রোগ

  • নীরবে শরীরে বাসা বাঁধছে রোগ

    নীরবে শরীরে বাসা বাঁধছে রোগ

    বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস আজ। প্রতি বছর ২৮ জুলাই দিবসটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়। ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। সাভারের বাসিন্দা ছিদ্দিক হোসেন (৪২) দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন । বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ করেই শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যান তিনি। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তিনি হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিলেও দিন দিন অবস্থার অবনতি ঘটে তার।

    তিনি জানান, এক বছর আগেও জানতাম না আমি ভয়াবহ এ রোগে আক্রান্ত। শরীরে কোনো ধরনের লক্ষণ ছিল না। শুধু পেটে মাঝেমধ্যে ব্যথা হতো এবং বমি বমি ভাব হতো। তবে শরীর খুব দুর্বল এবং ক্লান্তি লাগত। এরই মধ্যে আমার লিভার সিরোসিসসহ নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। গত ছয় মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমানো টাকা যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনাসহ গ্রামের বাড়িতে জমিও বিক্রি করেছি। এখন নিয়মিত ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।

    শুধু ছিদ্দিক নয়, তার মতো দেশের অধিকাংশ মানুষই জানেন না হেপাটাইটিস কি, কীভাবে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয় কিংবা চিকিৎসা কি। যেহেতু এ রোগের উপসর্গ খুব কম, তাই এতে আক্রান্ত হলেও সহজে ধরা পড়ে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এটা শরীরের ভেতর নীরবে থেকে যায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো পরীক্ষা না করানোর কারণে অনেকেই রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই জটিল অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছেন। ফলে দেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস নীরব ঘাতকে পরিণত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

    চিকিৎসকরা জানান, দেশে অধিকাংশ মানুষ হেপাটাইটিসকে ‘জন্ডিস রোগ’ নামেই চেনেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হেপাটাইটিস হলো ভাইরাসজনিত লিভারের প্রদাহ। হেপাটাইটিসের এ, বি, সি, ডি এবং ই—এ পাঁচটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ খাদ্য ও পানিবাহিত, যা থেকে স্বল্পমাত্রার জন্ডিস হয়ে থাকে। তবে এটি সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে শরীরে ইমিউন সিস্টেমের (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) মাধ্যমে সেরে যায়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লিভার ফেইলিউর হতে পারে। তবে হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর প্রতি বছর হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসজনিত জটিলতায় প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার প্রায় এক শতাংশ, যার সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার। আবার দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রায় ১৮ লাখ নারী হেপাটাইটিস বিতে আক্রান্ত। এছাড়া দেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জানেন না যে, তারা এ রোগে আক্রান্ত। ফলে তারা চিকিৎসার বাইরে থেকে যান এবং অজান্তেই জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডব্লিউএইচওর ‘গ্লোবাল হেপাটাইটিস রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণে আক্রান্ত ছিলেন। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং পাঁচ শতাংশেরও কম মানুষ চিকিৎসা পেয়েছেন। লিভার ক্যানসারে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী বি এবং সি ভাইরাস। এছাড়া উচ্চঝুঁকিতে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। হেপাটাইটিস বি ও সি-জনিত মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে—প্রথমে চীন এবং দ্বিতীয় ভারত। আর ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সারা বিশ্ব থেকে হেপাটাইটিস বি, সি ভাইরাস প্রতিরোধ এবং লিভার ক্যানসার নির্মূলের কথা বলা হয়েছে।হেপাটইিটিসে আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশ উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ সাঈদুল হক আমার দেশকে বলেন, হেপাটাইটিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, তবে অসচেতনতার কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই দীর্ঘদিন বুঝতে পারেন না যে, তারা হেপাটাইটিস বি বা সিতে আক্রান্ত, কারণ রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত উপসর্গহীন থাকে। বেশিরভাগ রোগী অন্য রোগের পরীক্ষা, গর্ভাবস্থার স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চাকরির মেডিকেল চেকআপের সময় সংক্রমণের বিষয়টি জানতে পারেন। আবার অনেক রোগী লিভার জটিল আকার ধারণ করার পর, যেমন পেটে পানি আসা, রক্তবমি বা কালো পায়খানার মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন।

    তিনি বলেন, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন, ভ্যাকসিন গ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ সম্ভব। বর্তমানে হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময় করা যায় এবং হেপাটাইটিস বি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

    বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি মূলত রক্তবাহিত ভাইরাস। অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, ব্যবহৃত সুঁই-সিরিঞ্জ, দূষিত ব্লেড বা জীবাণুমুক্ত না করা চিকিৎসা সরঞ্জামের মাধ্যমে এ সংক্রমণ ছড়ায়। তিনি বলেন, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের কারণে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নেন না, ফলে জটিলতা বাড়ে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেই হেপাটাইটিসের প্রাথমিক পরীক্ষা করা যায় আর বিশেষায়িত কিংবা শহরের হাসপাতালে উন্নত পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য। আবার অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পরীক্ষার খরচ ও ওষুধের দামও তুলনামূলক কম। তাই তিনি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

  • হামে আরও ৫ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১১১৫

    হামে আরও ৫ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১১১৫

    দেশে হাম পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

    শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

    বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে সারাদেশে নতুন করে ১ হাজার ১১৫ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ১২৭ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯২ জনে। অন্যদিকে, এই সময়ে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার ৪৬৭ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১১ হাজার ২৪৩ জন।

    বিগত এক মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৪ জন। ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। এই বিভাগে ৯ হাজার ২৭৪ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১ হাজার ৯৬৫ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে।

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। একই সাথে সংক্রমণ রোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।