ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকির লুইস অনার্স কলেজের প্রভাষক এবং বেঙ্গল কাউন্সিলের সদস্য ড. নাজমুস সাকিব অ্যাডাম বেনসাইদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী কীভাবে শরণার্থীদের ‘অপর’ করে দেখে এবং শরণার্থীর আগমন কীভাবে জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যকে উসকে দেয়। কথা হয়েছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, রোহিঙ্গাদের জন্য কমে আসা সহায়তা এবং বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত, তা নিয়েও।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপ উপকূলে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় একটি রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জেলেরা ১৮ জন রোহিঙ্গাকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। নৌকায় থাকা মাঝিমাল্লাসহ আরও ১৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের দাবি, নিখোঁজদের কেউ কেউ সাঁতরে অন্যত্র উঠেছেন। উদ্ধার হওয়া ১৮ জনকে টেকনাফ-২ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আজ শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে শাহপরীরদ্বীপ পশ্চিমপাড়া নৌকা ঘাটসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় জেলে এনায়েত জানান, মোট ৩১ জন লোক নিয়ে নৌকাটি শাহপরীরদ্বীপ উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে ডুবে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় জেলেরা তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, মিয়ানমারে সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মির চলমান সংঘর্ষের কারণে তাঁরা বাংলাদেশে আশ্রয়ের উদ্দেশে পালিয়ে আসছিলেন। শাহপরীরদ্বীপ উপকূলে পৌঁছার পর নৌকাটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে জীবিতদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের এক আত্মীয় নুরুল আমিন দাবি করেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মিয়ানমারে গিয়েছিলেন এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাঁরা পুনরায় বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা করলে এই দুর্ঘটনার শিকার হন।
এ দিকে আজ বিকেল ৫টার দিকে বিজিবি উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের টেকনাফ মডেল থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ বিষয়ে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
রোহিঙ্গা সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং ক্যাম্পের মানবিক অবস্থা সরেজমিনে দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে আসা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সামনে স্বদেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। শুক্রবার উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় সার্জিও গোরের গাড়িবহরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন রোহিঙ্গারা। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘You have your home! We miss our home!’ বাংলায় যার অর্থ, ‘আপনার নিজের বাড়ি আছে, আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি।’ প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে তারা মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশেষ দূতের সফরকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরেন। অনেকেই নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহিম জানান, রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান।
রোহিঙ্গা নেতা মো. জুবায়ের বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের একটাই চাওয়া- নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। আমরা আর শরণার্থী হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কোনো মানুষ চিরকাল নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের আশ্রয়ে থাকতে চায় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আমরা নিরাপদে আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারি।’
ক্যাম্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সফরে সার্জিও গোর রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
উল্লেখ্য, তিন দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে আসা মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থা, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এবং প্রত্যাবাসন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার অংশ হিসেবে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন।
টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে এক রাতেই পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন রোহিঙ্গা এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন।
আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও জেলার পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা যৌথভাবে কাজ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নাম্বারের স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল থেকেই কক্সবাজারে থেমে থেমে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। সন্ধ্যার পর তা টানা ভারী বর্ষণে রূপ নেয়। গভীর রাতে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কক্সবাজার শহরে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে উখিয়ার ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। মধ্যরাতে পাহাড়ের ঢাল ধসে আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের পাঁচ সদস্য মাটিচাপা পড়েন। তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় রোহিঙ্গারা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় পাঁচজনকে উদ্ধার করা হলেও উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) মারা যায়। আহত একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পাহাড়ধসের পর আশপাশের আরও কয়েকটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে মাটিচাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, খবর পেয়ে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন।
একই রাতে রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। আহত আরও দুজনকে প্রায় তিন ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে আজ সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবরের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়। এতে আলী আকবর, তার স্ত্রী ও ছেলে মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা বলেন, ‘রাতের সব ঘটনাই খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক দল উদ্ধারকাজে নামে। রাতভর অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্যাম্প-ইনচার্জ মোহাম্মদ আরাফাতুল আলম বলেন, ‘ভারী বর্ষণে ক্যাম্পের বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ঢাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
দুর্ঘটনার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হাফেজ আব্দুস সালাম বলেন, ‘প্রতিবছর ক্যাম্পে পাহাড়ধস হয়। তারপরও বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হয়। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছিলাম। এখানে মৃত্যু হলেও কিছু করার নেই। সবকিছু আল্লাহর হাতে। নিজের দেশে ফিরে মৃত্যু হলেও অন্তত সেই কষ্টটা থাকত না।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘শহরে পাহাড়ধসের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।’