড প্রকাশ এবং অনুরোধ পেলে প্রত্যাখ্যানের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থায় যে চাপ অনুভূত হচ্ছে, তা কমাতে হবে, এটা স্পষ্ট।” বাজেটমন্ত্রী দাভিদ আমিয়েল টিএফওয়ানকে বলেছেন, ঘোষিত পদক্ষেপগুলোর ব্যয় ৫০০ কোটি ইউরো হতে পারে। অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে তা সমন্বয় করা হবে।

    ঋণ কমাতে বন্ডবাজারের চাপের মুখেও রয়েছে সরকার। ফলে ছাড়ের অর্থ জোগানোর সুযোগ সীমিত। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই অস্থিরতা লো পেনের অবস্থান শক্ত করেছে। তবে জরিপে এগিয়ে থাকা নির্বাচনের ফল নয়। আর শিক্ষা পরিবর্তনের সময়সূচি আসন্ন প্রচারের পরও বিস্তৃত।

    আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

    ছাড়গুলোকে শুরু হিসেবে নেওয়া হয়েছে, নিষ্পত্তি হিসেবে নয়। সোমবারের বৈঠকের পর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রতিনিধি লুই লেতুব্লোঁ বলেন, “আমাদের সব দাবি পূরণ হয়নি। যত দিন লাগে, আমরা চালিয়ে যাব।” শিক্ষার্থী নেতারা প্যাকেজকে ভালো প্রথম পদক্ষেপ বলেছেন এবং বিক্ষোভের সময়সূচিতে অনড় রয়েছেন।

    মঙ্গলবার শিক্ষক ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউর মহাসচিব সোফি ভেনেতিতে বলেছেন, আরও বেশি শ্রেণিকে শিক্ষার্থীসংখ্যার সীমার আওতায় আনতে হবে এবং আরও কর্মী নিয়োগ করতে হবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আজ মন্ত্রণালয় যা বলেছে, তা একটি জবাবের শুরু মাত্র।” তিনি আরও বলেন, “এতে ক্ষোভ নিভবে না।”

    ব্যবসায়ীরাও নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করছেন। চেম্বার অব কমার্সের নেটওয়ার্ক সিসিআই ফ্রান্সের প্রধান আলাঁ দি ক্রেসেনজো বলেছেন, ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার পর সতর্কতা হিসেবে অনেক খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। বিক্রি ব্যাপকভাবে কমেছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের দোকানিরা ক্লান্ত ও হতাশ, আর আমরা স্থানীয় বাণিজ্যকে মেরে ফেলছি।” মার্সেইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ স্বীকার করেছেন, ৫ নভেম্বরের বড় দেশব্যাপী কর্মসূচির আগে এই সপ্তাহান্তে আরও অস্থিরতা হতে পারে। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল রাখবেন এবং শহরকেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভ সরাতে কাজ করবেন।

    নুনেজ আরটিএলকে বলেছেন, শনিবার ব্যাপক নিরাপত্তা উপস্থিতি থাকবে। এর দুই সপ্তাহ আগে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সহিংসতা ও লুটপাটে গড়ায়। এরপর ফ্রান্সের কিছু এলাকায় কারফিউ ও বড় সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আসে। শনিবার, ৩১ অক্টোবর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হওয়ার কথা।

    এরপর যা হবে

    পরবর্তী বিক্ষোভের পরিকল্পনা ৩১ অক্টোবর, এরপর ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী কর্মসূচি। আগামী বছরের বাজেট নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষা প্যাকেজের ব্যয় সমন্বয় করতে কোথায় ব্যয় কমানো হবে, সরকারকে তা জানাতে হবে। প্রতিশ্রুত ভর্তি পদ্ধতির পরিবর্তন হওয়ার কথা ২০২৮ সালে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে। তখন ক্ষমতায় থাকা সরকারের ওপর এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।